ছদ্মবেশধারী চোর

আমাদের গ্রামে খুব বুদ্ধিমান একজন লোক ছিলেন। বিপদে-আপদে তিনি আমাদের সকলের ভরসা। তার আসল নাম আমরা জানি না, কেননা শিশু-তরুণ-যুবক সবাই তাকে জ্ঞানী দাদু বলে ডাকতাম। যারা বয়সে একটু বড় তারা ডাকতেন জ্ঞানী চাচা বলে। হঠাৎ জ্ঞানী দাদু উধাও হয়ে গেলেন। তার হঠাৎ অনুপস্থিতির ফলে গ্রামে চুরির সংখ্যা বৃদ্ধি পেল। কিন্তু চোরকে ধরা তো দূরে থাক, কেউ বুঝতেও পারে না তার চেহারা। কেননা চোর অনেক বুদ্ধিমান, চুরির সময় বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধরে চুরি করে। এভাবে প্রতিদিন চুরি আর চোর ধরতে না পারায় গ্রামের সবাই তো মহাচিন্তিত। এদিকে জ্ঞানী দাদু উধাও, তাই আমরাও চিন্তিত। চোর ধরার জন্য অনেকেই পুরস্কার দিতে চাচ্ছেন, কিন্তু কেউ চোর ধরতে পারছে না।

শেষমেশ চোরের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে কেউ কেউ এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া শুরু করলেন। এসব ভেবে গ্রামের কর্তা বাবুরাও বেশ চিন্তায় পরে গেলেন। অনেকদিন হয়ে গেল, তবুও কেউ চুরি থামাতে পারে নি। যার ফলে দিনে দিনে গ্রামে মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এদিকে জ্ঞানী দাদুরও দেখা নেই।

হঠাৎ তিন দিন পর কোথা থেকে জ্ঞানী দাদু হাজির। আমরা সবাই উল্লাসিত, ভাবছি এবার বুঝি চোরের পালা শেষ। কর্তা মশাইরা জ্ঞানী দাদুকে সব বললেন। দাদু শুধু শোনেন আর হাসেন, সবাই অবাক হয়ে যাই। মাত্র এই কয়দিনে জ্ঞানী দাদুর এত পরিবর্তন? দাদু কোথায় ছিলেন, তাও আমাদের জানালেন না। ব্যস্ততার কথা বলে চলে গেলেন বাসার দিকে। পরদিন খবর এলো, গ্রামকর্তার বাড়িতে চুরি। কর্তার আদেশে আমি আর পল্টু ছুটলাম জ্ঞানী দাদুর বাসায়, কিন্তু জ্ঞানী দাদু নাকি আসেন নি। মাসীমা আরো বললেন, ‘গতকাল তোদের দাদুর চিঠি পেয়েছি, তিনি পরশুদিন গ্রামে ফিরবেন।’ পল্টু মাসীমাকে কিছু বলতে যাবে, অমনি সময় পল্টুর মুখ চেপে মাসীমাকে বললাম, ‘আচ্ছা মাসীমা আমরা আসছি, জ্ঞানী দাদু এলেই তুমি গ্রামকর্তার সঙ্গে দেখা করতে বলো।’ কিছু দূর যেয়ে আমি পল্টুর দিকে চেয়ে বললাম, ‘যা বুঝলাম, আমাদেরই এর সমাধান করতে হবে। দাদুর জন্য অপেক্ষা করলে চলবে না।’ পল্টুও ভেবে বললো, ‘ঠিক আছে। কি করবি?’ আমি পল্টুর কানে কানে বুঝিয়ে বললাম। এরপর গ্রামকর্তার কাছে গিয়ে জানালাম, জ্ঞানী দাদু বাড়ি ফিরেনি। কাল যে এসেছিল, সে আসলে জ্ঞানী দাদুর ছদ্মবেশধারী চোর। চোর ধরার উপায় পেয়েছি বলে গ্রাম কর্তার কাছে আমি একটা প্রস্তাব দিলাম প্রস্তাবটা শুনেই তিনি রাজি হয়ে গেলেন। একটু পরেই সব আয়োজন সমাপ্ত।

গ্রামে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, আজকে রাতে কর্তা বাড়িতে যাত্রাদল আসছে, যাত্রা হবে সঙ্গে নাচ-গান তো আছেই। আরো বলা হলো, ‘অনুষ্ঠান শেষে লটারি হবে, লটারিতে বিজয়ী একজন পাবে দশ হাজার টাকা।’ রাতে যাত্রা দেখতে গ্রামের অনেকেই উপস্থিত, একটা বাক্সে সমস্ত টাকা-পয়সা রেখে দেয়া হয়েছে। হঠাৎ যাত্রার মাঝে পল্টু এসে বললো, ‘আমাদের কাজ হয়ে গেছে। সবাই একবার এদিকে আসুন।’ গিয়ে দেখি গ্রামকর্তা অজ্ঞান অবস্থায় শুয়ে আছেন। সবাই বেশ অবাক! এ

বার একটানে পল্টু তার মুখোশ খুলে দেখাল, শুয়ে আছে জ্ঞানী দাদুর একমাত্র ছেলে হাবুল। আমাদের আর বুঝতে বাকি রইলো না, জ্ঞান দাদুকে বাহিরে বেড়াতে পাঠিয়ে হাবুল এতদিন গ্রামে এসব কুকর্ম করেছে। তখন কর্তাবাবু সকলের সামনে আমাকে ধন্য ধন্য করলেন আর বললেন, ‘আবিরের বুদ্ধির পুরস্কার হিসেবে আমার পক্ষ থেকে কিছু উপহার দিচ্ছি। আমার আর কি করার? আমি সে পুরস্কার নিয়ে বাসায় চলে এলাম, বাসায় এসে মাকে দেখাতেই তিনি আতঙ্কিত হয়ে বললেন, ‘কিরে চোর আবার নিয়ে যাবে না তো?’ আমি বললাম, ‘মা, তুমি নিশ্চয় যাত্রা দেখতে যাও নি? গেলে সব জলের মতো পরিষ্কার বুঝতে পারতে।’

About the Author ফাতিন ইসরাক আবির

follow me on:

Leave a Comment: