পদ্মার বুকে অরণ্য ও আকাশ

আষাঢ়ের বাদলা দিনে আকাশ আর অরণ্য বারান্দায় বসে গল্প করছে। দুজন একে অপরের জানের চেয়ে দামী বন্ধু। তারা যেখানেই যাক, যাই করুক না কেনো সবসময় একসাথেই করবে। এজন্য অন্য বন্ধুরা তাদের সুপারগ্লুতে লেপ্টানো আঠার সাথে তুলনা করে।

আকাশ অরণ্যকে জিজ্ঞাসা করলো, “কিরে অরণ্য। আগামীকাল বেড়াতে যাবি নাকি?”

অরণ্য আকাশের গল্প শুনতে শুনতে কিছুটা ঝিমিয়ে গেছিলো। আকাশের প্রশ্ন শুনে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বললো, “কোথায় যাবি বলে ঠিক করলি?”

আকাশ বললো, “চল দূরে কোথাও যাই। খুব ভোরে বের হবো। রাতের বেলা বাসা ফিরে আসবো।”

অরণ্য বললো, “তুই কোথায় যাবার কথা বলছিস বল তো?”

আকাশ এবার উৎসাহ নিয়ে বললো, “চল পদ্মা নদীর তীরে গিয়ে গোসল করে আসি। অনেকদিন ধরে পদ্মায় গোসল করি নি। গোসল করার জন্য মনটা উশখুশ করছে।”

অরণ্য যেন আকাশ থেকে পড়লো। যদিও প্রস্তাবটা মন্দ নয়। আর অরণ্যও কখনো পদ্মার তীরে যায় নি। তবুও সে হতাশ হল, কেননা রংপুর থেকে এতদূর যাওয়া বেশ কষ্টকর, তাও আবার একদিনে যাওয়া আসা। তাই হতাশা নিয়ে বললো, “বলিস কি? এতদূর যাবি?”

আকাশ দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে বললো, “আরে সমস্যা নেই। আমি খবর নিয়েছি, রংপুর থেকে রাজশাহী সরাসরি ট্রেন আছে। সেটায় যেতে মাত্র তিন ঘন্টা লাগবে। আর সেই ট্রেন ছাড়ে ভোর পাঁচটায়। আমরা সেটায় রাজশাহী যাবো, পদ্মায় গোসল করবো। আর আসার সময় কিছু একটা ব্যাবস্থা তো হবেই। টেনশন কিসের?”

অরণ্য নিজেও কিছুটা উৎসাহ পেল। আর প্রিয় বন্ধু বলেছে, তা কি ফেলা যায়? তাই সে রাজি হয়ে গেলো। পরদিন ভোরে দুজনে একসাথে ট্রেন স্টেশন গেল। টিকিট কাটা শেষে দুজন বসে অপেক্ষা করছে। ভাগ্য ভালো থাকায় ট্রেন সময়মত এসেছে। সেটাতে চড়তেই তাদের মনে জাগলো অনেক উদ্দীপনা। তবে অরণ্যের উৎসাহটা একটু বেশিই। সে কখনো ভাবেই নি যে, এভাবে আকাশের সাথে প্রথম কোথাও বেড়াতে যাবে, তাও সেটা পদ্মা নদীর তীরে। ট্রেনে বসে অরণ্য আকাশের কাছে পদ্মা ভ্রমণের কিছু স্মৃতি জানতে চাইলো। আকাশও সেসব বলতে লাগলো। এভাবে গল্প করতে করতে দুজন পৌঁছে গেলো রাজশাহী শহরে। এবার রিক্সা নিয়ে চলে এলো পদ্মার তীরে। সেখানে এসেই অরণ্যের চোখে বিস্ময়। পদ্মা নদী! এত সুন্দর দৃশ্য। আকাশও বিস্মৃত, কেননা সে যখন পদ্মায় বেড়াতে এসেছিল তখন এত সুন্দর ছিলো না নদীটি। অবাক চাহনিতে তাকিয়ে রইলো পদ্মার দিকে। যখন তারা এসেছে তখনো ফোটাফোটা বৃষ্টি পড়ছিল, তবুও যেন সৌন্দর্যের কমতি নেই, বরং সৌন্দর্য আরো বৃদ্ধি পেয়েছিল। আকাশ ব্যাগ থেকে তার ক্যামেরাটি বের করে ছবি তুলতে লাগলো। একবার অরণ্য পোজ দেয়, আকাশ ছবি তুলে। আবার আকাশ ছবি তোলার জন্য পোজ দিলে অরণ্য ছবি তুলে দেয়। কিছুক্ষণ এভাবে ছবি তুলে অরণ্য তার দামী স্মার্ট ফোনটি বের করে কয়েকটি সেলফিও তুলে ফেলে।

অরণ্য আকাশকে বলতে লাগলো, “বুঝলি আকাশ, আমার কাছে মোবাইলই ভালো লাগে। একসাথে অনেক কাজ হয় এটার দ্বারা।”

আকাশ শুধু মাথা নড়িয়ে যায় আর বলে, “হয়েছে হয়েছে। যে কারণে এসেছি সেটা এবার করি? চল গোসল করবো।”

দুজনই পোষাক ছেড়ে দুটো ট্রাউজার পরে নেমে পড়লো পদ্মার বুকে।

অরণ্য ও আকাশ চেঁচিয়ে উঠলো, ‘আহ কি শান্তি’। এমন শান্তি যেনো পৃথিবীর কোথাও নেই।

দুজনেই গান ধরেছে, “ওহ পদ্মা নদীরে………..” দুজন ইচ্ছে মতন গোসল করছে, কেউ হঠাৎ ডুব দিচ্ছে। কখনো যাচ্ছে গভির পানির দিকে। আকাশ সাতারে বেশ পটু, সে অরণ্যকে হাজার বার বললেও অরণ্য সাতার শিখে নি। তাই আকাশ অরণ্যের কাছাকাছিই থাকছে সব সময়। কিন্তু হঠাৎ করেই অরণ্যকে আর খুঁজে পায় না আকাশ। অরণ্য ডুব দিয়েছিল, আর উঠে নি। এটা ভেবে পাগলপ্রায় হয়ে খুঁজতে লাগলো অরণ্যকে। কিন্তু এতবড় নদীর কোথায় খুঁজবে সে? কাঁদোকাঁদো ভাব, প্রিয় বন্ধুকে কি হারাতে হবে? তাহলে সেই তো দোষী। কেননা সে তো অরণ্যকে নিয়ে এসেছে। এসব ভাবতে লাগলো আর পাগলের মতন খুঁজতে লাগলো অরণ্যকে। হঠাৎ কি যেন একটা পায়ে আঘাত লাগলো আকাশের। সে নিচু হয়ে দেখে একটা মানুষ। সে তুলে পাড়ে আনতে আনতে লক্ষ করে এই তার প্রাণ্যের অরণ্য। সে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে অরণ্যকে নিয়ে যায় কাছের হাসপাতালে।

অরণ্যের হাত ধরে বলে, “আমাকে মাফ করে দে দোস্ত। আমি আর তোকে নদী এলাকায় নিয়ে আসবো না।”

অরণ্য মুচকি হেসে বলে, “ধেৎ পাগল। তোর দোষ নাকি? দোষ তো আমারই। আমিই তো সাহস করে একটু দূরে গেলাম। কিন্তু তুই আমার প্রকৃত বন্ধু। তুই আমার জানের জান। তুই আমাকে বাঁচিয়েছিস।”

এসব শুনে কাঁদতে কাদতে আকাশ বললো, “আজ যদি তোর কিছু হত, তাহলে আমিও পদ্মার বুকে তলিয়ে যেতাম। তোকে যে অনেক ভালোবাসী দোস্ত।”

About the Author ফাতিন ইসরাক আবির

follow me on:

Leave a Comment: