Shedin Dujone Uwriter

সেদিন দু’জনে

সকাল থেকে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। চিন্তা হচ্ছে কেননা কালকে যশোর যাব। ভার্সিটি কয়েকদিনের জন্য বন্ধ হয়েছে। বাড়ি থেকে ঘুরে আসবো। একা যাব না। অরণ্য খুলনা যাবে আমি যশোরে নেমে যাব। ওখান থেকে অন্য বাসে দশ মাইল দূরে যেতে হবে। সব সময় যাইতো তাই ভয় লাগবে না।

আট বছর ধরে আমরা একে অপরকে ভালবাসি। দু’জনে ভার্সিটিতে একসাথে পড়ি।অরণ্য অসম্ভব মেধাবী এবং ভদ্র। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় আমি ওকে যে ভালবাসি তার থেকে ওই আমাকে বেশি ভালবাসে। ব্যাপারটা অবশ্য তর্কসাপেক্ষ।

তবে আমাদের জুটি ভার্সিটিতে খুব জনপ্রিয়।হবে না কেন?ও আর আমি সব সময় এক সাথে থাকি।ও হাঁটতে থাকে,ওর হাঁটার ছন্দে তাল মিলিয়ে আমাকে দৌঁড়াতে হয়।আমি অনর্গল বকবক করতে থাকি।আর ও মাথা নেড়ে সায় দেয়।কথা বলে খুব কম কিন্তু আমার দিকে প্রচুর লক্ষ্য রাখে।আমরা দু’জনে সমস্ত ভার্সিটি চষে বেড়াই।কে কি বললো না বললো আমাদের কিছু আসে যায় না।

এই আট বছরে ওর সাথে একবারই কথা বলা বন্ধ করেছি।সাতদিন কথা বলিনি।ও সকাল থেকে সন্ধ্যা পযর্ন্ত হলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতো।আমি ক্লাসেও যাইনি।সাতদিন পর ওর অধ্যবসায়ের কাছে আমাকে হার মানতে হলো।আমি একদিন সকালে হল থেকে বের হয়ে এসে বললাম চলো ক্লাসে যাই।দুজনে মিলে ক্লাসে চলে গেলাম।কিছুই জিজ্ঞেস করলো না।কী আশ্চর্য ছেলেরে বাবা!

সমস্যা হয় আমি অসুস্থ হলে।সকাল থেকে গেট বন্ধ হওয়া পযর্ন্ত দাঁড়িয়ে থাকবে।আর আমি শুনতে থাকি নিচে থেকে ডাকছে নদী আপু আপনার ভিজিটর এসেছে।শুনতে শুনতে একটা সময় অধৈর্য হয়ে হলের বাইরে আসি।আচ্ছা আমার কি অসুখও করতে পারবে না?বললেই হেসে আমার মূখের দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকে।আমি লজ্জা পাই।

অরণ্যও হলে থাকে।ঠিক হলো সকালে ও হল থেকে এসে আমাকে নিয়ে যাবে।সকালে উঠে দেখি তুমুল বৃষ্টি।ফোন করে বললাম আজকে থাক যাব না।বললো এই ঝুম বৃষ্টিতে তো যেতে মজা।তাছাড়া টিকেট,ছুটি দুটোই নষ্ট হবে।দুজনে প্রায় ভেজা অবস্থায় বাসস্ট্যান্ডে পৌছালাম।বাসে প্রচুর লোক।অতএব সাহস পেলাম।কিন্তু অঝোর বৃষ্টিতে বাস এগোতে পারছে না।আমরা কিন্তু এই সুন্দর আবহাওয়া দু’জনে খুব উপভোগ করছিলাম।

হঠাৎ মনে হলো এতো আস্তে চললেতো রাত হয়ে যাবে।ফেরীতেও দেরি হলো।সন্ধ্যা পেরিয়ে গিয়েছে।আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম।ও বললো ভয় পেয়ো না, আমিতো আছি।যশোরে যখন পৌছালাম তখন রাত দুটো।ও আমাকে একা ছাড়লো না।বললো এতো রাতে কি করে যাবে? রাতে একটা হোটেলে থেকে সকালে তোমাকে বাসায় পৌছে দিয়ে আমি খুলনা চলে যাব।আমরা একটা রিকশা নিয়ে হোটেলে গেলাম। হোটেলে গিয়ে আমরা দুটো রুম দিতে বললাম?

সকাল হলো।ও আমাকে যেতে দিল না।দু’জনে রিকশা নিয়ে বাসায় গেলাম।প্রচন্ড পানি।বাসায় গিয়েই বড় চাচার সামনে পড়লাম।চাচার সাথে ওর পরিচয় করিয়ে দিলাম।বললাম আমরা একসাথে পড়ি।আমরা এই আবহাওয়ায় রাতে কেন এসেছি জিজ্ঞেস করলেন চাচা।বললাম গতকাল সকালের বাসেই এসেছি, রাতে হোটেলে থেকেছি।তাকে সব খুলে বললাম।চাচার মুখ থমথমে।মা পাশে এসে দাঁড়াল। আমার বাবা নেই।আমাদের একান্নবর্তী পরিবার।অন্য দুই চাচাও এলেন।সব শুনে বললেন রাতে দু’জন একসাথে থেকেছ।এটা যে কতো বড় অন্যায় করেছ তা কি তোমরা বুঝতে পারছো?

আমরা পরষ্পরের মুখের দিকে তাকালাম।এ ছাড়া কোন উপায় ছিল না বুঝাতে চেষ্টা করলাম।কিন্তু তারা ক্ষেপে গেলেন।বললেন আমাদের পরিবারের একটা মান সম্মান আছে।নদী তুমিতো ভাল করেই জানো আমরা এরকম ভাবে অভ্যস্ত না।তোমারটা দেখে ছোটরাও শিখবে।তার পর অরণ্যকে বললো যেহেতু এরকম হয়েছে এর একটাই সমাধান।তুমি এখনি ওকে বিয়ে করবে।আমরা দুজনেই চমকে উঠলাম।

অরণ্য বললো এটা সম্ভব নয়।আমি পড়াশোনা করছি।এখন আমার পক্ষে বিয়ে করা সম্ভব না।আমার বাবা মাও মেনে নেবেন না।

আমার চাচারা ওকে যথেষ্ট অপমান করলো।ওকে মেরে বাসা থেকে বের করে দিল।আমাকে ভিতরে নিয়ে যাওয়া হলো।আমি হতভম্ব।চাচারা রক্ষণশীল জানি কিন্তু তাই বলে অরণ্যর সাথে এরকম করলো।

মা চুপ।বাবা নেই অতএব সে চাচাদের সামনে কিছুই বলতে পারলো না।আমার সেলফোন নিয়ে নিলো চাচা।একটা রুমে আটকে রাখলো।আমি আমার জীবনে ঝড়ের আভাস পাচ্ছিলাম।সব সময় কেউ না কেউ আমার সাথে থাকছে।অতএব অন্য কোন ফোন দিয়েও অরণ্যের সাথে যোগাযোগ করতে পারলাম না।

সাতদিন পর আমার বিয়ে হয়ে গেল।আমার কোন কথাই কেউ শুনলো না।এমনকি কেউ আমার সাথে কথাও বলছিল না।যে ছেলেটির সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে ওর নাম রায়হান। ও আমেরিকা থেকে এসেছে।আগের ঘরে একটা ছেলে আছে।ওর ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে।ছেলে বাবার কাছেই থাকে।পাঁচবছর বয়স।আমার চাচারা জিদ করেই রায়হানের সাথে আমার বিয়ে দিয়ে দিল।আমার কোন বন্ধুবান্ধবের সাথেও আমি যোগাযোগ করতে পারলাম না।

বিয়ের পর আমি চুপচাপ হয়ে গেলাম।রায়হানের সাথে ভাল ব্যবহার করার চেষ্টা করতে লাগলাম।কিন্তু রায়হান আমাদের বাসা থেকেই আমার সম্পর্কে আজেবাজে কথা শুনেছে।কার থেকে শুনলো কিছু বললো না।কিন্তু ওর ধারণা হয়েছে ওকে আমরা ঠকিয়েছি।প্রথম থেকেই আমার সাথে খারাপ ব্যবহার শুরু করলো।এমনকি ছেলেকেও আমার সাথে মিশতে দিতো না।

রায়হানের সাথে আমি আমেরিকায় গেলাম।কিন্তু সেখানেও গৃহবন্দী।বলেই দিয়েছে আমি কারো সাথে মেলামেশা করি এটা ওর পছন্দ না।নিজের গণ্ডির মধ্যেই যেন থাকি।

জীবনের উপর ভীষণ অভিমান হলো।সব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলাম।এমনকি মার কাছেও ফোন করতাম না।অরণ্যর জন্য মাঝে মাঝে মন কেমন করতো।কিন্তু একরাশ লজ্জা আমাকে ঘিরে থাকলো।আমি যে এতো খারাপ পরিবারের মেয়ে সেটার জন্য কুণ্ঠা হতো।

তিনবছর কেটে গেল কিভাবে সেটা আমি ছাড়া কেউ জানে না।রায়হান প্রায়ই আমাকে মারতো।তিনবছর পর আমার একটা মেয়ে হলো।ওকে পেয়ে আমি একটা অবলম্বন খুঁজে পেলাম।মেয়েকে নিয়েই সারাদিন কাটতো।আমাদের বাসায় কেউ আসতো না।যেহেতু রায়হান আমাকে যেতে দিতো না। সবাই নিশ্চয়ই জানতো ঘটনা।তাই আমি নির্দোষ হয়েও সাজা পাচ্ছিলাম।

এর পাঁচ বছর পর রায়হান আমাকে নিয়ে দেশে এলো।দেশে এসে আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিলো।আমার চাচারা কিছু বললো না।আমি মেয়েকে আমার কাছে রেখে দিলাম।কেন যেন রায়হান কিছু বললো না।

রায়হান আমাকে মুক্তি দিলো।সত্যিকার অর্থেই আমি মুক্তির স্বাদ অনুভব করলাম।ঠিক করলাম মেয়েকে নিয়ে গিয়ে আমেরিকাতেই থাকবো, যত কষ্টই হোক।

কয়েকদিন পর একটি চিত্র প্রদর্শনীতে গেলাম।অনেকদিন পর বাইরের মুক্ত হাওয়ায় আমার খুব ভাল লাগলো।বের হওয়ার সময় মনে হলো কেউ আমাকে অনুসরণ করছে।পেছন ফিরে দেখলাম সামনে অরণ্য দাঁড়িয়ে।আমি স্থির হয়ে গেলাম।অরণ্য এগিয়ে এলো।নদী তুমি কোথায় আছ? কেমন আছ?দেখলাম অরণ্যর পরিবর্তন এসেছে।ধীরে ধীরে আমরা বাইরে এসে দাঁড়ালাম।একটু হেঁটে একটা গাড়ির সামনে দাঁড়াল অরণ্য। বললো, তোমার হাজবেন্ড কি আপত্তি করবেন যদি আমার সাথে আমার ফ্ল্যাটে যাও? আমি একটু হাসলাম।মনে পড়লো আমরা দুজনে একসময় ঠিক করেছিলাম ঢাকায় একটা বাড়ি করবো।আমি নিঃশব্দে ওর গাড়িতে উঠলাম।ও পাশে বসে চুপচাপ গাড়ি চালাচ্ছিল।দুজনেই হয়তো মনে মনে কথা বলছিলাম।

ওর বাসায় গিয়ে বললাম আর সব কোথায়?বললো বসো,আমি আমেরিকা থাকি।কয়েকদিনের জন্য এসেছি।বাবুর্চিকে ডেকে চা নাস্তা দিতে বললো।মুখোমুখি চেয়ারে বসে বললো এই আট বছরের কথা আমাকে বলবে, আমি শুনতে চাই।একবার ভাবলাম যাক যা চলে গেছে তা একেবারেই গেছে।আবারো বললো, বলো।মনে হলো ওকে বলবো না তো কাকে বলবো।ও যাওয়ার পর থেকে আস্তে আস্তে করে সব বললাম।

সব শুনে ও চমকে গেল।তোমাকে মারতো!তোমাকে ডিভোর্স দিয়েছে!অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলো।তার পর আমার পাশে এসে দাঁড়ালো।বললো, নদী আমাকে কি তুমি এখনো ভালবাসো?আমি চুপকরে থাকলাম।অরণ্য বললো নদী আমি কিন্তু সেই অরণ্যই আছি।তোমার অরণ্য। আমি বিয়ে করিনি।ভেবেছিলাম আর বিয়ে করবো না।তোমাকে ফেলে রেখে আমি চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলাম।তাই আমাকে এখনো তাড়া করে বেড়ায়।আমার হাতদুটো ধরলো।বললো আমরাকি এখনো সংসার করতে পারি না?চলো বেশি দেরি হয়নি।

প্লেনে সিনথিয়া আমার কাঁধে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছে।পাশে অরণ্য বসে আছে।আমরা ফিরে যাচ্ছি আমেরিকায়।
আমি নিশ্চিন্ত, নির্ভার!

About the Author লতা হামিদ

follow me on:

Leave a Comment: