Attoja Uwriter

আত্মজা

সুপর্ণা দাঁড়িয়ে আছে হাসপাতালের বারান্দায়। ওর মা মারা গিয়েছে একজন হোস্টেলে গিয়ে ওকে নিয়ে এসেছে। ওর কান্না পাচ্ছেনা। কিন্তু একটা আতংক ওর মধ্যে কাজ করছে। মা ছাড়া এই পৃথিবীতে ওর আর কেউ নেই। এখন ওর কী হবে?

ওর যখন বার বছর বয়স তখন ওর মা মিরা তার জীবনের গল্প বলেছে একদিন। বলেছে তুমি এখন বড় হয়েছ, আমার কাহিনী শোনো।না হয় তুমি আমাদের জীবন বুঝতে পারবে না। এটুকু বলে সে তার জীবনের গল্প বলতে শুরু করলো।

মিরার তখন পনের বছর বয়স।গ্রামে থাকে।বাবা মা আর পাঁচ ভাইবোন ওরা।বাবা অন্যের জমিতে কাজ করতো।মিরা প্রাইমারী স্কুল পযর্ন্ত পড়েছে।তার পর আর পড়া হয়নি।মাকে সাহায্য করেছে।খুব ডানপিটে ছিল।

আসলে মিরা দেখতে খুব সুন্দর ছিল।তাই ছেলেরা ওর পিছনে ঘুরঘুর করতো।একদিন সাগর ওকে একটা চিঠি দেয়।ভালবাসার কথা ভরা চিঠি।সাগরদের অবস্থা ভালো।তাই মিরা ওর চিঠির উত্তর দেয় না।জানে এর ফল ভালো হবে না।কিন্তু সাগর মাঝে মাঝে শহরে যেত।ওর জন্য চুড়ি,ক্লিপ,ফিতা কিনে নিয়ে আসতো।ওকে জোর করে দিতো।মিরা একদিন সাগরকে বলে,তোমাদের অবস্থা আমাদের থেকে অনেক ভালো।তুমি আমার আশা ছেড়ে দাও।সাগর বলে,জীবন থাকতে ওকে ছাড়বে না।সাগর মিরার মেলামেশা একদিন সাগরের বাবার কানে ওঠে।সে মিরার বাবাকে শাসায়।মিরার বাবা মিরাকে ধরে মারে।ওর জিদ চেপে যায়।ও সাগরকে সব বলে।সাগর বলে চলো আমরা শহরে পালিয়ে যাই।মিরার মন সায় দিচ্ছিলনা।বাবা,মা,ভাই-বোন সব রেখে কোথায় যাবে।আবার সাগরের জন্যও মন কাঁদে।

সাগর ওর মার বাকসো থেকে টাকা নিলো।শহরে গিয়ে ঘর ভাড়া করলো।একদিন রাতে দুজন শহরের উদ্দেশ্যে বাসে উঠলো। সকালে ওরা ভাড়া বাসায় উঠলো।বন্ধুরা সব এসে হৈচৈ শুরু করলো।তার পর ওদের বিয়ে পড়ানো হলো।

 

সাগর একটা দোকানে কর্মচারীর চাকরি নিলো।দু’জনে খুব খুশি।কিন্তু ছয় মাস না যেতেই সাগর পাল্টাতে শুরু করলো।এতো কষ্ট তার সহ্য হয় না।সে মোটামুটি ভালভাবে জীবনযাপন করেছে।এ জীবন তার ভাল লাগেনা।এমনকি এখন তার আর মিরাকেও ভালো লাগেনা।সে মিরাকে বলে তুই গ্রামে ফিরে যা।মিরা বলে অসম্ভব! বাবা মা আমাকে ঘরে নেবেনা।আর তোমার বাবা আমাকে মেরেই ফেলবে।

একদিন ঝগড়ার একপযার্য়ে সাগর মিরাকে খুব মারলো।তারপর ঘর থেকে বের হয়ে গেল।সাতদিন হয়ে গেল তাও ফিরছে না।মিরার অসহায় লাগছিল।কারণ ও সন্তান সম্ভবা।মিরা ভাবে সাগর একবারও চিন্তা করলো না।কত সুন্দর সুন্দর কথা বলে ওকে ঘর থেকে বের করে এনেছে।এদিকে বাড়ি ভাড়া বাকি।বাড়িওয়ালা তাগাদা দিচ্ছে।ঘরে খাবার নেই।

মিরা প্রতিদিনই পার্কে গিয়ে বসে থাকতো। একদিন এক মহিলা এসে বললো তোমাকে কয়েকদিন থেকে এখানে দেখছি।ভিক্ষাও করো না। তোমার চলে কি করে?
মিরা যেন একটা অবলম্বন খুজেঁ পেলো।মহিলাকে সে সব খুলে বললো যে কোন বাসায় কাজ পেলেও করবে।মহিলা বললো যে তুমি আমার কাছে থাকো। শরীরের এই অবস্থায় তুমি কোথায় যাবে?মিরা সরল বিশ্বাসে তার সাথে গেলো।বাড়ীওয়ালা ওর ঘরের কিছুই নিতে দিলোনা। বললো,বাড়ি ভাড়া দাওনি আবার এগুলো নিতে এসেছো।

তিন চারদিন পর সন্ধ্যার দিকে দুজন লোক এলো।তারা বললো ওই মহিলা তাকে ওদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে।মিরা প্রবল ভাবে আপত্তি জানালো।ও মহিলাকে কোথাও দেখতে পেলো না।লোক দুটো বললো চেচিওনা,লাভ হবে না।এটা আমাদের এলাকা।আমরা মেয়েদের নিয়ে ব্যবসা করি।তুমিও করবে।তোমাকে আমরা কিনে নিয়েছি।আপত্তি করলে খুন করে ফেলবো,কেউ টেরও পাবে না।

কিছুদিন পর মিরার ফুটফুটে একটা মেয়ে হলো।সবাই খুব খুশি।নাম রাখলো সুপর্ণা।তিন মাস পর মিরাকে কাজে নামিয়ে দেওয়া হলো।ও খুব কাঁদলো।জীবনে কী ভুল করেছে বুঝতে পারলো।কিন্তু কিছু করার নেই।

সুপর্ণার যখন ছয় বছর বয়স তখন ওকে একটি এতিমখানায় ভর্তি করে দেওয়া হলো।মিরা চাচ্ছিলনা ওর মেয়ে এই পরিবেশের মধ্যে বড় হোক।ও মাসে মাসে এতিম খানায় গিয়ে টাকা দিয়ে আসতো।

সুপর্ণা খুব লক্ষ্মী ছিল।ও কান্নাকাটি করতো না।সবাই ওকে পছন্দ করতো।সুপর্ণার বার বছর বয়সের সময় ওর মা যখন ওকে সব বললো,ওর খুব কষ্ট হচ্ছিল।ওর মনে হলো,ওর জন্যই মার এতো কষ্ট।কী জীবনযাপন করতে হয়।ও ঠিক করলো ও সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন করবে।পড়াশোনা করে চাকরি করবে।তারপর মাকে নিয়ে আসবে।ও আর মা সুন্দরভাবে থাকবে।

সুপর্ণা বড় হয়েছে। ওকে একটা হোমে দিয়ে দেওয়া হলো।যেন ও থাকতে পারে।ওর মা নিয়মিত টাকা দিতো।

খালার সাথে ওর ভাল পরিচয় ছিলো।ছয়বছর পযর্ন্ত ওখানে ছিলো।অনেকের সাথেই পরিচয় আছে।পনের বছর বয়সেই ওর জীবনে বিপযর্য় নেমে এলো।মা মারা গেলো।

চল বাসায় যাবি।সুপর্ণা বাস্তবে ফিরে এলো।খালা ওর হাত ধরে রিক্সায় ওঠালো।বাসায় নিয়ে ওকে যত্ন করে খাওয়ালো।তিনদিন পর বললো,তোকে তো দেখার আর কেউ নেই।তুই আমার কাছেই থাকবি।সুপর্ণা বুঝলো। কিন্তু এ জীবনতো ওর নয়।ও স্বাভাবিক জীবন চায়।এইসব মেয়েদের জন্য ও একধরনের কষ্ট অনুভব করে।কিন্তু তা বলে এ জীবন বেছে নেবেনা।

সকাল হয়েছে।অনেক বেলা হয়ে গিয়েছে।সুপর্ণা এখনো কেন উঠছেনা দেখার জন্য খালা ওর ঘরের দরজা খুললো। দরজা খুলেই চিৎকার করে উঠলো।ফ্যানের সাথে সুপর্ণার নিথর দেহটা ঝুলছে!

About the Author লতা হামিদ

follow me on:

Leave a Comment:

1 comment
তানভীর এহসান
তানভীর এহসান says November 9, 2017

ভালো লেগেছে লেখাটি।

Reply
Add Your Reply