‎চরাচর‬ (পর্ব – ১)

ঠাস করে চড়টা গালে এসে পড়তেই টের পেলাম।কিছুটা ব্যাথা পাচ্ছিলাম তবে অন্য কেউ হলে ওরে মারে বাবারে বলে কেদে উঠতো। আমি কাদিনি তার কারণ রোজই ওরকম দু চারটা চড় খেয়ে খেয়ে আমার অভ্যাস হয়ে গেছে।চড়টা মেরেছিল ডান গালে। সাথে সাথে আমি বা গালটা এগিয়ে দিয়ে বললাম নিন আরেকটা মারুন।দান দান দুই দান তিন দানে ছক্কা।আমার কথা শুনে সে ভড়কে গেল কিনা জানিনা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো আমার দিকে। এর আগে যতবার এরকমটি ঘটেছে ততোবারই দেখেছি একই ঘটনা। শুধু স্থান কাল পাত্র আলাদা।আমি বাম গালটা এগিয়ে দেওয়ার পরও সে চড় মারলো না।বিষয়টা হলো বাবার সদ্য কেনা বাইকটা নিয়ে আমি হাকিয়েছি সেই বেগে। মাথায় কোন হেলমেট নেই।অন দ্যা ওয়ে এক সার্জেন্ট আমাকে ধরে বসলো।ইচ্ছে হচ্ছিল এমন জোরে বাইক ছুটাই যেন সার্জেন্ট কেন জ্যামাইকা থেকে উসাইন বোল্ট আসলেও আমাকে ধরতে পারবে না। কিন্তু আমি আবার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। বাবা আমাকে শিখিয়েছেন আর কিছু পারিস আর না পারিস সব সময় আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবি আর সত্য কথা বলতে পিছ পা হবিনা। বাবা আমাকে প্রায়ই এই ছবক দিতেন। একদিন বাবাকে বললাম আচ্ছা বাবা তুমি যে সিগারেট খাও এটা কি ঠিক?তুমি নিজেতো নিজের ক্ষতি করতেছই পাশাপাশি আমাদেরও ক্ষতি করতেছ।আমার কথা শেষ হোক বা না হোক বাবা ঠাস করে আমার ডান গালে চড় বসিয়ে দিলেন।সেই চড় খেয়ে আমার গালে নিশ্চিত পাচ আঙ্গুলের দাগ পড়ে গেল।

আমি যখন উরে মারে মরে গেলাম করে কেদে উঠেছি বাবা তখন মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে বাম গালেও পাচ আঙ্গুলের ছাপ বসিয়ে দিলেন।আমার কান্না দ্বিগুন হওয়ার পরিবর্তে একেবারে থেমে গেল এবং আমি রেগে মেগে আগুন হয়ে গেলাম। বাবাকে বললাম এটা কি হলো বাবা? আমাকে মারলে কেন? বাবা বললেন মুখের উপর কথা বলিস। মুখ টিপলে দুধ বের হয় আবার বড় বড় কথা।সিগারেট খাওয়া না খাওয়া কি তোর কাছ থেকে শিখতে হবে? আমি বললাম বাবা তুমিই বলেছ সত্য কথা বলতে কোন অবস্থাতেই পিছপা না হতে।আমি শুধু সত্যটা বলেছি। সত্য স্বীকার করতে যদি এতই কষ্ট হয় তবে সত্য শেখাতে চাও কেন?আর হ্যা বাবা এই যে তুমি বললে আমি দুধের শিশু মুখ টিপলে দুধ বের হয়।তাহলে রোজ আকিদুলদের বাড়ি থেকে দুধ না কিনে আমার মুখ টিপতে পারো না? তাহলেতো কিছু টাকা অন্তত বেচে যায়।কি জানি কি হলো আমি ভাবলাম আগেতো দুই গালে দুটো চড় পড়েছিল এবার পিঠের ছাল চামড়া এক হয়ে যাবে। অথচ হলো তার উল্টোটা। বাবা ফিক করে হেসে দিলেন।মাকে ডেকে বললেন এই যে শোন তোমার ছেলের কথা। কাল থেকে আকিদুলদের বলে দিও আর দুধ দিতে হবেনা।তোমার ছেলের মুখ টিপলেই এখন থেকে দুধ পাওয়া যাবে।এর পর একদিন দেখি বাবা সত্যি সত্যি সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। তখন থেকে আমি সত্য কথা বলতে পিছপা হইনা।সে জন্য অবশ্য নিয়মিত চড়ও খেতে হয়।কিন্তু আমার কথায় বাবার মত কেউ বদলে যায় না।

এই যে একটু আগে ডান গালে চড় খাওয়ার পর বাম গাল এগিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করলাম পরের চড়টা খাবো বলে তা আর খাওয়া হলো না।আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলেই সার্জেন্ট কল করার সাথে সাথে বাইক থামিয়ে দিলাম। কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন হেলমেট কোথায়? আমি বললাম স্যার হেলমেটতো বাসায় রেখে এসেছি।তিনি সাথে সাথে রশিদ ধরিয়ে দিলেন।তেমন কিছুনা একটা কেস আর জরিমানা।আমি জানি ও দুটোর কোনটাই আমাকে পরিশোধ করতে হবেনা।আমি যদি জাষ্ট মুখে মুখে একজনের নাম উচ্চারণ করি তবে জরিমানা কিংবা কেস তো দূরের কথা আমার সাত খুন মাফ হয়ে যাবে।কিন্তু তার নাম আগেই উচ্চারণ করা উচিত হবে কিনা চিন্তা করি।আশেপাশে তাকাই। আমার এদিক সেদিক তাকানো দেখে সার্জেন্ট জানতে চান কি হলো জরিমানা বের কর।আমি বললাম এক মিনিট স্যার আপনার মোটর সাইকেলের সাথেওতো কোন হেলমেট দেখছিনা।

তা আপনাকে কে কেস খাওয়াবে আর কে আপনার থেকে জরিমানা তুলবে বলুন দেখি। এটা বলার সাথে সাথে ঠাস করে একটা শব্দ হলো। বুঝতে নিশ্চই অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে ঠাস শব্দটা এসেছিল আমার গাল থেকে। কারণ চড়টা বসিয়েছিলেন আমার গালে।আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলেই কিছু বলিনি না হলে আমিওতো একটা ঠাস করে শব্দ তৈরি করতে পারতাম।কিন্তু আমি সেটা না করে অন্য গাল এগিয়ে দিলাম।পুলিশ সার্জেন্ট জানতে চাইলেন কি হইছে? আমি বললাম দিন না স্যার আরেকটা ঠাস করে চড়। আমার কথা শুনে তিনি আকাশ পাতাল ভাবলেন। আমি পাগল কিনা তা নিয়ে তার সন্দেহ শুরু হলো।সে দ্বিধায় পড়ে গেল। আমি তাকে বললাম স্যার দেরি করছেন কেন? আরেকটা ঠাস করে চড় মারুন আমার বাম গালে। না হলে সবর্নাশ হয়ে যাবে। আমার মুখে সবর্নাশ হয়ে যাবে কথাটা শুনে তিনি ঘাবড়ে গেলেন। জানতে চাইলেন কি সবর্নাশ হবে? আমি বললাম শোনে নাই? এক গালে চড় খেলে সারা জীবন বউয়ের গোলামী করতে হয় আর দুই গালে চড় খেলে বউ নিজের বশে থাকে।

সত্যি বলছি কি যেন হয়ে গেল সেই পুলিশ সার্জেন্টের। দেখি আমার গালে চড় না মেরে আমার হাত থেকে কেস লেখা কাগজটা ছিড়ে ফেললো আর জরিমানার রশিদটাও ছিড়ে ফেললো। আর বললো তুমি যা বলছো এটা কি সত্যি? দুই গালে চড় খেলে সত্যিই কি বউ বশে আসে?আমি আর কি বলবো বললাম সত্যি না হলে কি কেউ জেচে ওভাবে চড় খেতে চায়?এটা বলার সাথে সাথে দেখি পুলিশ সার্জেন্ট নিজের মাথার চুল ছিড়ছে। আমি বলি স্যার কোন সমস্যা? আপনাকে খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে।তিনি ধমক দিয়ে বললেন তুই আগে কোথায় ছিলিরে?আমার সবর্নাশ হওয়ার আগে কেন আমার সাথে দেখা করিস নি?আমার মাথা আওলায় যাচ্ছিল। পুলিশ সার্জেন্টের আবার কি হয়ে গেল? আমি বললাম স্যার বুঝলাম না ব্যাপারটা। একটু খুলে বলুন তো।তখন তিনি বললেন আরে আমার ট্রেনিং এর সময় স্যার আমাকে চড় মেরেছিলেন এক গালে। কথাটা যদি আগে জানা থাকতো তাহলে অন্য গালেও একটা চড় খেয়ে নিতাম। আমি বললাম স্যার তার মানে হলো আপনি আপনার বউয়ের তাবেদারি করেন?

পুলিশ সার্জেন্ট হঠাৎ করে বললেন আরে না না সেরকম কিছু না। এই আরকি। যাহ তুই চলে যা। তোর জন্য কেস মাফ করে দিলাম। জরিমানাও দিতে হবেনা। তুই আমার বড় উপকার করলিরে।আমি বুঝলাম স্যারের ভিতরের কাহিনী।আমি বললাম তা স্যার আপনাকে ট্রেনিং এর সময় জামসেদ মিয়া কোন গালে চড় মেরেছিল? এটা বলার সাথে সাথে পুলিশ সার্জেন্ট হাউমাউ করে কেদে উঠলো। আমি লজ্জায় পড়ে গেলাম। ভাগ্যিস আশেপাশে কেউ ছিলনা। পুলিশ কাদছে দেখলে কে কি মনে করতো। আমি বিষয়টা বুঝার আগেই দেখি পুলিশ সার্জেন্ট আমার হাত চেপে ধরে বলছে বাবা মাফ করে দেন আমি আপনাকে চিনতে পারিনি।আপনাকে পথে আটকেছি বেয়াদবি হয়েছে। আপনি আমাকে মাফ করে দেন। আমি কি হচ্ছে তা বুঝতেই পারছিনা।কেস খেলাম আমি সেই কেস বাতিল হলো আর এখন আমাকে আপনি করে বলছে তাও আবার বাবা বলে ডাকতে ডাকতে।আমার মুখে সবে মাত্র খোচাখোচা দাড়ি গজাতে শুরু করেছে। এখনো শেভ করা শুরু করিনি। করবো করবো করেও করা হচ্ছেনা লজ্জায় আর ভয়ে। শেভ করলে কেউ দেখে ফেললে কি হবে,কে কি ভাববে সেটা ভেবেই শেভ করা হয়নি। আর পুলিশ সার্জেন্ট আমাকে বাবা বলে ডাকছে কেন?

পুলিশ সার্জেন্টের বুকের উপর নেম প্লেটে তার নাম লেখা ছিল।আনারুল নামে সেই সার্জেন্টকে বললাম স্যার এটা কি করছেন হাত ছাড়ুন। আর আমিতো সেরকম কেউ না। বলুন কি হইছে আপনি এমন করছেন কেন?আনারুল নামের সেই পুলিশ সার্জেন্টের কথা শুনে বুঝতে পারলাম তাকে ট্রেনিং এর সময় সে স্যার চড় মেরেছিলেন তার নাম ছিল জামসেদ।আমি যে জামসেদ নামটা বলেছি তাতেই স্যার মনে করেছেন আমি পীর দরবেশ টাইপের কিছু।কিন্তু আমিতো সেরকম কেউ নই। যাষ্ট বন্ধুরা যখন আড্ডা দেই তখন কেউ যদি ঘাউরামি করে তাকে জামসেদ নামে ডাকি। যেহেতু এই সার্জেন্টকে তার স্যার মেরেছিল তাই তাকে জামসেদ ডেকেছি।আমি বললাম স্যার আপনি যা ভাবছেন আমি সেরকম কেউ নই।আসল ঘটনা হলো এটা। আমার কথা শুনে সার্জেন্ট ধমকে উঠে বললেন শালা হতচ্ছাড়া আমার সাথে টাউটামি করিস?বলেই ঘ্যাসাঘ্যাস আবার জরিমানা করে দিলেন। সাথে নতুন করে আবার কেস লিখে ফেললেন।এবার ভাবতেছি নামটা উচ্চারণ করতেই হয়। জরিমানা দেওয়া কেস খাওয়ার চেয়ে নামটা উচ্চারণ করলেই মনে হয় বেশ হয়।

About the Author জাজাফী

লেখক হয়ে জন্ম নেইনি, লেখক হতেও নয়। তবু আমি লেখক হলে, সেটাই হবে ভয়। জাজাফী এমন একজন যার অতীত এবং ভবিষ্যৎ জানা নেই, বর্তমানই সব।

follow me on:

Leave a Comment: