Opkkha Uwriter

অপেক্ষা

নির্জন রাস্তা দিয়ে একা একা হেঁটে যাচ্ছি। চোখ বন্ধ। অবশ্য চোখ খোলা রাখা বা বন্ধ রাখার মধ্যে এ মুহূর্তে কোন পাথ্যক্য নেই। চারদিকে কালিগোড়া অন্ধকার। অমাবশ্যার রাত্রি। প্রায় প্রতিরাতেই এ সময় হাঁটতে বের হই আমি। একা মানুষ। বাবা-মা তো সেই কবেই ওপারে চলে গেছে। তাই আমার এসব পাগলামীতে বাঁধা দেওয়ারও কেউ নেই। অবশ্য একবছর আগে ছিলো একজন।

রুপা।

রাগ করতো ও-এতো রাতে বের হতাম বলে।

মেয়েটা প্রচন্ড ভালবাসতো আমাকে। যদিও তা কখনো আমার কাছে অতিরিক্ত নেকামো ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি।
এত ভালবাসা সহ্য হয়নি আমার। একরাতে তাই সব শেষ করে দিয়েছি। বাগানের কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে শান্তিতে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছি মেয়েটাকে!

ডুপ্লেক্স বাড়িটাতে একাই থাকি এখন আমি। দাদাভাই তৈরী করেছিলেন। গভমেন্টের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন আমার দাদা। বাবা আর দাদার যে ব্যাংক ব্যলেন্স আছে তাতে শুধু আমি কেন আমার তিন পুরুষ পায়ের উপর পা তুলে খেতে পারবে রাজার হালেই! তাই রাজ্যের যত পাগলামী আছে সব ভর করে আছে আমার উপর। পৃথিবীর চিরাচরিত নিয়ম মানতে ভালো লাগেনা আমার। এই যেমন রাতে হাঁটার কথাই ধরুন না-অতো রাতে কেউ এমন পাগলামী করে?

অবশ্য আগে উদ্দেশ্যহীন ভাবেই হাঁটতাম।

সারারাত শহরের এ গলি ও গলি ঘুড়ে সকালে বাসায় ফিরতাম। তারপর সারাদিন মরার মতো ঘুমিয়ে আবার গভীর রাতে শুরু করতাম নিত্যদিনকার মতো গোলকধাঁধায় পথচলা। সেদিনও প্রতিদিনকার মতো হাঁটতে বের হয়েছিলাম। পূর্নিমা ছিলো। উথাল পাথাল চাঁদের আলো ঝরছিলো আকাশ থেকে। সব কিছু দিনের মতোই লাগছিলো আমার কাছে। এজন্য সামান্য মন খারাপ। অন্ধকারের প্রানী আমি। এভাবে দিনের মতো আলো থাকলে ভালো লাগে? বাগানের আলো আঁধারির ভূতুরে পরিবেশে হাঁটছিলাম একা একা। এমন সময় পেছন থেকে কেউ আমার নাম ধরে ডেকে ওঠে।

পেছনে তাকিয়ে চমকে উঠি। রুপা দাঁড়িয়ে আছে। হ্যালুসিনেশন ভবে পাত্তা দেই না। আর আমার শরীরের যে অবস্থা তাতে হ্যালুসিনেশন না হওয়াটাই অস্বাভাবিক। গত দুই দিন আগে বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর আসছে। এখনো জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। তারপরও হাঁটতে বের হয়েছি।পেছন থেকে আবার রুপা ডেকে উঠল-ফাহিম।

ভয়ে যেন জমে গেলাম আমি। যন্ত্রের মতো আদেশ পালন করে পেছনে তাকালাম। রুপা আবার বলল-‘আমাকে ভয় পাচ্ছ কেন ফাহিম? তোমার ক্ষতি করার মতো কোন শক্তিই তো আমার নেই এখন আর। আমার সাথে একটু বসবে এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে?

আমি স্পষ্ট দেখলাম মেয়েটার চোখের কোনায় জল। কাঁদছে। আমার মনে হলো আমার শরীরের সমম্ত অঙ্গ প্রতঙ্গের নিয়ন্ত্রণ রুপার হাতে। তার অদৃশ্য নির্দেশে আমি আস্তে আস্তে কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে চলতে লাগলাম।

‘বসো এখানে। আমার পাশে’-আমার মাথার ভেতরে বাক্য দুটি শুনতে পেলাম। আদেশ না অনুরোধ বোধগম্য হলো না।

রুপার পাশে বসে আছি আমি। কি হচ্ছে এসব কিছুই বুঝতে পারছিনা আমি। শুধু মনে হচ্ছে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। গুটিশুটি মেরে আমার হাত জড়িয়ে ধরে রুপা বসে আসে। এতো শক্ত করে ধরে আছে যে ব্যথা পাচ্ছি। একবছর আগের কথা মনে পড়লো আমার। সেদিনও মেয়েটা এভাবেই আমাকে জড়িয়ে ধরে বসে ছিলো। এই একই জায়গায়।

ঘুম ভাংতেই খেয়াল হলো ফ্লোরের উপরে শুয়ে আছি। জ্বর একদম ভালো হয়ে গেছে। সামনে আমার ডায়রীটা খোলা পড়ে আছে। হাতে তুলে নিয়েই চমকে উঠলাম-ঠিক রাতের মতোই। রাতে কি কি ঘটেছে সব লেখা এতে। মুহুর্তেই সব বুঝতে পারলাম। রাতে কিছুই হয়নি। সবই আমার কল্পনা ছিলো। তবে কিছুটা খটকা লাগছে। রাতে তো আমি প্রতিদিনের মতোই বাইরে বের হয়েছিলাম। তাহলে ডায়রীতে লিখলাম কখন?

উফ! কিছু একটা অবশ্যই হয়েছে রাতে।

অতিপ্রাকৃত বিষয়গুলাতে আমার কখনোই বিশ্বাস ছিলো না। আমি বিশ্বাস করিনা ব্যাখ্যার অতীত কিছু আছে। মানুষ যে অতিপ্রাকৃত গল্প শোনায় প্রায় সবটাই তার কল্পনা। আর সামান্য কিছু পরিবেশ পরিস্থির প্রভাবে ঘটে থাকে। তবে আজ কেমন যেন সব ওলট পালট হয়ে যাচ্ছে। আমার এতোদিনের দর্শন সব নড়বড়ে লাগছে। আসলেই কি ব্যাখ্যার অতীত কিছু আছে? ডায়রীটা আবার উল্টে পাল্টে দেখা শুরু করলাম। এই লেখাটুকু আগেই লেখা কিনা দেখা প্রয়োজন। ডায়রীতে কিছু লেখার পর সাথে তারিখটাও দিয়ে রাখি আমি-তাই লেখার সময় বের করা কোন সমস্যাই না। সকালবেলা এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো চমকে উঠলাম আমি। তারিখের উপরে পেঁচানো অক্ষরে ‘আর’ সাইন দেয়া। এ সাইন চিনি আমি, খুব ভালভাবেই। এভাবে রুপা সিগনেচার দিতো। ওর প্রতিটা চিঠির নিচে এই সাইনটা থাকতো। কিন্তু এই সাইন এখানে আসলো কিভাবে? এটা আমার পার্সোনাল ডায়রী। রুপাকে তো এটার কথা কথনো জানাইনি আমি।উফ! পাগল হয়ে যাচ্ছি নাকি আমি?

‘সব তোমার কল্পনা ছাড়া আর কিছুই না, ফাহিম’-দ্বিতীয়বারের মতো কথাটা বললেন প্রফেসর রহমান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজির প্রফেসর ছিলেন ভদ্রলোক। এখন অবসরে আছেন। আমাদের শহরেই একটা হসপিটালে বসেন এখন মাঝে মাঝে। সকালের ঐ ঘটনার পর আর দেরী করিনি। সরাসরি এখানে চলে এসেছি। বিষয়টা আমার কাছে অতটা সিরিয়াস হতো না যদি রুপা জড়িত না থাকতো। মেয়েটাকে মেরে ফেলার পর থেকেই আমি বুঝতে শুরু করি আমি কতটা ডিপেন্ডেড ছিলাম ওর উপর। যতই দিন যাচ্ছে ততোই যেন আরো বেশী ভালবেসে ফেলছি মেয়েটাকে।

‘আমারও তাই মনে হয়। কিন্তু ডায়রীর বিষয়টা?’-প্রশ্ন করলাম মনোবিদকে।

‘ঐ কাজ তোমারই করা।’-কিছুটা হেসে উত্তর দিলেন তিনি।

‘কিন্তু, আমি তো কাল রাতেও হাঁটতে বের হয়েছিলাম?’

‘উহু, কোন কিন্তু নয়। কাল তুমি মোটেও হাঁটতে বের হওনি। মেয়েটাকে নিয়ে অতিরিক্ত ভেবে ভেবেই তোমার হ্যালুসিনেশন হয়েছে। আর কাল রাতে প্রচন্ড বৃষ্টি হয়েছে। রাতে যদি বের হতে তুমি তাহলে তোমার জামা কাপড় ভেজা থাকতো নিশ্চই? যেহেতু তা হয়নি তাই বুঝতেই পারছো। আর শোন, এইসব পাগলামী বাদ দিয়ে রুপা মেয়েটাকে খুঁজে বের কর। এরপর বিয়ে করে ফেলো। ব্যাস ঝামেলা চুকে যাবে। হাহা.. বুঝতে পেরেছো! আর হ্যাঁ, বিয়েতে দাওয়াত দিতে ভুলোনা কিন্তু।’

মাথা নাড়িয়ে একটু হাসলাম-সামনে বসে থাকা এই বৃদ্ধ মানুষটাকে সব জানালেও বলতে পারিনি আমি একটা খুনী। রুপাকে খুন করেছি আমি। ঠান্ডা মাথায়-নিজের হাতে। আর তার ব্যাখ্যাও আমি মেনে নিতে পারিনি। কারন বৃষ্টি হয়েছে সকালে; আমার ঘুম ভাঙার পর-রাতে নয়। ঘুম ভাঙার পরও আমি সব কিছু শুকনা খটখটেই পেয়েছি। ভুল তথ্য দিয়েছেন তিনি আমাকে-এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। সম্ভবত ইচ্ছে করেই। কারন এছাড়া আর ব্যাখ্যা নেই তার কাছে।

বাসায় ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে গেছে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে আবার সব নতুন করে চিন্তা করার চেষ্টা করছি। কিন্তু ঘুমে দুচোখ জড়িয়ে আসছে। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতেই পারিনি। ঘুম ভাংল যখন তখন গভীর রাত। ড্রইংরুমের গ্রান্ডফাদার ক্লকটা শব্দ করে সময় জানান দিচ্ছে-একটা বেজে গেছে। বুঝতে পারলাম এই শব্দেই ঘুম ভেঙেছে আমার।

আজও হাঁটতে বের হলাম। তবে বড় রাস্তার দিকে না যেয়ে সরাসরি বাগানে গেলাম আজ। কালকের ঘটনার সত্য মিথ্যা যাচাই করা প্রয়োজন। আজও যদি পুনরাবৃত্তি হয়-দেখা তো প্রয়োজন! আস্তে আস্তে কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচ দিয়ে হাঁটছি। কিছুই তো হচ্ছে না আজ। নিরাশ হতে হলো আমাকে। গতরাতের ঘটনা কি হ্যালুসিনেশনই ছিলো। আমিই কি ডায়রীতে ঐসব লিখে নিজেই রুপার সাইন দিয়েছি? কিন্তু আমি তো ওর সাইন নকল করতে পারিনা। আর কখনো চেষ্টাও করিনি।এরপরও আরো দুইদিন নিয়ম করে বাগানে গেলাম। কিন্তু ফলাফল সেই শূন্যই। ঐরাতের ঘটনাকে হ্যালুসিনেশনই ভেবেই উড়িয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু মনের ভেতর খচখচানিটার জন্য পারলাম না। কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া হলো না। আসলেই হয়তো ব্যাখ্যার অতীত আছে কিছু। হয়তো নেই। অথবা আবার হয়তো কোন এক জোছনা স্নানের রাতে তার আগমনে ভয় পেয়ে কুঁকড়ে যাবো। তবু প্রশ্নগুলোর উত্তর তো পেয়ে যাবো।

Leave a Comment: