• You are here:
  • Home »
  • গল্প »

বাবা আমাকে ভালই বাসেনা আমিও বাবাকে ভালবাসিনা

বাবা দিবস আজ তাইনা? সবাই দেখছি বাবার সাথে নিজের ছবি আপলোড দিচ্ছে,সুন্দর সুন্দর স্মৃতি রোমন্থন করছে। আমার কোন বাবা দিবস নেই! কারণ আমার বাবা আমাকে ভালবাসে না! আমিও তাই বাবাকে ভালবাসি না!

১। আমি তখন খুব ছোট। বাবা পুকুরে সাতার কেটে কেটে গোসল করতেন। আমি বললাম বাবা আমিও পুকুরে নামবো। বাবা পুকুর থেকে উঠে এসে আমাকে তুলে ধরলেন তার পর ছুড়ে মারলেন পুকুরের পানিতে! আমি প্রায় ডুবেই যাচ্ছিলাম। অনেক পানি খেলাম।বাবা তখন আমাকে তুলে নিলেন। এভাবে অনেক বার বাবা আমাকে মাঝ পুকুরে ছুড়ে মেরেছেন।আমি অবিরাম পানি খেয়েছি আর ডুবতে ডুবতে বেঁচে গেছি। আমার বাবা আমাকে ভালবাসলে নিশ্চই ওভাবে ছুড়ে ফেলতেন না।

২। আমার বাবা আমাকে ভালবাসেনা। আমিও বাবাকে ভালবাসিনা। আমি তখন একটু বড় হয়েছি। ভাইয়ার একটা সাইকেল ছিল।আমি চাইতাম সেই সাইকেল চালানো শিখবো।বাবাকে অনেকবার বলার পর বাবা আমাকে সাইকেলে চড়তে দিলেন। নিজে পিছনে ধরে রাখলেন।আমি খুব বিশ্বাস করে সাইকেলে উঠেবসলাম। প্যাডেল করলাম আস্তে আস্তে। বাবা তখন হুট করে সাইকেলে ধাক্কা দিয়ে ছেড়ে দিলেন। আমি কিছুদুর গিয়ে পড়ে গেলাম। হাটু ছুলে গেল। এভাবে বাবা আমাকে অনেক বার সাইকেলে চড়িয়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছেন। বাবা যদি আমাকে ভালবাসতো তবে নিশ্চই আমাকে ওভাবে সাইকেলে বসিয়ে দিয়ে পিছন থেকে জোরে ধাক্কা দিতেন না।

৩। আমার বাবা আমাকে ভালবাসেনা। আমিও বাবাকে ভালবাসিনা। আমি জুতার ফিতা বাধতে পারতাম না।বাবাকে বলার পরও বাবা আমার জুতার ফিতা বেধে দিত না। অথচ আমার অন্য বন্ধুদের বাবা তাদের জুতার ফিতা বেধে দিত।বাবা আমার পাশে বসে বার বার বলতেন এভাবে বাধো ওভাবেবাধো কিন্তু নিজে বেধে দিতেন না। বাবা যদি আমাকে ভালবাসতেন তবে নিশ্চই ছোট বেলা আমার জুতার ফিতা বেধে দিতেন।

৪। আমার বাবা আমাকে ভালবাসেনা। আমিও বাবাকে ভালবাসিনা। বাবার চা খাওয়ার খুব নেশা আছে।নিজে একা একা চা বানিয়ে খায়।আমি যখন বলি বাবা আমাকেও এক কাপ দাওনা প্লিজ। বাবা কিচেন দেখিয়ে দেয়। বলে দেয় কি কি করতে হবে। নিজের বানানো এককাপ চা খাওয়ার পরও বলে আমার জন্যও এক কাপ বানাসতো। আমার বাবা যদি আমাকে ভালবাসতো তবে নিজে যখন চা বানিয়েছিল আমার জন্যও এক কাপ বানাতো।

৫। আমার বাবা আমাকে ভালবাসেনা। আমিও বাবাকে ভালবাসিনা। বাবা খুব গাছে চড়তে পারতো।আমারও খুব লোভ হত। বাবাকে বলতেই বাবা আমাকে কাধে করে নারকেল গাছের বেশ উপরে নিয়ে যেত। তার পর বলতো গাছ জড়িয়ে ধরতে। আমি যখনি জড়িয়ে ধরতাম বাবা আমাকে ফেলে রেখে তরতর করে নিচে নেমে যেত। আমার কান্না পেতো। আমি তখন আস্তে আস্তে হেচড়েপেচড়ে নিচে নামতাম আর আমার বুকটা ছুলে যেত। বাবা যদি আমাকে ভালবাসতো তবে ওরকমটি করতে পারতো না।
এক প্যারেন্টস ডেতে বাবাকে নিয়ে বলতে বলা হয়েছিল আমাকে। আমি তখন এসব কথা বলেছিলাম। এ গুলোই ছিল বাবার বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ। পরদিন বাংলা মিস ক্লাসে এসে বললেন আজ আর আমি পড়াবোনা। তোমাদের সাথে গল্প করবো।তোমাদেরকে কিছু প্রশ্ন করবো তোমরা যারা উত্তর জানো তারা হাত উচু করবা আর না জানলে চুপ থাকবা। তিনি প্রশ্ন করলেন তোমাদের মধ্যে কে কে সাতার কাটতে পারো? আমি সাথে সাথে হাত উচু করলাম। মিস আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিলেন। আমি আশেপাশে তাকিয়ে দেখি আর কেউ হাত উচু করেনি। আমরা তখন ক্লাস ফোরে পড়ি। এর পর মিস একে একে প্রশ্ন করলেন কে কে সাইকেল চালাতে পারো কে কে গাছে চড়তে পারো কে কে নিজে নিজে জুতার ফিতা বাধতে পারো ইত্যাদি ইত্যাদি। দেখা গেল আমি ছাড়া আর কেউ হাত উচু করছেনা। মিসের চোখ দিয়ে পানি চলে আসলো।

আমার কাধে হাত রেখে বললেন ইবন তুমিকি বুঝতে পারছো কিছু? আমি বুঝতে পারলাম।আমার চোখেও তখন পানি চলে এসেছিল।মিসকে জড়িয়ে ধরে কেদেছিলাম আমি।তার পর ছুটি নিয়ে বাড়িতে গিয়ে দেখি বাবা বসে আছে। আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরে অনেক ক্ষণ কেঁদেছিলাম। বলেছিলাম বাবা তুমিই পৃথিবীর সেরা বাবা।

এখনও আমি বাবাকে খুব বেশি ভালবাসিনা!
কিছুদিন আগে ব্যান্ড শিল্পী হাসান সাহেবের বাসায় গিয়েছিলাম।আমাকে নাস্তা দেওয়ার পর আমি শুধু চা আর বিস্কুট বাদে কিছু খাইনি। আম খাইনি লিচু খাইনি এমনকি আপেলও খাইনি। হাসান সাহেবের বাসার অন্যরাতো অবাক।আমি বললাম দেখুন আমি কি করে এটা খাই? এ বছর আমার বাবা এখনো আম খেয়েছে কিনা আমি জানিনা,এখনো একটা লিচু খেয়েছে কিনা জানিনা,একটুকরো আপলে খেয়েছে কিনা জানিনা। তাহলে আমি কি করে খাই? আমি বাবাকে ভালবাসিনা! তাই আমার কোন বাবা দিবস নেই। রোজ নামাজ পড়ে অন্যরা যখন রব্বির হামহুমা কামা রব্বা ইয়ানি ছগিরা বলে দোয়া করে আমি করি তার উল্টোটা। আমি বলি “হে আল্লাহ আমার জীবনের সমস্ত হায়াত নিয়ে হলেও আমার বাবা মাকে দীর্ঘায়ু দান করো”
আমি প্রমান করে দিতে পারি এই পৃথিবীতে আমার বাবার মত সেরা বাবা একটিও নেই।যে কেউ আমার সাথে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন তার বাবাকে নিয়ে। হয়তো কারো কারো বাবা তাকে মাসে দু মাসে আগ্রার তাজমহল,মিশরের পিরামিড কিংবা নায়াগ্রা ফলস দেখাতে নিয়ে যায়,হয়তো কারো কারো বাবা তাকে আইফোন সিক্স থেকে শুরু করে অন্য সব না চাইতেই দেয়।কিন্তু আমার বাবা আমাকে কতটা দেয় সেটা আমি জানি। মনেও পড়েনা কবে বাবাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছি!এমনকি ঈদের দিনেও না। তবে বাবা আমাকে একটা কথা বলেছিলেন সেটা আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি।

“দেবার মত কিছুই আমার নেই।তোমার কাছে চাওয়ারও কিছু নেই। এই ছয় হাজার টাকা দিলাম এটা নিয়ে পথে রওনা হও।দেখ কতটা যেতে পারো।তবে মনে রেখ যে সম্মানটুকু আমার আছে তা যেন না কমে।তুমি আমার সম্মান বাড়াতে পারো না পারো সেটা বড় নয় কিন্তু আমার ওই সম্মানটুকু যেন না কমে”।
আমি বাবার সম্মান কমাইনি।আমিকি বাবাকে ভালবাসিনা?
——–
এবার একটা গল্প বলি শুনুন
এক বৃদ্ধ লোক একটা মোবাইল মেকানিকের কাছে তার মোবাইলটা দিয়ে বললেন দেখতো বাবা আমার মোবাইলটার কি সমস্যা। মোবাইল মেকানিক ভাল করে দেখে বললেন চাচা আপনার মোবাইলেরতো কোন সমস্যা নেই। বৃদ্ধা তখন মোবাইলটা হাতে নিতে নিতে বললেন মোবাইল যদি ঠিকই থাকবে তবে এই মোবাইলে আমার ছেলে মেয়েদের ফোন আসেনা কেন?বৃদ্ধর চোখে তখন অবিরাম অশ্রুধারা।(তার সন্তানেরা তাকে ছেড়ে চলে গেছে আলিশান বাড়িতে)।(এটা নিয়ে আমার একটা গল্প আছে পরে শেয়ার করবো)

শুধু চাওয়া একটাই পৃথিবীতে কোন বাবাকে যেন উহ শব্দটিও করতে না হয়।ফেসবুকের পাতায় যেন বাবাপ্রীতি সীমাবদ্ধ না থাকে।বিয়ের পরপরই বাবা মা যেন পর হয়ে না যায়।

About the Author জাজাফী

লেখক হয়ে জন্ম নেইনি, লেখক হতেও নয়। তবু আমি লেখক হলে, সেটাই হবে ভয়। জাজাফী এমন একজন যার অতীত এবং ভবিষ্যৎ জানা নেই, বর্তমানই সব।

follow me on:

Leave a Comment: