chirkut uwriter club

চিরকুট

১.
সেলিম ভাইকে চিনেন তো? বিশাল এক সাংবাদিক। আমার আবার ব্যাপক ক্লোজ বড় ভাই। কোথাও গেলে আমাকে সাথে করে নিয়ে যান। এইত্তো সেবার.. সেবার গিয়েছিলাম এক বন্যার্ত এলাকায়। কোন এলাকা জেনে কি করবেন? আর যেটাই হোক আপনার এলাকা না। সে বিষয়ে নিশ্চিত থাকেন। তো যা বলছিলাম বন্যার্তদের নিয়ে একটা প্রতিবেদন তৈরি করতে যাবেন ভাই। আমাকে ফোন দিয়ে বললেন “কি রে? যাবি নাকি? আমি লাফাতে লাফাতে বললাম “হ ভাই যাবো তো।” একটু পার্ট নিতে মোটুপাতলু কার্টুন স্টাইলে বললাম “আপনি কোনো চিন্তা করবেন না ভাই। বন্যার্তদের সামলানোর ২০ বছরের এক্সপ্রিয়েন্স আছে আমার।” সেলিম ভাইও পচানোর মানুষ। সহজে ছেড়ে দিলেন না। “তা তোর বয়স কত রে?” “কেন ভাই ২০ বছর ৬ মাস” “২০ বছরে বন্যা দেখলি কতবার?” হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলেন তিনি। প্রতিপক্ষকে জিততে দিলে চলবে না তাই বললাম “ভাই ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে প্রায়ই দেখি।” পাশে মনে হয় ভাবি ছিল। আমাকে ব্যাপক আদর করে ভাবি। নিজের ছোট ভাইয়ের মতো দেখে। ফোনটা ভাবি নিয়ে নিল। আমাকে বলল “ইরফাত, তোর ভাইয়ের আর নিজের খেয়াল রাখিস।” ঝোঁকের মাথায় ভাবিকে বলেই ফেললাম “তুমি একদম চিন্তা করো না ভাবি। ভাইয়াকে সামলানোর ২০ বছরের এক্সপ্রিয়েন্স আছে আমার।” ভাবি বলল “মানে?” নিজের মাথায় একটা টোকা মেরে বললাম “না ভাবি কিছু না আমি খেয়াল রাখবো। আপাতত ফোনটা রাখি?”

২.
দেখতে দেখতে যাওয়ার দিন চলে আসলো। সেলিম ভাইয়ের অফিসের সামনে থেকে গাড়ি ছাড়ার কথা। যেয়ে দেখি ভাইয়ের ক্যামেরা গাড়িতে তুলছেন তার সেক্রেটারি। ভাইকে বললাম “কে কে যাচ্ছে ভাই?” ভাই বললেন আমি তুই কামাল(ভাইয়ের সেক্রেটারি) আর হৃদিতা।” মেয়ে যাচ্ছে শুনে মনটা চাঙ্গা হয়ে গেল। যদিও ভাইয়াকে জ্ঞিগেস করার সাহস হলো না মেয়েটার বিষয়ে। কিছুক্ষণ পর একটা রিকশা এসে থামলো। নেমে ভাইয়ের সাথে হেসে হেসে কথা বলছিল একখান মেয়ে। হাসিটা দেখে আম্মার কথা মনে পড়লো। আজ্ঞে না! এবারও আপনাদের ধারনা ভুল। আম্মার হাসি এমন না। মনে পড়ার কারণ আম্মার জন্য বৌমা পেয়ে গেছি তাই। একবার নিজের বিয়ের দিবাস্বপ্নও দেখে নিলাম। স্বপ্ন ভাঙলো ভাইয়ের ডাকে। “আয় তোকে পরিচয় করায় দেই..” “আমি ইরফাতুল তাহমিদ। নাম তো শুনেছেনই মেবি। একজন হবু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।” বলেই বলিউড স্টাইলে পার্ট নিলাম। কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী হলো না। “নাম শুনার কোনো আগ্রহ আমার নাই। আর আপনি শাহরুখ খান না।” ভাইয়ের দিকে তাকায় বলল “একজন পাগলের ডাক্তারের কাজ কি আমাদের সাথে? যে নিজেই আধপাগল?” কথাটা শূনে পরের মুহূর্তেই আম্মার কথা ভুলে গেলাম। বিয়ের আশা মিটে গেল। চলে যাচ্ছিলাম। সেলিম ভাই টেনে ধরে বুঝানো শুরু করল। তাই থেকে গেলাম। অবশ্য আরো একটা কারণ ছিল। আমাকে রাগে ফুলতে দেখে মিটমিট করে হাসছিল সুন্দরী রাক্ষসি টা। সুন্দরী রাক্ষসি বলার কারণ নিশ্চয়ই বুঝছেনই? যাই হোক গাড়িতে উঠলাম। একটা ছোট প্রাইভেট কার। সেলিম ভাই নিজেই ড্রাইভ করেন। পাশে সেক্রেটারি কামাল ভাই বসা। আর আমি আর রাক্ষসি টা পাশাপাশি বসা। উনি বোধহয় বুঝছেন আমি রেগে আছি। তাকই নিজে থেকেই খোঁজ নেওয়া শুরু করলো। কোন মেডিকেলে পড়ি। কোন স্কুল কলেজ থেকে পাশ করছি। গ্রেড কতো ছিল এসব হাবিজাবি প্রশ্ন। রেগে রেগে সবগুলোর উত্তর দিচ্ছিলাম। এরপর আর একটু পার্ট নিতে বললাম “আমি কি আপনাকে প্রপোজ করছি? না তো? তাহলে বায়োডাটা নিচ্ছেন কেন এভাবে?” এবার রাক্ষসিটার রাগের দর্শন পেলাম। রেগে গেল। কিন্তু প্রকাশ না করেই বলল ” আমার ছোট ভাইয়ের ইচ্ছা আছে এই লাইনে যাওয়ার। তাই জেনে নিচ্ছিলাম।” কথা শুনে আবার আম্মার কথা ভুলে গেলাম।

৩.
বন্যার্তদের জন্য কাছের একটা স্কুলে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বন্যার কারণে বহু আগেই গাড়ি থেকে নেমে নৌকায় উঠেছি। আশ্রয়কেন্দ্র দেখে আমার মিনা কার্টুনের কথা মনে পড়লো। সবাই আমাদের দেখে মনে করল রিলিফ নিয়ে এসেছি। পাড়ে অপেক্ষা করতে লাগল। যখনই নৌকা থেকে নামলাম,সবাই মিলে ঘিরে ধরল। যখন জানতে পারলো আমরা সাংবাদিক সবাই যার যার মতো গালি দিতে দিতে চলে গেল। আগেই বলে রাখি সুন্দরী রাক্ষসি তার রাগ প্রকাশ না করলেও কথা বলছে না। আর আমি তো আমিই। তাই সেলিম ভাইয়ের কাছে গাড়ি থেকে নামার পরে জেনেছিলাম রাক্ষসি টা সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ে। ফিল্ড প্রাকটিস করতে এখানে আসা। তবে হ্যা সে আমার জুনিয়র যা জানতে পেরে আম্মার কথা আবার মনে পড়ে গেল। যেহেতু তিন সাংবাদিকই কাজে এসেছে তাই আমার ঘুরতে আসাটা কেমন যেন নষ্ট হয়ে গেল। মনে মনে সেলিম ভাইকে গুনে গুনে দুইটা গালি দিলাম আমাকে আনার জন্য। তিন নং টা দেওয়ার আগে সুন্দরী রাক্ষসির হাসির দর্শন পেলাম। তাই আর গালি বের হলো না মন থেকে। হঠাৎ একটা সমস্যায় পড়ে গেলাম। আশেপাশে বাথরুম খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু দুইটা টিনের বেড়া দেওয়া ছোট ঘর ছাড়া আর কিছু পেলাম না। এদিকে সেখানে যে ভিড় এতক্ষণ আটকে রাখাও সম্ভব না। সুন্দরী রাক্ষসি না থাকলে যেকোনো চিপায় গিয়ে কাজ সেরে আসতে পারতাম কিন্তু আমি কতোটা স্বাস্থ্য সচেতন তা তাকে বুঝাতে আর যেতেও পারছিলাম না। এদিকে লাইনে দাড়ালেও প্রেসটিজ ইস্যু। তাই বুদ্ধি খুঁজতে লাগলাম। একটু সাহস করে লাইনের সামনের দিকে চলে গেলাম। এক বুড়া লোক ছিলেন। বললাম “আঙ্কেল আমি একটু আগে যাই? আমরা সাংবাদিক। আপনাদের এ অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে আমরা এসেছি।” মিষ্টি কথায় বুড়ার মন ভরল না। বরং সে সাংবাদিকদের ১৪ গুষ্টি উদ্ধার করা গালি দিতে থাকলো। আশেপাশের লোকজনও দেখলাম তাল মিলাচ্ছে। এসব দেখে সেলিম ভাই এগিয়ে এল। জানতে চাইলো “কি হইছে রে?” দেখলাম সুন্দরী রাক্ষসি আমার দিকে তাকায় আছে দূর থেকে। ভাইকে তাই আস্তে করে বললাম। একদিকে আমার ব্লাডার ফেটে যাওয়ার মতো অবস্থা অন্যদিকে ভাইয়ের হাসি দেখে কে। হাসতে হাসতে রাক্ষসি র কাছে যেয়ে কি জানি বলতে লাগলো। মেজাজ টা মারাত্মক গরম হচ্ছিল। এদিকে আমি আর পারছিনা।এরপর কালাম ভাই একটা সিগারেট নিয়ে এলেন। বললেন “স্যার পাঠালেন। আপনি নাকি চেয়েছিলেন? ঐদিকে ফাঁকা আছে যেয়ে খান।” আমি আকাশ থেকে পড়লাম। বাপের জন্মে সিগারেট খাইও না। কিন্তু তসও রাক্ষসির সামনে আসল কাহিনী বলেননি বলে ধন্যবাদ দিয়ে চিপায় দৌড় দিলাম। কাজ শেষ করে ফিরে এসে দেখি রাক্ষসি আমার দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।দেখেই বুঝলাম, আগুন জ্বলছে। আর একটু জ্বালাতে কাছে যেয়ে বললাম একটা চকলেট হবে? এরপর আর কোনো কথাই বলল না। মনে হয় আম্মার কথা ভুলেই থাকতে হবে।

৪.
এবার ফেরার পালা। আসার সময়ের বর্ণনা না-ই-বা দিলাম। তবে পিছনে বসার সাহস আর হয় নি। ঢাকায় এসে আবাক হলাম আমি। সেলিম ভাই রাক্ষসিকে বলল “ছেলেটার সাথে পরিচয় করায় দিতে বলছিলি তাই দিলাম। এখন সারাজীবন কিভাবে কাটাবি সেটা তোর ইচ্ছা। শুনেই হার্টবিট বেড়ে গেল। ভাইকে বললাম “মানে?” সেলিম ভাই বললেন “তোর ভাবির বোন..” আরো অনেক কিছুই বলছিলেন, সব মাথার উপর দিয়ে গেল। আমি তখন তাকায় রাক্ষসির হাসি দেখছি। পরে রিকশায় তুলে দিলাম। যাওয়ার সময় একটা চিরকুট দিয়ে গেল। যেখানে সিগারেট ছাড়তে বলার কথা ছিল। আড় চোখে সেলিম ভাইয়ের দিকে তাকায় তিন নং গালিটা দিয়ে বাসায় চলে আসলাম। আম্মাকে বলতে হবে না? তার বৌমা পাওয়া গেছে!

About the Author ইরফাতুল তাহমিদ

লেখালেখি করা আমার নেশা ! পেশা না.. লিখতে ভালোবাসি তাই লিখি। তবে স্বপ্ন দেখি এই লেখা দিয়েই মানুষের মাঝে বেঁচে থাকার।

follow me on:

Leave a Comment: