বন্ধু দিবস আজকে তাইনা?

১.

দিনটা ভুলে যেতে চাইলেও হয়তো ফেসবুকই সেটা ভুলতে দেয়না।তোমাদের কত পরিকল্পনা আজ বন্ধু দিবসে প্রিয় বন্ধুকে নিয়ে ঘুরতে যাবে, আড্ডা হবে,গান হবে,সেলফী হবে আরো কত কি।আর আমি?আমার বন্ধু ছিল খুব কম। আমি যখন ক্লাস সিক্সে পড়তাম তখন আমার একটা বন্ধু হলো। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো। কোন দিন দেখিনি তাকে। চিঠি লিখতাম এবং সেও আমাকে চিঠি লিখতো। তার সাথে মোবাইলে একদিন কথা হয়েছিল।সে বলেছিল কোন দিন সে আমাকে ভুলে যাবেনা। এর পর আমি একবার ঢাকাতে আসলাম। তাকে ফোন করে জানতে চাইলাম তুমি কোথায়? সে বললো আমি ডিভি পেয়ে আজ আমেরিকাতে চলে যাচ্ছি।আমার আর বলা হলো না যে আমিতো ঢাকাতে এসেছি তোমার সাথে দেখা করতে চাই।সেই তার সাথে আমার শেষ কথা। আমি না হয় তার ঠিকানা জানতাম না কিন্তু সে তো আমার ঠিকানা জানতো। কিন্তু কোন দিন সে আমাকে চিঠি লেখেনি। কোন দিন যে আমার সাথে যোগাযোগ করেনি।

২.

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ডক্টর আতিউর রহমানের ভাইয়ের ছেলে শামিম ইয়াসার সায়ন।আমার ভাল বন্ধুছিল।আমরা একসাথে খেয়েছি, একসাথে ঘুমিয়েছি, এক সাথে কাধে হাত রেখে নদীর ধারে ধারে হেটেছি।তার সাথে কত শত স্মৃতি আমার।একদিন সে আমাকে বলেছিল “আমি দুধের মাছি নই যে সুসময়ে থাকবো আর দুঃসময়ে হারিয়ে যাবো” কিন্তু সুনীল গঙ্গোপাধ্যয়ের কবিতার বরুনার মত আমার বন্ধু কথা রাখেনি।সে ভুলে গেছে আমাকে।এমনকি আমি জানিইনা সে কোথায় কি অবস্থায় আছে।নাহ আমারতো আগেও যেমন দিন কাটতো এখনো তেমনি। তার পরও সে কেন ভুলে গেল জানিনা।নাকি তাদের স্ট্যাটাসের সাথে আমি ছিলাম বেমানান। এই ফেসবুকের যুগে তাকে ফেসবুকে খুজি কিন্তু পাইনা। তার সাথে জামালপুর জিলা স্কুলে যারা পড়তো তাদের কাছে খোজ নিই কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারেনা।বন্ধুত্ব এমনই।অথচ তার দেওয়া সেই ছোট্ট সুন্দর পাঞ্জাবীটা আজও যত্ন করে রেখেছি। আমার অন্তরে সে আজও আগের মতই আছে।

৩.

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস যখন নরসিংদি থেকে ঢাকার পথে গুলিস্থান পার হচ্ছে তখন ছাত্র ছাত্রীরা স্থানীয় লোকজনের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে।জায়গাটা বেশি সুবিধার ছিলনা।বাস কর্মচারিরা জোট বেধে আক্রমন করেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের।ভয়ে পালিয়ে এসেছিল তারা। কিন্তু সেখান থেকে সরে আসতে পারেনি একজন। সেই একজনের নাম রেদোয়ান।সে বন্ধুদের বলেছিল তোরা দ্রুত সরে যা নইলে বিপদ আছে।নিজে বিপদের মধ্যে পড়েও বন্ধুদের সে বাচিয়ে দিতে চেষ্টা করেছে। তার পর সেই সব নরপিশাচেরা রেদোয়ানকে এমন ভাবে মেরেছিল যে চিরকালের মত রেদোয়ান হারিয়ে গেল। চিরচেনা ক্যাম্পাসে আর কোন দিন রেদোয়ান ফিরে আসেনি।প্রথম প্রথম দু একদিন তার বন্ধুরা গলাফাটিয়েছে কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখুন এই বন্ধু দিবসেও তার সেই সব বন্ধুদের কেউ রেদোয়ানের কথা মনে করছেনা। সবাই ভীষণ ব্যস্ত আছে। রেদোয়ান কেন থাকবে তাদের সেই ব্যস্ততার ভীড়ে? কিন্তু আমার মনে পড়ে রেদোয়ানকে। তার সাথে যদিও আমার সম্পর্ক ঠিক বন্ধুত্বের মত ছিলনা তবে আমি আজও তাকে মনে রেখেছি।যখন নামাজ পড়ে প্রার্থনা করি তখন অবধারিত ভাবেই তার জন্যও প্রার্থনা করি। এখানে একটুও বাড়িয়ে বলছিনা। বন্ধু দিবসে রেদোয়ানের জন্য দোয়া করি।

৪.

খোঁজ নিলে দেখা যাবে আমার এই পোষ্টে যারা লাইক দিচ্ছে যারা শেয়ার দিচ্ছে যারা কমেন্ট করছে কিংবা যারা অন্তত পড়ছে এবং সিন করছে তাদের অধিকাংশের বাবা মা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী। আমার বাবার কথা তাদের জন্য।বন্ধু দিবসে আমি আমার বাবার কথা টেনে আনতে চাই কারণ আমার বাবাই আমার শ্রেষ্ঠতম বন্ধু।যদিও আমি বাবার সাথে অতটা ফ্রি নই তার পরও সেই আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু। আমার বাবার একটা বন্ধু ছিল। ছোট্ট বন্ধু। মানে বাবা যদি ক্লাস টেনে পড়ে তবে সেই বন্ধুটি ক্লাস ফোর।সেই বন্ধুরা ছিল খুব গরিব।পড়ালেখার খরচ জোগানোতো দূরের কথা দুবেলা খাবারই জুটতো না। আর আমার বাবা বাড়ি থেকে চাল ডাল এটা সেটা নিয়ে নিয়ে সেই বন্ধুকে দিত। এভাবে আস্তে আস্তে বড় হলো সেই বন্ধু।বাবা নিজে খেয়ে না খেয়ে টাকা জমিয়ে সেই বন্ধুটিকে দিতো।একদিন সেই বন্ধুটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো। তখনো কিন্তু বাবা তাকে সমান ভাবেই ভাল বাসতো।বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সে বড় ডিগ্রি নিলো,চাকরি পেলো এবং আস্তে আস্তে তার উন্নতি হতে লাগলো।

বাবা খুব খুশি যে তার সেই ছোট্ট বন্ধুটি অনেক বড় হয়েছে অনেক উন্নতি করেছে।অন্যদিকে সেই বন্ধুটি বদলে গেল।বাবাকে ভুলে গেল। শুধু ভুলেই গেলনা কথা না বললেই নয় এমন হলো।শহরে তার এখন বাড়ি আছে তার সন্তানেরা এখন সিঙ্গাপুর কানাডাতে ঘুরে বেড়ায়।আমার বাবার তাকে কোন আক্ষেপ নেই। বাবা আগে যেমন ছিলেন এখনো তেমনই আছেন।গ্রামে গেলে ঈদের সময় বাবার সেই বন্ধুকে দেখি বাবার সাথে কথাও বলেনা। এই হলো বন্ধুত্বের নমুনা।বন্ধু দিবস বলে তাই আমার কিছু আছে বলে মনে হয়না। বন্ধুত্ব মানে যদি এই হয় তবে সেই বন্ধুত্বকে আমি ঘৃণা করি।বন্ধুত্ব মানে কিন্তু কোন প্রতিদানের আশা করা নয় যেমনটি আমার বাবা কোন কিছুর প্রতিদান চায়নি। এখনো বাবাকে ঘিরে থাকে কত শত ছোটরা। তারা মনে করে আমার বাবা ছোটদেরবন্ধু।বাবা মন দিয়ে সবার কথা শোনে এবং যথাসাধ্য তাদের জন্য কিছু করতে চেষ্টা করে। আসুন বন্ধু দিবস যদি পালন করতেই হয় তবে আগে ভাল বন্ধু হই ভাল বন্ধুত্বের সংজ্ঞা জেনে নেই।লিখলে অনেক কিছু লেখা যেত কিন্তু তা আর লিখে লাভ কি? সবাইকে ভালবাসা ও শুভেচ্ছা।

About the Author জাজাফী

লেখক হয়ে জন্ম নেইনি, লেখক হতেও নয়। তবু আমি লেখক হলে, সেটাই হবে ভয়। জাজাফী এমন একজন যার অতীত এবং ভবিষ্যৎ জানা নেই, বর্তমানই সব।

follow me on:

Leave a Comment: