amader holde barir srity uwriter club

আমাদের হলদে বাড়ির স্মৃতি

আমাদের বাসাটা রঙ করা হয় না প্রায় ২০ বছর যাবত। বাসাটা যদিও বেশী বড় না তবু আমারো খুব ইচ্ছা করে পড়াশোনা টা শেষ করে যখন চাকরী পাবো তখন বাসাটা রঙ করাবো। আমাদের বাসার নাম ” অরুণিমা ভবন “, খুব সুন্দর না নাম টা? এটা আমার দাদীর মায়ের নাম। খুব শখ করে তিনি নাম টা রাখেন। এই বাসাটা আমার দাদাভাই বানিয়ে ছিলেন। তবে বাড়ির দ্বিতীয় তলায় একটা স্টোর রুম ছিলো সেটাকে বাবা তার ব্যক্তিগত লাইব্রেরি বানিয়ে ফেলেছেন।

লাইব্রেরি তে সবার যাওয়ার অনুমতি নেই শুধু বাবা নিজে আর আমার বড় বোন রিতা আপু যেতে পারে, সেই ছোট কুঁড়েঘর এর মতো লাইব্রেরী তে অনেক বই আছে তাও না রবিন্দ্রনাথ আর শরৎচন্দ্র মিলিয়ে মাত্র ২৭ টার মত বই আছে,আমি মাত্র দুইবার গিয়েছিলাম লাইব্রেরী তে। লাইব্রেরীর সাথে একটা ছোট বারান্দা আছে, সেটা বাবা নিজ খরচে তৈরি করেছেন। একটা মধ্যবিত্ত পরিবারে এরকম বিলাশিতায় মা আপত্তি করেছিলেন, বাবা যখন পুরোনো চাকরী ছেড়ে দিয়ে নতুন চাকরী খুজে পান তখন ঘুষ দিতে হয়েছিলো ৫০ হাজার টাকা, গ্রামে আমাদের একটা দেড় শতাংশ জমি ছিলো তখন সেটা বেঁচে দিতে হলো বাবা কে। ঘুষ দেওয়ার প্রর আরো ১০ হাজার টাকা বেচে যায় সেই টাকা দিয়ে বাবা বারান্দা বানিয়েছিলেন,মা চেয়ে ছিলেন টাকাটা রিতা আপুর বিয়ের জন্য রেখে দিতে বাবা কথা শুনলেন না তিনি বারান্দা বানিয়েই ছারলেন। আমাদের বাসার পাশেই নতুন একটা ৬ তলা সাদা ধবধবে দালান উঠেছে দালানের নাম গফুর টাওয়ার। দালানের মালিক গফুর আলি এখন আমাদের বারির জমিটা কিনে নিতে চাচ্ছেন তার ইচ্ছা আমাদের বাড়ি গুড়িয়ে দিয়ে একটা ডুপ্লেক্স বাড়ি বানাবেন তিনি বাড়ির দাম সহ জমির দ্বিগুণ দাম দিতে রাজি কিন্তু বাবা এই হলদেটে বাড়িটাকে মৃত্যুর আগে ছারবেন না। আমি আর রিতা আপুও চাচ্ছি মফস্বল এর এই পুরোনো বারিটা ছেড়ে দিতে কিন্তু বাবাকে সে কথা বলার সাহস আমাদের নেই। মাসে অন্তত একবার গফুর সাহেব আমাদের বাড়ি আসেন বাবাও তার সাথে হাসিমুখেই কথা বলেন কিন্তু বাড়ির ব্যাপারে কথা আসলেই তিনি মুখ গম্ভীর করে চারুলতা বই নিয়ে বসে যান এর পর আর একটা কথাও বলেন না। আমাদের মাও চাচ্ছিলেন বাড়ি বিক্রি করে দিতে, মেয়ের বিয়ে নিয়ে টেনশন করে তিনি পাগল প্রায় বাবার চাকরীর মেয়াদ আর মাত্র ৪ মাস আছে এর পর তিনি অবসর নিবেন। এভাবে সময় কেটে গেলো প্রায় ১ বছর, বাবা রিটায়ার করেছেন। দিনের অধিকাংশ সময় তিনি লাইব্রেরী তেই কাটা মাঝে মধ্যে খেয়ে পর্যন্ত আসেন না। রিতা আপু চাকরী পেয়ে গেছে সংসারে দুবেলা দুমুঠো ভাত জুটে যেতে কষ্ট না হলেও মধ্যবিত্তদের চাহিদার মাপকাঠি কখনোই পুরোন হয় না। মা প্রায়ই আমাকে বলেন বাড়ি বিক্রি নিয়ে বাবার সাথে কথা বলতে, তিনি বলেন “দেখ তিশির, বাড়ি নিয়ে কিছু একটা করা লাগবে তোর বাবার সাথে কথা বলতে পারিস না? নিজের বড় বোন টার দিকে তাকাতে পারিস না? মেয়েটা বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে আর কতদিন সে আমাদের টানবে বল তুই?……” এসব বলতে বলতে তিনি কেঁদে দিতেন আমি তার হাত ধরে তার কোলে শুয়ে পরতাম আর বলতাম “মা শুধু শুধু কেদো না তো আমার ভাল্লাগেনা এসব আর তুমি এত টেনশান নিও না দেখবা সব ঠিক হয়ে যাবে,উপরে আল্লাহ আছেন তিনিই ভরসা”

নভেম্বর মাসের ২ তারিখ ভোর বেলা বাবা মারা গেলেন তার আগের রাত্রে তিনি আমায় প্রথমবার নিজে ডেকে তার লাইব্রেরী ঘরে নিয়ে যান। লাইব্রেরী তে গিয়ে একটা ছোট ড্রয়ার থেকে কিছু কাগজ পত্র আমার হাতে তুলে দিয়ে গম্ভির গলায় বললেন “তিশির ভালো করে একটা কথা শোন। তোকে যে ব্যাংকের কাগজ গুলো দিলাম সেখানে প্রায় ১৫ লাখ টাকার সঞ্চয় আছে আমার। আজ আমি এসব তোর হাতে তুলে দিচ্ছি,আমি এখন ভার মুক্ত হতে চাই। তোর মাকে এসব এখনি বলতে যাস না সময় হলে আমি নিজেই বলবো। সে আমার সাথে দুদিন যাবত কথা বলে না। তাকে বলেদিস এই বাড়ি কেয়ামত আসলেও আর বিক্রি হবে না। আর তোর বোনের বিয়ে তোকে দিতে হবে, সারা জনম অনেক খেটেছি আর আমি এসব বইতে পারবো না। এখন নিচে যা আর রিতা কে বলিস আমার জায়নামাজ টা পাঠিয়ে দিতে।” আমি কোনোকিছু বলার সাহস পেলাম না সালাম দিয়ে চলে আসলাম। ভোর বেলা ঘুম ভাঙে রিতা আপুর ধাক্কায় উঠে জানতে পারলাম বাবা আর নেই। বাবাকে দাফন দেয়ার সময়েও আমি মানতে পারিনি এই নিথর দেহটা আমার বাবার। বাবা মারা যাওয়ার পর মা ২ দিন লাইব্রেরী ঘর থেকে বের হননি কথা বলাও প্রায় ছেরেই দেন খুব দরকার না পরলে তিনি কথা বলতেন না। কিন্তু মাঝে মাঝেই চাপা চিৎকার দিয়ে কেদে উঠতেন কিন্তু আমরা তার কাছে ছুটে যেতেই দেখতাম তিনি স্বাভাবিক হয়ে গেছেন। বাবা মারা যাওয়ার পর গফুর সাহেব আরেকবার এসেছিলেন, মা তাকে কঠিন ভাষায় বলে দেন এই বাড়ি বিক্রি হবে না। এর পর রিতা আপুর বিয়ে হয়ে গেলো আমিও সোভাগ্য বশত চাকরী পেয়ে যাই হলদে বাড়ি টার রঙ চকচকে নীল করে ফেলি। মায়ের ক্যান্সার ধরা পরে, শেষ বয়সে খুব একটা চলাফেরা করতে পারতেন না। সারদিন লাইব্রেরী ঘরেই বই পরে কাটিয়ে দিতেন তার যত্ন নিতে রিতা আপু চলে আসেন কিছু দিনের জন্য আমি তার চিকিৎসার খরচ দিতে পারতাম না। বাবা মায়ের জন্য যে টাকা রেখে গিয়েছিলেন সেখান থেকেই খরচ আসতো। মা মারা যান বাবা মারা যাওয়ার ৩ বছর পর। মারা যাওয়ার আগের দিন তিনি আমার মাথে তার কোলে রেখে মাথা বুলিয়ে দিচ্ছিলেন, তার চোখের অশ্রু আমার গালে পরছিলো, তিনি ভাঙা গলায় আকুতি নিয়ে বলেছিলেন “মানুষ টার শেষ ইচ্ছা রাখিস বাপ আমার…বাড়ী বেচিস না….”

সেই কথা গুলো এখনো আমার কানে বাজে তাই এই বাড়িটা এখনো বিক্রি হয়নি,বিক্রি হয়নি রবিন্দ্রনাথের বই গুলো, সেই বাড়িটার বারান্দা থেকে এখনো আলো এসে পরে আর সে বারান্দা থেকে আসা হাওয়ার স্পর্শ বাবা-মার উপস্থিতির স্মৃতিচারন করে। এসব কিছুই আমাকে আর বাড়িটা বিক্রি করে দেওয়ার সাহসটা দেয় নি।

About the Author রাজীত ফারহান

follow me on:

Leave a Comment: