golpo: ghrina - ashan uj jaman

গল্পঃ ঘৃণা – আশান উজ জামান

‘মুক্তিযুদ্ধ’ নিয়ে লেখা একটা গল্প।
কেমন হয়?

কেমন আর হবে যার মূল বিষয়বস্তুুই হয় মুক্তিযুদ্ধ। যেখানে ৭ মার্চ, ২৬ মার্চ, ১৪ ডিসেম্বর, ১৬ ডিসেম্বর থাকে। নির্যাতিত বাঙালির আর্তনাদ থাকে, অসহায়ত্ব থাকে, গর্জে ওঠার গল্প থাকে। গল্পটা বেড়ে ওঠে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। যেখানে চিন্তার ছাপ থাকে নির্যাতিত বাঙালিদের। এমনটাই হয় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পগুলি।

আমি আজ একটা গল্পের কথা বলবো। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা। যে গল্পটির জন্ম হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানে। বেড়ে উঠেছে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের নির্যাতিত মা, বোন, অসহায় শিশুর কান্না বুকে নিয়ে। অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে। অদ্ভূত লাগছে তাই না?

গল্পের নাম ”ঘৃণা”। হেলাল, কাবিল, ইউসুফ, শরিফ, সাহিল, রুশো, শামস, ফাতিমা, লীলা আর কর্নেল মাতিন – গল্পের বিভিন্ন চরিত্র।

গল্পের শুরুটা পশ্চিম পাকিস্তানি যুবক হেলালকে দিয়ে। রমজান মাস। গল্পের পরিসর পশ্চিম পাকিস্তান। কর্নেল সাহেব তাকে জরুরী তলব করে তাঁর সাথে দেখা করার জন্য। েসখানে যেতে যেতে বড় হতে থাকে গল্পটা।

হেলাল কঠোর পশ্চিম পাকিস্তানপন্থী। কাবিল আবার তার ঘোর বিরোধী। সে হেলালের পুরো উল্টো। চুম্বক এক সঙ্গে থাকলে যেন কত ভালবাসা! কিন্তু, কোন কারনে যদি ঐ চুম্বকে ভেঙে দু’ টুকরো করা হয় তখন তারা কখনই এক হতে চায় না। যেনো জনম জনমের শত্রু। পূর্ব পাকিস্তানের ইস্যুতে কাবিল-হেলালের মাঝে যেনো এমনি সম্পর্ক। জন্মস্থান দাঁড়িয়ে সে কেন ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে কথা বলে? কেন প্ল্যাকার্ড হাতে মিছিল করবে? কেন বলবে, পাকিস্তানিদের বিচার হওয়া উচিত! সেজন্য জুতোপেটা করতে ইচ্ছা করে হেলালের।

বন্ধুদের আড্ডায় কথার তুবড়ি। হেলাল পাকিস্তানের হয়ে। কাবিল পূর্ব পাকিস্তানের হয়ে। বিবিসি, পেপার-পত্রিকা বলছে, পশ্চিমারা নৃশংসভাবে মারছে পূর্ব পাকিস্তানিদের। অথচ একথা কথা সত্য, যে হেলালের মতো অধিকাংশরাই জানে পূর্বে কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে সেটা মিটেও গেছে। ‘মার্চ মে মাহিনেমে কুছ লাফড়া হুয়া থা। বাদ মে ইয়ে সাব আর্মিনে কন্ট্রোলমে লে লিয়া।’–চিন্তা করা যায়! যেখানে অশান্তির দাবানলে পুড়ছে পূর্ব, পুড়ছে পূর্বের মানুষদের জন্য কাবিলের মত সচেতন পশ্চিমার হৃদয়; সেখানে হেলাল ঘোর পশ্চিমাপন্থী। এসব ভন্ডামি। সব কিছু বঙ্গবন্ধুর চাল।

এই বিশেষ বর্ণনা, চিন্তার জায়গা, পশ্চিমা হয়েও পূর্ব পাকিস্তানি বাঙালিদের ‘মানুষ’ হিসেবে বিবেচনা করার মানসিকতা সত্যি অন্য করেছে গল্পটিকে।

শুধু তাই নয়। কাবিলের বাঙালি রুমমেট রুশোর মুখেই শুনেছে সে পশ্চিমাদের অমানবিক নির্যাতনের গল্প। মা-বোনের ইজ্জত হারানোর গল্প। তাই তো খেঁকিয়ে উঠেছিল কাবিল। রুমমেটেই যেন তার চোখ খুলে দিয়েছে। ইয়াহিয়া যে দানব হয়ে গেছেন, এটা দেখতে যে চশমা লাগে না সেটা বুঝেও না বোঝার ভান করে হেলাল।

হেলালের ভাই ‘শামস’ কে দেখার জন্য ডেকেছিলেন কর্নেল মাতিন। মানুষ মারার কারিগর। মানুষ মেরে মেরে এখন ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। ঘুমোতে পারে না। ভীষন রকম অশান্তি। এ অবস্থায় শামসের প্রেমিকা ফাতিমা আর মায়ের দেখা মেলে হাসপাতালের কক্ষে, যেখানে শামস চিকিৎসারত।

অদ্ভুত! হেলালকে অনেক দেখেও চিনতে পারে নি যে শামস সেই শামস কথার বাক্স খুলে বসে মা আর প্রেমিকার সাথে। অনায়াসে বলে কিভাবে বাঙালিদের মেরেছে। এক-দুই হাজার নয়। আরো বেশি! শুনে মা ও প্রেমিকা ক্ষেপে যায়। ঘৃণায় জমে যায়। মেরে ফেলতে ইচ্ছা করে শামসকে। মা তো সজোরে একহাত বসিয়েই দেন শামসের গগণ্ডদেশে। ফাতিমার থু দিতে ইচ্ছা হয় শামসের মুখে। এত্ত মানুষ মেরেছে যে পশুটা তাকে কিভাবে ভালবাসলো সে।

এটা ভাবতে নিজেকে প্রচন্ড ভারসাম্য- হীনতার মধ্যে হারিয়ে ফেলছিল ফাতিমা। শামসে ছেড়ে চলে যায় সে। আর হেলালের লীলাও তার প্রেমিকের এমন অমানবিক চেতনার জন্য তাকে ছেড়ে অনেকটা সরে পড়ে।

এই লীলা, ফাতিমা, শামসের মা কিংবা কাবিলের কথা বলি, এরাই ‘ঘৃণা’ গল্পটিকে অনন্য করে তুলেছে। যারা পশ্চিমা হয়েও ‘অমানুষ’ হয় নি। ‘মানুষ’ এর ভূমিকা পালন করেছে। যার জন্য নিজের ভিতর পুষে রাখা ভালবাসাকে ছেড়ে চলে গেছে। সৃষ্টি করেছে দৃষ্টান্ত। “ঘৃণা” গল্পকে করেছে স্মরণীয়।

এছাড়াও অনেক তথ্য ও তত্ত্বে নিগূঢ়তা বেড়েছে গল্পটির। ‘অবশ্য যে সমাজের সামনে বুটের দেয়াল আর চোখে খাকি চশমা থাকে, বিরুদ্ধ সত্যগুলো তার চোখে পড়ে না।’ – এমন অনেক নিগূঢ় তথ্য আছে গল্পে। যেটা গল্পের অলংকার বাড়িয়েছে।

এর আগে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক গল্প হয়েছে। কিন্তু, এমন গল্পের জন্ম বাংলা সাহিত্যে যে আগে হয় নি তা এখন হলফ করে বলতে পারি। আপনারাও কিছু আঁচ করতে পারছে বোধ হয়। সেটা জন্য গল্পটি পড়ার দরকার সবার। বিশেষ করে পড়ার দরকার নতুন প্রজন্মের।

পরিশেষে বলতে চাই, কথাসাহিত্যিক আশান উজ জামানের এই “ঘৃণা” গল্পটি বাংলা সাহিত্যে একটি স্মরণীয় সংযোজন ও অমূল্য সম্পদ।

About the Author আল-আমীন আপেল

শ্বাসের আশায় ছাড়ি নিঃশ্বাস..

follow me on:

Leave a Comment: