অসমাপ্ত পরিণাম

-জিনাত, একটু দাঁড়াবি?

পেছন ফিরে তাকাতেই দেখতে পেল রণক। জিনাত আর রণক সেই কলেজ লাইফের বন্ধু। কলেজের গন্ডি পেরিয়ে একইসাথে ভার্সিটি ভর্তি কোচিং, এরপর একই ভার্সিটিতে চান্স পেয়ে যাওয়া। এভাবেই খুব সুন্দরভাবে বেড়ে উঠেছে ওদের বন্ধু্ত্বটা।
-কি হয়েছে বল জলদি? আজ একটু জলদি বাসায় ফিরতে হবে।

-এখানে নয়, মাঠের ঐদিকটাই চল।

-উফ, তোর এই প্রাইভেসি স্বভাবটা আর গেল না, রণক। আচ্ছা ঠিক আছে, চল।
মাঠের ওখানে গিয়ে থেমে গেল রণক। তার দেখাদেখি জিনাতও থামলো।

-জিনাত, আজই হয়তো আমাদের শেষ দেখা।

-মানে কি? কি বলছিস এসব আচমকা?

-হুম, ঠিকই বলছি। যদিও ব্যাপারটা সম্পূর্ণ তোর ওপরই নির্ভর করছে।

-কি সেই ব্যাপার?

-দেখ জিনাত, তুই কিন্তু বুঝেও না বোঝার অভিনয় করছিস। খুব ভালো করেই জানিস আমি তোকে পছন্দ করি। ঠিক পছন্দ না, ভালোবাসি। এর আগেও দুবার বলেছি, কিন্তু তুই মিথ্যে ছুঁতো দেখিয়ে চলে গেছিস প্রতিবারই।
চোখমুখ বেশ শক্ত হয়ে এসেছে জিনাতের। কোন রকম কথা না বাড়িয়েই চলে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে তার। কিন্তু না, আজ ব্যাপারটার একটা হেস্তনেস্ত করাই দরকার। এর আগেও সে কয়েকবার এ ব্যাপারে রণককে বুঝিয়ে বলেছে। কিন্তু রণক খুব জেদি ছেলে। ও খুব ভালো করেই জানে, ওকে হাজার বুঝিয়েও কাজ হবে না।
-দেখ রণক, আমি আগে যা যা বলেছিলাম সেসব আজও একবিন্দু মিথ্যে কোন ছুঁতো নয়। আমি সত্যিই এ জীবনে কারোর হতে পারবো না। আমি জানি তুই অনেক ভালো একটা ছেলে। তুই যাকে ভালোবাসিস একেবারে মন থেকেই ভালোবাসিস। আর এও জানি তুই তোর ভালোবাসার মানুষটাকে খুব যত্ন করে রাখবি।

-তাহলে তোর সেই ভালোবাসার মানুষ হয়ে এত ভালোবাসা আর যত্ন পেতে আপত্তি কিসের, জিনাত?

-আপত্তি নেই, ভালোবাসা আর আদর যত্ন জীবনে কে না পেতে চায়! কিন্তু ঐ যে বললাম আমি কখনোই কারোর হতে পারিনা। আমার একটা অতীত আছে। যে অতীত আমার বর্তমানকে ধীরেধীরে নিস্তব্ধ করে দিচ্ছে। আর ভবিষ্যতকে তো নিশ্চিত ধ্বংস করেই দিয়েছে।

-এটাই কি সত্য? নাকি আমাকে নিয়ে কোন সমস্যা? আমাকে নিয়ে সমস্যা থাকলে বলতে পারিস। চিন্তা করিস না, জানিসই তো আমি সত্য শুনে কষ্ট পাই না।

-কি বলছিস তুই? তোর মত মানুষকে ভালোবাসা হিসেবে পাওয়া অনেক ভাগ্যের ব্যাপার। আগেও তো কতবার বলেছি। দেখ রণক, আমি সত্যিই শুধু তোকে কেন কাওকেই জীবনের সঙ্গে বাঁধতে পারবো না। আমাকে না পেলে হয়তো তুই কষ্ট পাবি, কিন্তু পাওয়ার পর হারালে সেই কষ্ট সহ্য করতে পারবি না। আর এজন্যই আরও বেশি করে আমি তোর হতে পারবো না। হ্যাঁ, তুই ঠিকই বলেছিস। আজকের পর হয়তো আমাদের আর দেখা হবে না। আর না হওয়াটাই মঙ্গলের। আর বলছি না যে, তুই এ জীবনে আমার থেকেও অনেক ভালো মেয়ে পাবি। আমি তো জানি, তুই কতটা জেদি! এ জীবনে হয়তো আর কাওকে ভালোই বাসবি না। আচ্ছা এবার আমাকে যেতে হবে রে। ভালো থাকিস।

কথা শেষ করেই সেখান থেকে চলে গেলো জিনাত। রণকের সামনে আর থাকতে পারছিল না সে। এতক্ষণ অনেক কষ্টে মুখচোখ শক্ত করে কথাগুলো বলেছে রণককে। আর কিছুক্ষণ থাকলে হয়তো নিজেকে এভাবে কন্ট্রোল করা সম্ভব হতো না তার পক্ষে। আর কতই বা অভিনয় করা যায় নিজের সঙ্গ! কতই বা মিথ্যে বলা যায়, আমি তোকে ভালোবাসতে পারবো না! সে ও যে খুব করে ভালোবাসে রণককে। কিন্তু সে সত্যিই অপারগ। মৃত্যু তার দিকে ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে। গত তিন বছর যাবত এইচআইভি ভাইরাসে ভুগছে জিনাত।

একটা সময় প্রচুর ব্লাড ডোনেট করতো জিনাত। আমাদের দেশের যা অবস্থা, যেকোন ক্ষেত্রেই দায়িত্বরত মানুষগুলোর অবহেলায় আর অযতনে সম্পন্ন হয় প্রতিটা কাজ। যার ফল ভোগ করতে হয় জিনাতদের মতন তরুণ তরুণীদের যারা দেশ আর দেশের মানুষকে সাহায্য করার জন্য বিভিন্নভাবে বিভিন্ন সেবায় লিপ্ত হয়। আর নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও সে কেমন করে একজন মানুষকে তার জীবনে আনতে পারে, যার নিজেরও জীবন নিয়ে শঙ্কা দেখা দেবে এক্ষেত্রে! আর রণকের ব্যাপারে তো প্রশ্নই আসে না। তার সবথেকে ভালো বন্ধু রণক। নিজের সঙ্গে তার জীবনকে জড়িয়ে ছেলেখেলা করার কোন মানে হয়না। আর রণককে সে তার জীবনে এই করুণ পরিণতির কথা জানাতেও পারবে না। কারণটা খুবই সহজ। রণক জানলে খুব বেশি পরিমাণ কষ্ট পাবে। সেইসাথে আরও বেশি করে তাকে আপন করে নিতে চাইবে। আর তখন ওকে কিছুতেই মানানো সম্ভব হবে না। যার জন্যই রণকের কাছে বাধ্য হয়েই সবকিছু লুকোতে হয়েছে জিনাতকে। চোখের জল মুছে নিয়ে আরও দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে জিনাত। খুব শীঘ্রই তাকে এই বাতাস থেকে পালিয়ে যেতে হবে, যে বাতাসে রণকের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে।

অন্যদিকে রণক জিনাতের ব্যাপারে সবকিছুই জানে। দুজনার বাসায়ই ওদের বন্ধুত্বের ব্যাপারে জানে। দুজনের বাসায় প্রায়ই যাতায়াতও আছে ওদের। একবার বেশ কিছুদিন জ্বরের জন্য ভার্সিটিতে যেতে পারেনি জিনাত। সেসময় রণক তাকে দেখতে গিয়েছিল বাসায়। দুজনে মিলে জিনাতের ঘরে বসে আড্ডা দিচ্ছিল, এমন সময় জিনাত চা আনার জন্য রান্নাঘরে গেলে রণক ওর টেবিলের ওপর মেডিকেল ফাইল দেখতে পেয়ে হাতে নেয় ফাইলটা। হয়তো জ্বরের জন্য ডাক্তার দেখিয়েছে এবং সেখান থেকেই মেডিকেল টেষ্ট করিয়েছে ভেবেই ফাইলটা খুলে পাতা উল্টিয়ে দেখতে থাকে। দুটো পাতা উল্টানোর পরই রণকের সমস্ত শরীরের সঞ্চালন ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা হয়। সেখান থেকেই জানতে পারে জিনাত এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত। এদিকে ও জানলে জিনাতের খারাপ লাগবে ভেবে খুব তাড়াতাড়ি করে নিজেকে সামলে নেয় রণক। আরও কিছুক্ষণ খুব স্বাভাবিক ভাবে সময় কাঁটিয়ে ফিরে আসে সে। সেদিনটা খুব নির্মম ভাবে কেঁটেছিল রণকের। যেন বারবার তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। নিশ্বাসটা একেবারে বন্ধ হয়ে যাক, সেই প্রার্থনাই সেদিন সে করেছিল সৃষ্টিকর্তার কাছে। কিন্তু পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নেয় রণক। নিজেকে খুব কষ্ট করে বাঁচিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়, শুধুমাত্র জীবনের শেষদিনগুলিতে জিনাতের জীবনকে ভালোবাসায় রাঙিয়ে দেয়ার জন্য। জিনাতকে যে সে অনেক বেশি ভালোবাসে। কিন্তু বারবার চাইলেও জিনাত তাকে তার জীবনের সঙ্গে বাঁধতে রাজি হয়নি। আজ শেষবার বললেও খুব ভালো করেই জানে, জিনাতকে না দেখে কখনো থাকতে পারবে না সে। আর মুখে দেখা না হওয়াই মঙ্গলের বলে চলে গেলেও জিনাতও জানে, তার এ জীবন যতদিন আছে রণকের সঙ্গে দেখা হবেই তার। রণক যে ভীষণ জেদি ছেলে। যা কিছু বলেই বুঝানো হোক না কেন, বারেবারে সে ফিরে আসবেই তার জীবনে। যদিও সে ফিরে আসার পরিণাম অসমাপ্তই রয়ে যাবে বরবরের মত।

About the Author মুনতাসির সিয়াম

মুনতাসির সিয়াম। আমার নামটাই বিশেষণের বিশেষণ। এর পর আর কিছু যোগ করার প্রয়োজন পড়ে না।

follow me on:

Leave a Comment: