tomake - uwriter

তোমাকে

আমি বৃষ্টি। এক তুমুল ঝড়বৃষ্টির রাতে আমার জন্ম হয়েছিল। মা তাই নাম রেখেছেন বৃষ্টি। বৃষ্টি কিন্তু আমার খুব ভালো লাগে।

 

এক ঝুম বৃষ্টির দিনে হাসপাতালের বারান্দায় অনিকের সাথে আমার দেখা। আমি তাড়াহুড়ো করে যাচ্ছিলাম।অপরদিক থেকে আসা একজনের সাথে জোর ধাক্কা খেলাম। রাগে চেঁচিয়ে উঠলাম, চোখে দেখতে পান না? শুনলাম বলছে,আরে বৃষ্টি না! আমার নাম শুনে ঠিকমতো তাকালাম। প্রায় ছয়ফুট লম্বা সুদর্শন এক যুবক দাঁড়িয়ে আছে সামনে। বিস্মিত হয়ে বললাম,তুমি অনিক? হ্যাঁ! কিন্তু অতো হন্তদন্ত হয়ে কোথায় যাচ্ছ? তার পর হেসে বললো, আমার সাথে না হয়ে যদি অন্য কারো সাথে ধাক্কা খেতে?

তাহলে ঠিক মাথা ভেঙ্গে দিতাম, বললাম।

 

চাচি কেমন আছেন?তাকে দেখতে এসেছি।চলো যাই দেখে আসি।আমি এতোক্ষণ তার কাছেই ছিলাম।চাচির রুমে ঢুকে অসুখের গন্ধ পেলাম।আমি হাসপাতালের গন্ধ সহ্য করতে পারিনা।চাচি আমাকে দেখে খুশি হলেন।কথাবার্তা বললাম।অনীক বললো,চলো যাই।বাইরে এসে দু’জনে একটা কফিশপে বসলাম।কফি খেতে খেতে গল্প করছিলাম।ও বললো তোমার সাথে অনেকদিন পর দেখা।এর আগে যে দুইবার এসেছিলাম তুমি দেশে ছিলেনা,তাই দেখা হয়নি।আর আশ্চর্য তুমিতো একটা ফোনও করো না।আমি হাসলাম।দু’জনে কফিশপ থেকে বেরিয়ে রিক্সা নিলাম।ও আমাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল।বললো,দু’একদিনের মধ্যে এসে চাচা চাচির সাথে দেখা করবো।

 

আমাদের ফ্যামিলিটা বড়।সবাই ভিন্ন ভিন্ন থাকি কিন্তু মানসিকভাবে এক পরিবার ভাবি।আমাদের পরিবার অনেক উদার।চাচাত-ফুপাতো ভাই বোনেরা একসাথে আড্ডা দেই,দল বেঁধে বেড়াতে যাই।ভাই বোনের মতো সবাই এক সাথে বড় হয়েছি।অনীকই যা একটু দূরে ছিল।ও মালয়েশিয়া থাকে।ওখানে চাকরি করে।

 

দু’দিন পর ও আমাদের বাসায় এলো।মা অনুযোগ করলো এতো দেরিতে আসার জন্য।অনেকক্ষণ ধরে সবাই তুমুল আড্ডা দিয়ে ও খেয়ে চলে গেলো।

 

আমি চাকরি করি।আমার জীবন দর্শন হলো,খাব দাবো ঘুমাবো,চাকরি করবো,ঘুরে বেড়াব।বিয়েটিয়ে এখন না।একটু আনন্দ করে নেই।কোনো দায়িত্ব নেই।বাবা মাও তেমন কিছু বললো না।

 

অনীকের সাথে গল্প করতে ভালো লাগে।ও খুব আমুদে,কেয়ারিং।দু’জনে নাটক দেখে,সিনেমা দেখে,শপিং করে,খেয়ে দেয়ে হাসপাতালে গিয়ে সময় কাটিয়ে দিচ্ছি।চাচির কাছে দু’বেলা দু’জন নার্স থাকে তাই সমস্যা হয় না।

কোথা দিয়ে এক মাস কেটে গেল টেরও পেলাম না।অনীকের যাওয়ার সময় হয়ে এলো।চাচিকে বাড়ি নিয়ে এলো।চাচা থাকবেন,ও দুশ্চিন্তা করছিলো।কিন্তু কিছু করার ছিলোনা।ও চলে গেলো।যাওয়ার সময় বলে গেলো ফোন করো।আমিও যোগাযোগ রাখবো।

 

ওকে ফোনে বলতাম আমি ওকে খুব মিস করি।বলতো,হ্যাঁ আমাদের সময়গুলি খুব সুন্দর কেটেছে।ছয়মাস পর চাচি মারা গেলেন।আমাদের পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এলো।অনীক আসতে পারলো না।মাসখানেক পর ও ফোন করে বললো বাবা একা থাকে,আমার ভালো লাগেনা।ঠিক করেছি দেশে চলে আসবো।আমি ওকে বারণ করলাম দেশে চলে আসতে।কেননা এতোদিন পর ও দেশে অনেক কিছু মানিয়ে নিতে পারবে না ।শুনলোনা।একদিন ফোন করে বললো আমি চলে আসবো।

 

ও ঠিক চলে এলো।দু’জনে আবার সেই আড্ডা দেওয়া,ঘুরতে থাকা।একদিন দেখলাম ও খুব আনমনা।আমি বললাম কী হয়েছে?বিজনেসের কোন অসুবিধা?বললো, না তোমার সাথে কথা আছে।তুমি আগেই কিছু বলোনা।আমার তোমাকে খুব ভালো লাগে।বিয়ে করলে এরকম একটি প্রাণবন্ত মেয়েকেই করবো।আমি জানিনা আমাদের পরিবার থেকে রাজি হবে কিনা।তার আগে বলো তুমিকি আমাকে ভালোবাসো?

 

আমি বললাম,আমি এভাবে চিন্তা করিনি।হ্যাঁ তোমাকে পছন্দ করি কিন্তু বিয়ে করার কথা ভাবিনি।

ঠিক আছে তুমি সময় নাও।ভেবে আমাকে বলো।

 

বেশকিছুদিন চলে গেলো।ও আমাকে তাগাদা দেয়।নিজেকে বিশ্লেষণ করে দেখলাম আসলে আমিও ওকে কখন ভালোবেসে ফেলেছি!ঠিক করলাম আমিই আমার বাবা মাকে বলবো।ওর বাবা ওর কাছে শুনে খুব খুশি।কিন্তু আমার বাবা মাকে কিছুতেই বুঝাতে পারলাম না।তাদের একই কথা,আমাদের নিজেদের মধ্যে বিয়ে হয়না।তোমরা ভাইবোনের মতো বড় হয়েছ,লোকে মন্দ বলবে।

 

আমি অনীককে বললাম। ও বললো,আমার বাবাতো রাজি।চলো আমরা বিয়ে করে ফেলি।আমি বললাম,এভাবে বিয়ে করলে বাবা হার্টফেল করবে।তার শরীর ভালো না।ও আমাকে অনেক বুঝালো কিন্তু আমি নিরুপায়।ভালোবাসার মানুষটির জন্য বাবা মাকে কষ্ট দেব!

 

ওর বাসায় আমাকে নিয়ে গেলো।ওর বাবাকেও একই কথা বললাম।অনীক কোন কথাই শুনতে চাচ্ছিলোনা।ও কাঁদতে লাগলো।বললো বৃষ্টি তুমি আমার সাথে এরকম করতে পারোনা।আমিতো তোমার কোনো ক্ষতি করিনি।কী বলবো! বাসায় চলে এলাম।

 

কিছুদিনের মধ্যেই বাবা মা আমার বিয়ে দিয়ে দিলেন।না ওর সাথে আমি আর কোনো যোগাযোগ রাখিনি।ও- রাখেনি।

 

কয়েকবছর পর শুনলাম ও খুব অসুস্থ।হাসপাতালে আছে।হার্টঅ্যাটাক করেছে।অপারেশান হয়েছে,অবস্থা ভালো না।

 

আমি নিজের সাথে যুদ্ধ করে হেরে গেলাম।ওকে দেখতে হাসপাতলে চলে গেলাম।সবাই আমাকে দেখে একটু অন্যরকম ভাবে তাকালো।যেন আমিই দায়ী।

 

আমি ভিতরে ঢুকলাম।ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।আস্তে করে ওর কপালে হাত রাখলাম।ও কেঁপে উঠলো।ও চোখ মেলে তাকালো।ওর চোখে আস্তে আস্তে করে পানি জমে উঠলো।টপটপ করে পানি পড়ছে।আমি মুছে দিচ্ছি।ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলো।ডাক্তার আমাকে বললো আপনি বাইরে গিয়ে দাঁড়ান।আমি তখনো বুঝিনি ও অজানা রাজ্যে চলে গিয়েছে, আমাকে সম্পূর্ণ একা করে দিয়ে।

 

কলিংবেলের শব্দ শোনা যাচ্ছে।আমার মেয়ে স্কুল থেকে ফিরে মা মা করে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো।আমি ব্যাকুল হয়ে কাঁদছি।

About the Author লতা হামিদ

follow me on:

Leave a Comment: