বেলার অবেলা

আজ জীবনের অপরাহ্ন বেলায় পৌঁছে গেছে বেলা। জানালার ভেতর দিয়ে একমনে নীল আকাশের দিকে চেয়ে আছে। ফিরে পেতে চাইছে বিগত দিনের সবকিছুকে। চোয়াল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুধারা। ঢাকা মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী বেলা বাবা -মার একমাত্র সন্তান। সহজ -সরলা,প্রাণচঞ্চলা, অনিন্দ্য সুন্দরী এই মেয়েটি বাবা -মায়ের আদরের ধন। বাবা এহসান চৌধুরীর বড় আশা ,তার মেধাবী,বুদ্ধিমতি এই মেয়েটি অনেক বড় ডাক্তার হবে। মার ও সেই একই ইচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ কি হলো বেলার? আজ দুদিন হয় বেলা হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে। ডাক্তার, মি.কামরুল হাসান বলতে পারছেন না কি হয়েছে ওর। আসলে বলতে পারছেননা ঠিক তা নয়। তিনি এই অসহায় বাবা মা কে বলতে চাইছেন না আসল সত্যটি। কিন্তু ডাক্তার না বললেও মেডিকেলে পড়ুয়া বেলা ঠিকই জানে কি হয়েছে ওর। তাই ডাক্তারের কাছে আকুল আবেদন যেন তার বাবা মাকে কিছুই না বলা হয়। কিন্তু সময় থেমে নেই, এগিয়ে চলেছে দুরন্ত গতিতে। আর এরই মধ্যে দিয়ে বিধাতা ও কেড়ে নিতে চলেছেন বেলার সুন্দর জীবনটাকে।

আজ সোমবার, বেলার বাবা বেলাকে হাসপাতাল থেকে বাসায় এনেছেন। ডাক্তার বলেছেন তার বেলা দুদিন পরই সেরে উঠবে। তাই এহসান চৌধুরী আজ মনের আনন্দে মার্কেটে যাচ্ছেন মেয়ের জন্যে কেনাকাটা করতে। কিন্তু ভালো নেই বেলা। টেবিলে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে বসে আছে। নাক দিয়ে ফোটা ফোটা রক্ত ঝরছে। লিউকিমিয়া তে আক্রান্ত অসীম সাহসী এই মেয়েটি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে মৃত্যুর দিকে। টিস্যু পেপার দিয়ে নাকের গড়িয়ে পড়া রক্ত মুছে ফেলল। তারপর আবারও চিন্তায় ডুবে গেছে বেলা। বেলার ক্যান্সার ধরা পড়ে প্রথম যেদিন ও মেডিকেল কলেজে প্রবেশ করে। ক্লাসে ঢুকেই অজ্ঞান হয়ে যায় ও।তারপর বান্ধবীরা মিলে ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। ওর ব্লাড ক্যান্সার একিউট মাইলয়েড লিউকিমিয়া। ডাক্তার সেদিনও বলেন নি কি হয়েছে ওর। তিনি বেলাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেন ‘ভেঙে পড় না মা। তুমি তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যাবে। তোমার বাবা মা কে আমার কাছে একটু আসতে বোল।’ অশ্রুভেজা চোখে এমন হাজারো কথা ভেবে চলছে বেলা। হঠ্যাৎ দরজা খুলে এহসান চৌধুরী মেয়ের ঘরে ঢুকলেন। ছুটে গিয়ে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, — দেখো মামনি তোমার প্রিয় চকলেট, পুতুল আর ওই যে তুমি যে লেখকের বই পছ্ন্দ কর তাও কিনে এনেছি। বাবার এই অসীম আনন্দ দেখে বেলার বুকটা কেপে ওঠে। চোখের জলও আর বাধা মানেনা। এহসান চৌধুরী মেয়ের চোখের পানি মুছে দিলেন। বললেন – ছিঃ মা কাদতে নেই। শোননি ডাক্তার বলেছেন ওষুধ খেলেই তুমি ভালো হয়ে যাবে? পিতার এই অসহায় চাহনি তে বেলার বুকটা ফেটে যেতে লাগল। তারপর হঠাৎ মিষ্টি হেসে বলল – আচ্ছা বাবা, আমি তো অনেক বড় ডাক্তার হবো তাই না? -অবশ্যই হবে মামনি। এটাই তো আমার সবচেয়ে বড় ইচ্ছা। পিতার এই উচ্ছাসে শরীর কেপে ওঠে বেলার।” –কি হলো বেলা? ও মামনি আবার শরীর খারাপ লাগছে? –বাবা আমাকে শক্ত করে ধরে রাখো। আমার যে বড় ভয় করে। ঐ দেখো কে যেন আমাকে ডাকছে। এহসান চৌধুরী মেয়েকে বুকের মধ্যে টেনে নিলেন। ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়। জ্বর হলে বাবা এমনি করে বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখতেন যেন অসুখ খুজেই না পায় তার ছোট্ট বেলাকে। তারপর জ্বর সেরে গেলে বলতেন অসুখ আমার ভয়ে পালিয়ে গেছে।

আচ্ছা বাবা কি পারে না আমাকে লুকিয়ে রাখতে? আল্লাহ ও আল্লাহ? আমাকে কি সত্যিই তুমি নিয়ে যাবে? ভাবতে ভাবতে আবারও নাক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ে। এহসান চৌধুরী লক্ষ্য করেন নি এর কিছুই।বিমূঢ়ের মত ভাবছেন তার ছোট্ট বেলা আজ কত বড় হয়েছে। কয়েক বছর বাদেই ডাক্তার হবে তার বেলা। কত মানুষের সেবা করবে ও। রুগ্ন মানুষগুলোতে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিবে ওর কমল হাতের ছোয়ায়। বাবা, ও বাবা? আমি তোমাকে আমার প্রিয় গান টা শোনাই? আস্তে আস্তে বলল বেলা। —–শোনও মামনি। “হাজার দুঃখ শোকে হৃদয় ব্যথায় যখন কাতর হাত বুলিয়ে মাথায় আমার বাবা করে আদর। ” হঠাৎ থেমে গেছে বেলা। বেলার স্বল্প আয়ুর হৃদযন্ত্র যেন হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেছে। এহসান চৌধুরী ডাকছেন —- বেলা ও বেলা ঘুমিয়ে পড়লি নাকি মামনি? বাস্তবিকই ঘুমিয়ে পড়েছে বেলা। চিরদিনের জন্যে ঘুমিয়ে পড়েছে ও। আর কখনও ডাকবে না বাবা -মা বলে। ও চলে গেছে দূরে, বহুদূরে…………। এহসান চৌধুরীর বুক ফাটা আর্তনাদে আজ কেপে উঠেছে সারা বাড়ি। মা অসহায় চোখে তাকিয়ে আছেন বেলার মৃতদেহের দিকে। অশ্রুহীন চোখে পাথরের মত নিশ্চল বসে থেকে তিনি দেখছেন তার একমাত্র মেয়েকে।হঠাৎ দুহাত প্রসারিত করে ডেকে উঠলেন — বেলা ও বেলা? মা ওঠ্। কলেজে দেরি হয়ে যাবে তো। কিন্ত কোথায় বেলা? কোথায় তার সেই হাসি মাখা মুখটি?যে ঠোঁটে হাসি লেগেই থাকতো। কষ্ট যাকে স্পর্শই করে নি কখনো , যে একা পথ চলে নি কখনোও, সে আজ একা একাই পাড়ি জমালো সেই দূরের কোনো এক দেশে।সেকি শুনতে পেয়েছে তার মমতাময়ী মায়ের এই ডাক? এভাবেই ঘুমিয়ে যায় অসংখ্য বেলা। অবেলায় না ফুটতেই ঝরে যায় যে ফুলগুলো জানি না তারা কতটা স্থান পায় মানুষের হৃদয়ে, কিন্তু আমার আজও মনে আছে বেলা নামের সেই ফুলটির কথা। এ সেই ফুল যা না ফুটেই ঝরে গেছে পৃথিবীর বুক থেকে। ।রেখে গেছে অসংখ্য প্রিয় মুখ আর প্রাণপ্রিয় মা-বাবা কে। এ সেই বেলা যা শেষ হয় অবেলায়।মৃত্যুর সোপানে পা রেখে চলে যায় দূরে, বহুদূরে…………।

About the Author তানিয়া পারভীন মুক্তা

তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি? নতুন নামে ডাকবে মোরে বাঁধবে, বাঁধবে নতুন বাহুডোরে, আসবো যাবো চিরোদিনের এই আমি ....... কখনো রবীন্দ্রের ভাবনায় ডুবেছি আবার কখনো হুমায়ূন বিচ্ছেদে ভক্তদের অশ্রুবর্ষনে ভিজেছি। লেখকের কলমের কালিকে অনূভব করেছি আর তখনি কেঁদেছি আমি......... ------ তানিয়া সব সাধারণ মানুষগুলোর মতই বেড়ে ওঠা এই বাংলার পরিসরে।

follow me on:

Leave a Comment: