Megher Opare Uwriter.club

মেঘের ওপারে

এক

আচ্ছা, তোমার নূপুর আছে? পায়েল না, নূপুর? রুপার নূপুর?’

ম্যাসেজটা দেখেই এষার হাসি পাচ্ছে। কদিনের পরিচয় ছেলেটার সাথেএক সপ্তাহও হয়তো হবে না। অথচ সারাদিনই এটা ওটা প্রশ্ন আছেই। এষা তেমন একটা পাত্তা না দিলেও নির্লজ্জের মতো ম্যাসেজ পাঠিয়েই যাবে।

এষা ঠিক করেছে একদিন তাকে কড়া কিছু কথা শুনিয়ে দেবে। কি কি বলবে মনে মনে সব ঠিকও করে রাখে কিন্তু শেষপর্যন্ত আর বলা হয় না

নাহ নেই।’এষার ছোট্ট উত্তর। যদিও তার দুই সেট নূপুর আছে। রুপার নূপুর। গত জন্মদিনে এষার দাদীমা বানিয়ে দিয়েছেন। ইচ্ছে করেই মিথ্যে বললো। সত্যি বললে আবার কি না কি বলবে, এর চেয়ে মিথ্যেই ভালো।

.

অপু ভেবেই পায় না এই মেয়েটা অকারণে মিথ্যে বলে কেনো। কথা বলতে ইচ্ছে না করলে রিপ্লাই না দিলেই তো হয়। মিথ্যে বলার কি প্রয়োজন? অপু খুব ভালো করেই জানে এষার নূপুর আছে। প্রথমদিনই এটা খেয়াল করেছে সে। নূপুর ছাড়া কেন যেন মেয়েদের অসম্পূর্ণ মনে হয় অপুর।

মিথ্যে বলছো কেনো?’- টাইপ করেই আবার সাথেসাথেই ব্যাকস্পেস চেপে মুছে ফেললো অপুমন খারাপ করতে পারে মেয়েটা। অপু চায় না এই মেয়েটা মন খারাপ করে তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিক। তার কারণ হয়তো একটাইএষাকে অসম্ভব রকমের পছন্দ করে সে।

.

দুই

তুমি কি সত্যিই বাইরে চলে যাচ্ছো?’ এষার চোখ পানিতে টলমল করছে। অপু ভেবেই পায় না এই মেয়েটা অল্পতেই কেনো কেঁদে ফেলে। অপু উত্তর না দিয়ে সামনে ভাসতে থাকা লাল শাপলাটা দিকে হাত বাড়াতেই হুড়মুড় করে নৌকা থেকে পানিতে পড়ে গেলো। এষা ফ্যালফ্যাল করে অপুর দিকে তাকিয়ে আছে, সে এখনো বুঝতেই পারেনি হুট করে কি থেকে কি হয়ে গেলো।

দ্রুত হাতে শাপলাটা তুলে নিয়ে নৌকায় উঠে এলো অপু

মায়াবতী, এটা আপনার জন্য।’

এই মুহুর্তে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হচ্ছে এষার। কথায় কথায়ই একদিন সে লাল শাপলার কথা বলেছিলো অপুকে। কে জানতো এই ছেলেটা এখনো সেটা মনে রেখেছে। এষা বুঝতে পারছে এই ছেলেটার মায়ার বলয় সে কখনোই অতিক্রম করতে পারবে নাবিব্রত ভঙ্গিতে সামনে বসে থাকা পানিতে ঘোলা হয়ে যাওয়া চশমা পড়া এই ভেজা মানুষটাকে সে অসম্ভব রকমের ভালবাসে।

এতো তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যেতে হচ্ছে বলে খারাপ লাগছে অপুর। অনেক প্ল্যান ছিলো আজপানিতে পরে না গেলে হয়তো সবই হতো। প্রায় এক বছর পর গতকাল রাতে এষা তার প্রোপজাল এক্সেপ্ট করেছে। যদিও অপু অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলো এষা তাকে পছন্দ করে। আবার গতরাতেই সে হার্ভাডের স্কলারশিপের অফারটাও পেয়েছে। মূলত আজ এটা নিয়ে কথা বলার জন্যই দেখা করেছিলো। কিন্তু এই নৌকায় উঠেই সব ভেস্তে গেলো। না পারলো এষাকে কিছু বলতে আর না পারলো তাকে নূপুরটা দিতে।

গোসল করে অপু ফেসবুকে লগইন করতেই এষার ম্যাসেজটা ফোনের স্কিনে ভেসে উঠলো

এ্যই, বিকেলে তোমার সময় আছে না? বিকেলে পার্কে এসো।’

তিন

বুঝতে চেষ্টা করো এষাএমন সুযোগ জীবনে বারবার আসে না। আর, ছয়সাত মাস পর তো তোমার গ্রেজুয়েশনও কমপ্লিট হচ্ছে। তখন তো তুমিও আসতে পারবে।’

আমি তোমাকে ছাড়া একটা দিনও থাকতে পারবো না। আমাকে বিয়ে করে নিয়ে যাও।’

বিয়েটা সমস্যা না এষা, তুমি চাইলে আমি এখনই তোমায় বিয়ে করতে পারি। কিন্তু তোমার পড়াশোনা?’

আমার আর পড়াশোনার প্রয়োজন নেই। যেটুকু হয়েছে এটাই এনাফ। আমার লাইফে তোমার চেয়ে পড়াশোনাটা বেশী ইম্পরট্যান্ট না।’

এটা কখনোই সম্ভব না এষা। তুমি অবশ্যই পড়াশোনাটা শেষ করবে।’

আমি পারবো না।’

ওকে আমি যাচ্ছি না তাহলে। খুশি এবার? এখন বাসায় চলোসন্ধ্যা হয়ে আসছে।’

এষাকে বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে অপু হেঁটে হেঁটে নিজের বাসায় ফিরছে। কিছুই ভাবতে পারছে না কি করবে সে? একদিকে এষা আর অন্য দিকে হার্ভার্ডের হাতছানি।

তুমি বাইরে যাচ্ছো। এটাই ফাইনাল।’দুটো লাইন টাইপ করতেই এষার মসৃণ গাল বেয়ে টুপটাপ করে জল গড়িয়ে পড়া শুরু করলো। তারপরও সেন্ড অপশনটা প্রেস করে দিলো সে। তারজন্য অপুর কোন ইচ্ছে অপুর্ণ থাকবে এটা সে কখনোই হতে দিতে পারবে নাযতই কষ্ট হোক।

জানালা গলে উথালপাথাল শহুরে জোছনার আলো ঢুকছে এষার ঘরে। কিন্তু ঘরভর্তি এই থইথই আলোও এষাকে স্পর্শ করতে না পেরে যেন মুখ লুকোনোর জায়গা খুঁজছে। একজন মায়াবতী ভালবেসে কারো জন্য চোখের জলে বালিশ ভেজাবেএর চেয়ে বিষাদময় কিছু পৃথিবীতে হয়তো আর দ্বিতীয়টি নেই

(মূল গল্প এখানেই শেষ। এষা অথবা অপু শেষ পর্যন্ত অ্যামেরিকায় পা রাখতে পেরেছিলো কিনা সেটা আমার জানা নেই। তবে আপনারা যারা অতিরিক্ত আগ্রহ নিয়ে পুরো গল্পটা পড়েছেন তাদেরকে মাঝ নদীতে ছেড়ে দেয়াটা অন্যায় হয়ে যায়। এজন্য দুটো পথ দেখিয়ে যাচ্ছি আমি। যেভাবে আপনাদের ভাললাগে সেভাবেই শেষটা কল্পনা করে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো।)

কনকনে শীতের মধ্য দিয়ে পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে অপু আর তার আট বছরের মেয়ে রাফা। বোস্টনের এই এলাকায় শীতটা যেন সবসময় একটু বেশীই। আজ আবার তুষার ঝড় শুরু হয়েছে। স্টেট কাউন্সিলর আজ সকলকে বাড়ি থেকে বের হতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু অপু আজ সেটা কোনভাবেই মানতে পারবে না। আজ থেকে দশবছর আগে ঠিক এইদিনেই এষার সাথে তার প্রথম দেখা হয়েছিলো। অন্তত সেই স্মৃতিটুকু বাঁচিয়ে রাখার জন্য হলেও আজ তারা পাশাপাশি থাকবেএকজন মাটির নিচে অন্যজন না হয় উপরেই।।

অথবা,

লাল বেনারসিতে অপুর্ব লাগছে এষাকে। এষার হবু স্বামী আবীর রহমান মুগ্ধ দৃষ্টিতে এষার দিকে তাকিয়ে আছে। তার মুগ্ধতার আড়ালে অতি অবহেলেই এষার অশ্রুসিক্ত চীৎকার করে ভালো নেই বলতে থাকা চোখদুটো হারিয়ে গেলো। এষা জানে, শেষপর্যন্ত তার এই ভালো না থাকা অতি সহজেই পাশে বসে থাকা স্বামীনামক ভালোমানুষটাকেও স্পর্শ করে ফেলবে। কারণ এই লোকটা প্রথমেই কঠিনভাবে তার প্রেমে পরে গেছে আর সে নিজে ওপাড়ের ডাকে সাড়া দিয়ে ফেলেছে, যেখান থেকে সে বা অপু কেউ কখনোই আর খুব করে চাইলেও ফিরে আসতে পারবে না।

Leave a Comment: