The Doll Uwriter

দ্যা ডল

তোমার এই আবেগটা শেষ পর্যন্ত থাকবে না, ভুলে যাও আমাকেসেটাই ভালো হবে। হাঁটতে না পারা একজন মেয়ে কখনোই কারো ভালবাসা পাওয়ার অধিকার রাখে না।’

জানালা দিয়ে বাইরের ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অরিশা। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আদিত্যের উপস্থিতি সম্পূর্ণভাবে ভুলে থাকতে চাইছে সে। অসম্ভব রকমের কান্না পাচ্ছে তারকিন্তু আদিত্যকে তার চোখের জল সে কখনোই দেখাতে চায় না।

তোমার এ অসুখটা তেমন গুরুতর কিছু নয় অরিশা, তুমি ভালো হয়ে যাবে। আমি একজন ডক্টর, আর একজন ডক্টর রোগ সম্পর্কে কখনোই মিথ্যে বলে না।’অরিশার তুলতুলে শীর্ণ হাতটা ততক্ষণে আদিত্য নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিয়েছে। যে হাতের মুঠোয় রয়েছে ভালবাসা, বিশ্বাস আর নিশ্চয়তা।

চলো আমার সাথে, চার দেয়ালের এই বিষণ্ণতার মাঝে তোমাকে আর একমূহুর্ত থাকতে দিতে রাজী নই আমি। দিনের পর দিন এই পুতলগুলো তোমার সমস্ত ভালবাসা আস্তে আস্তে নিজেদের করে নিচ্ছে। এভাবে কেউ বেঁচে থাকতে পারে না। চলো।’

অরিশা শক্ত করে আদিত্যের হাত ধরে আছে, যেন ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে। অন্ধকার সিঁড়িকোঠা দিয়ে নিচে নামতেই আদিত্য অরিশার কাকীমার সামনে পরে গেলো। মহিলা কটমট করে আদিত্যের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ না করেই আদিত্য মনে মনে সিটিশপের প্রোপাইটর অর্পনকে ধন্যবাদ জানিয়ে আরিশার হাত ধরে গটগট করে বের হয়ে এলো।

কুয়াশা ভেজা শীতের সকালে ডক্টর আদিত্য রায় কাউন্ট্রি লেনের পাশ দিয়ে একা একা হাঁটছে। উদ্দেশ্য সিটিশপ। সকালের দৈনিকটা না হলে ব্রেকফাস্টটা তেমন জমে না এই তরুণ ডাক্তারের। বয়সে তরুণ হলেও শহরে তার নাম ভালোই ছড়িয়ে পড়েছে। সিটিশপের প্রোপাইটর অর্পণ ডক্টরকে দেখেই রয়টার্স এর কপিটা এগিয়ে দিলো। রয়টার্সের কপিটা হাতে নিতে নিতে জানালার কার্নিশে থাকা ছোট্ট একটা পুতুলের উপর আদিত্যের চোখ আটকে গেলো।

বাহ, ভারী সুন্দর তো পুতুলটা।’ কাপড়ের তৈরি হলেও আদিত্যের কাছে পুতুলের হাসিটা সত্যি মনে হচ্ছে। কেমন যেন একটা বিষাদ সে হাসিতে। যেন একটু ভালবাসা পেলেই টুপটাপ করে চোখ থেকে জল গড়িয়ে পরা শুরু করবে। আদিত্যের খুব ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে পুতুলটা।

সুন্দর এবং দামী।’অর্পন মন্তব্য করলো।

ডক্টর আদিত্যের হুট করেই মনে হয়ে গেলো সামনের সপ্তাহে তার একমাত্র বোনের মেয়ের জন্মদিন। আদিত্য ভাবছে, সুন্দর এই পুতুলটা এই ধুলো মাখা জানালার কার্নিশে কোনভাবেই শোভা পায় না। তাই সে পুতুলটা তার ভাগ্নির জন্য কেনার সিদ্ধান্ত নিলো। বিক্রয়মূল্য জিজ্ঞেস করতেই অর্পণ বললো

আমি আপনাকে প্রথমেই বলেছি এটা অত্যন্ত দামী। আপনি সুন্দর এই পুতুলটা একহাজার টাকার বিনিময়ে পেতে পারেন।’

ছোট্ট একটা কাপড়ের পুতুলের দাম কখনোই এতো হতে পারে না। কিন্তু আদিত্যের ইচ্ছে করছে না এই পুতুলটাকে এখানে ফেলে যেতে। তাই সে মূল্য পরিশোধ করে সিটিশপ থেকে বের হয়ে এলো। র‍্যাপিং পেপারে মুড়ে পুতুলটা বোনের ঠিকানায় পোষ্ট করে দিলো।

পুতুলটা ভাগ্নিকে দিয়ে দিলেও আদিত্য পুতুলের সেই বিষাদময় হাসিটা ভুলতে পারলো না। পরের সপ্তাহে আদিত্য আবার সিটিশপে আসলো। পুতুলটার প্রস্তুতকারী সম্পর্কে সে জানতে এসেছে। অর্পনকে জিজ্ঞেস করতেই সে জানালো

প্রতি মাসের শেষ দিন ত্রিশোর্ধ এক ভদ্রমহিলা পুতুলগুলো তার কাছে নিয়ে আসে। কিন্তু সে তার বাসার ঠিকানা জানে না।

তারপর অনেকদিন হয়ে গেছে। ব্যস্ততায় আদিত্য পুতুলটার কথা প্রায় ভুলতে বসেছে। এমন সময় একদিন সন্ধ্যাবেলা সেই ফোন কল এলোএকজন ভদ্রমহিলা আদিত্যকে ডেকেছেন।

১২/বি, জনসন রোডের বাড়ীটায় প্রবেশ করেই আদিত্যের কেমন যেন মন খারাপ হয়ে গেলো। আদিত্যের জানা ছিলো না জনসন রোডে মন খারাপ করে দেয়ার মতো এতো বিষণ্ণ একটা বাড়ি আছে। তিনতলা বাড়িটার পুরো সিঁড়িকোঠা জুড়ে অন্ধকারের আধিপত্য। সিঁড়িকোঠার বাতিগুলোয় সব মাকড়শার বাসাকতযুগ ধরে যে বংশপরম্পরায় বসবাস করে আসছে কে জানে!

ঘরে ঢুকেই আদিত্যেই সেই পুতুলটার কথা মনে হয়ে গেলো। কারণ পুরো ঘরজুড়ে ইতিউতি কাপড়ের পুতুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, সেই একই পুতুল।

ডক্টর আদিত্য, আপনার রোগিণী পাশের ঘরে আছে।’

আদিত্য কথা না বড়িয়ে ভদ্রমহিলার সাথে পাশের ঘরে আসলোঅষ্টাদশী এক অতি রূপবতী মেয়ে ঘরের এক কোণায় জানালার পাশে বসে আছে। রূপবতীর দৃষ্টি জানালা গলে কোথায় হারিয়েছে আদিত্য বুঝতে পারলো না। এতো রূপবতী একটা মেয়ে অথচ তার মুখে হাসি নেই দেখে আদিত্যের মনটাই খারাপ হয়ে গেলো।

এই আপনার রোগিণী, খোঁড়া এবং গোমরামুখী।’

আদিত্য এতক্ষণ লক্ষ্যই করেনি মেয়েটা হাঁটতে পারে না। ভদ্রমহিলা, যে কিনা নিজেকে রোগিণীর কাকীমা পরিচয় দিয়েছেন, তার নির্দয় ব্যবহারে আদিত্য খুবই অবাক হলো। মেয়েটার পা বাঁকানো, এটা তেমন কোন অসুখ নয়। আদিত্য খুব ভালো করেই জানে কিভাবে বাঁকানো পা ঠিক করতে হয়। কিন্তু ভদ্রমহিলা এই বিষয়ে কোন কথাই বললেন না। তার অভিযোগ

রোগিণী, যার ডাক নাম-‘অরিশা’, সবসময় বিষণ্ণ থাকে। এজন্য সে আর কোন হাস্যজ্জল পুতুল তৈরি করতে পারছে না।’

আদিত্য বুঝতে পারলো পুতুলগুলো সব অরিশার হাতে গড়া। এবং তার কাকীমা তাকে নির্দয়ের মতো শোষণ করছে। অরিশার ঘর থেকে বের হয়ে আদিত্য অরিশার কাকীমাকে বাঁকানো পা ভালো করার বিষয়টা জানালো। কিন্তু অরিশার কাকীমা বিষয়টা হেসেই উড়িয়ে দিলেন– ‘ও ভালো হবার নয়। ডক্টর তো আর কম দেখানো হয়নি।’

পরবর্তী সপ্তাহে অরিশাকে দেখে আদিত্যের আবার মন খারাপ হয়ে গেলো। চার দেয়ালের মাঝে বন্ধী থাকতে থাকতে মেয়েটা পুতুলগুলোকেই তার পৃথিবী বানিয়ে ফেলছে। তার সমস্ত অনুভূতি, ভালবাসা, ভাললাগা আস্তে আস্তে যেন পুতুলগুলোতে চলে যাচ্ছে। পুতুল বানানো বন্ধ না করলে এই মেয়েটা হয়তো তিলে তিলে মরেই যাবে। ভালবাসা ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না, কিন্তু এই মেয়েটা জীবনে কোন ভালবাসাই নেই। অরিশার কাকীমাকে এ বিষয়ে বলতেই সে আদিত্যকে ঘর থেকে বের করে দিলো এবং বললো তাকে আর প্রযোজন নেই। সে অরিশার জন্য ভালো ডক্টর খুঁজে নেবে।

দিন যায়, মাস যায়, দেখতে দেখতে বছরও চলে যায়। আদিত্য এখনো অরিশার সেই বিষণ্ণ হাসিটা ভুলতে পারেনি। প্রায়দিনই আদিত্যকে ১২/বি জনসন রোডের পাশে দেখা যায়। ডাক্তারিটা প্রায় ভুলতে বসেছে। কিছুই ভালো লাগে না এখন তার। স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছে, না ঘুমাতে ঘুমাতে চোখের নিচে কালি জমেছে। চেনাই যায় না এখন আর আদিত্যকে। এমনই অবস্থায় আদিত্য এক সকালে সিটিশপে এসে ঢুকে। অর্পনকে একপাশে ডেকে নিয়ে হরবর করে বলতে থাকে সব এবং তাকে অনুরোধ করে এ মাসে অরিশার কাকীমা তার দোকানে আসলে যেন একটু বেশী সময় তাকে এখানে আটকে রাখে। অর্পন কথা দেয়।

অর্পন তার কথা রেখেছে। আর রাখবে নাই বা কেনো? আদিত্যের জন্যই তো অর্পনের দুই বছরের ফুটফুটে মেয়েটা এখনো বেঁচে আছে। এ ঋণ শোধ করার সুযোগ পেয়েও করবে না তা কি করে হয়। অরিশার কাকীমা দোকানে ব্যস্ত থাকার সময়টাতে আদিত্য অরিশাকে তার কাকীমার বাসা থেকে নিয়ে এসেছে।

পরিশিষ্টঃ

আদিত্যে এবং অরিশার তিন বছরের মেয়ে সারা গুটিগুটি পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। ছোট্ট ছোট্ট পায়ে রূপার নূপুরের রিনঝিন শব্দ হচ্ছে। অসম্ভব রকমের ভালো লাগছে আদিত্যের। মেয়েকে কোলে নিয়ে আদিত্য কিচেনে প্রবেশ করলো। অরিশা রান্না করছে। আদিত্যকে দেখেই একটু হাসলো সে। আগের সেই মন খারাপ করে দেওয়া বিষণ্ণতা আর নেই সে হাসিতে। অরিশা এখন স্বাভাবিক মানুষের মতোই হাঁটতে পারে। একবছরের মধ্যেই আদিত্য অরিশার বাঁকানো পা ঠিক করে দিতে পেরেছে।

হুট করেই আদিত্যের নিজেকে অসম্ভব রকমের সুখী মানুষ মনে হচ্ছেজীবন অসম্ভব রকমের সুন্দর। হুডতোলা রিক্সায় বৃষ্টিতে ভেজার মতো সুন্দর। মাটির কাপে সর ভাসা চায়ের মতো সুন্দর। শুধু সঠিক সময়ে সঠিক মানুষটাকে নিজের মতো করে চেয়ে নিতে হয়।।

(বিদেশী গল্প অবলম্বনে।)

Leave a Comment: