সাইকোলজিক্যাল মার্ডার

টুপটাপ বাম হাতে ধরা কাঁচের বোতলটা থেকে অতি অবহেলে দুফোঁটা তরল নিজের ডান হাতটায় ঢেলে দিল রাহাত। সালফিউরিক এসিড। স্যরের চোখ এড়িয়ে গতকালের এক্সপেরিমেন্টের সময় কলেজের ল্যাব থেকে মেরে দিয়েছে সামান্য একটু। তবে ওর কাজ চলানোর মত যথেষ্ট ওটুকু। তীব্র যন্ত্রণায় চোখ অশ্রুতে টইটুম্বুর হয়ে গেছে ওর। হাত পুড়ে কয়লার বর্ণ ধারণ করেছে। তবুও এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পাচ্ছে ও এই মুহূর্তে। ওর সামনে দেয়ালের সাথে হাত-পা বাধা অবস্থায় পড়ে আছে ফারিহা। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর ওকে ধরেই বেঁচে ছিলো রাহাত। যদিও আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফারিহার মসৃণ গাল বেয়ে অবিরত অশ্রু ঝরছে। কিছু বলার জন্য মুখ নিশপিশ করলেও করার কিছু নেই, মুখ বন্ধ। গলায় পেঁচানো ওড়নাটা দিয়েই নিষ্ঠুরভাবে মুখটা বাধা ওর। ফর্সা গালে দাগ পড়ে যাচ্ছে শক্ত করে বাধায়। কিন্তু ওদিকে যেন কোন ভ্রুক্ষেপই নেই আজ তার।

সামনে রাখা অটবির টেবিলটার উপর একটা সার্জিক্যাল ব্লেড পড়ে আছে। যন্ত্রণায় কাতর রাহাত আস্তে আস্তে সেদিকে হাত বাড়াচ্ছে। রাহাতের বাসার আন্ডারগ্রাউন্ড ফ্লোরে আছে এখন ওরা। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর এই ডুপ্লেক্স বাড়িটায় একাই থাকছে সে। সুতরাং হুট করে কারো আসার কোন সম্ভাবনাই নেই। রাহাতের সাথে রাত কাটাতে এ বাসায় আগেও এসেছে ফারিহা। তাই গতকাল যখন ফারিহাকে রাহাত রাতে থেকে যেতে বলল, আপত্তি করেনি ফারিহা। কিন্তু রাহাত যে এরকম করবে কে জানতো তা।অতি সন্তর্পণে রাহাত সার্জিক্যাল ব্লেডটা হাতে তুলে নিচ্ছে।এরই মধ্যে সে বোতলের অর্ধেক এসিড নির্দয়ভাবে হাতের উপর খরচ করে ফেলেছে। কয়লার বর্ণ ধারণ করেছে জায়গাটুকু।

আস্তে আস্তে ফারিহার দিকে এগিয়ে আসছে রাহাত। হাতে সার্জিক্যাল ব্লেড। ফারিহার দু চোখ বেয়ে নামা মুক্তো দানার মত অশ্রু আতঙ্কে অনেক আগেই শুকিয়ে গেছে। সুন্দর ওই চোখ জোড়ায় মৃত্যুভয় রাহাতের সামনে এগিয়ে আসার সাথে সাথে সমানুপাতিকভাবে বাড়ছে। চোখ বন্ধ করে ফেলেছে ফারিহা। হৃদপিণ্ড বুকের মাঝে হাতুড়ি পেটাচ্ছে। মুখের উপর রাহাতের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস অনুভব করছে ফারিহা। আলতো করে চুমু খেলো রাহাত ওর কপালে। চোখ খুলতেই দেখতে পেলো রাহাতের হাত থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত ঝরছে। পোড়া জায়গাটার উপরের ধমনীটার দফারফা অবস্থা। নিজেকে কষ্ট দিয়ে যেন সে আজ দানবীয় আনন্দ পাচ্ছে। তাজা রক্তে ফ্লোর ভেসে যাচ্ছে। দ্রুত নিঃশেষ হয়ে আসছে উষ্ণ রক্ত। মারা যাচ্ছে রাহাত আস্তে আস্তে। এরই মাঝে সে বোতলের বাকি এসিডটুকুর ও সদ্ব্যবহার করে ফেলেছে। নিজের গলায়ই ঢেলে দিয়েছে। জিহ্বাসহ গলবিল পুড়ে গেছে এসিডে।এক হাতে গলা চেপে, মেঝেতে রক্তের উপরই শুয়ে পড়ে জীবন্ত চামড়া ছাড়ানো মানুষের মত যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে রাহাত। কি বিভস্যৎ মৃত্যু! আর চোখের সামনে তাই চেয়ে চেয়ে দেখতে হচ্ছে ফারিহাকে। নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটার নির্মম আত্মহত্যা।

রাহাতের নাম ধরে কয়েকবার ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে ওপেন করে রাখা ল্যাপটপটার পাশে বসে পড়লো সিফাত। রাহাতের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। স্লিপ মোড থেকে ল্যাপটপ চালু করতেই ব্যাকগ্রাউন্ডে ভেসে উঠল লেখাটা, ‘গ্রাউন্ড ফ্লোর, তিন রুম পরের রান্না ঘরে টানেল।” চট করে রান্না ঘরে এসে দেখল টানেলটার ঢাকনা এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারটার পাশে পড়ে আছে। দেরী না করে ঢুকে গেল সিফাত। ভেতরের দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়ালো সে। দেয়ালের সাথে বাঁধা ফারিহার পায়ের উপর পড়ে আছে রাহাতের প্রাণহীন দেহ। প্রাণপাখি ওপারের মায়ায় হারিয়ে গেছে।। ছুটে গিয়ে ফারিহার বাঁধন মুক্ত করলো সে। কান্নায় ভেঙে পড়েছে মেয়েটা। কথাই বলতে পারছেনা।একটু শান্ত হতেই সিফাত জানতে চাইলো এমন হলো কিভাবে? উত্তর দিতে না পেরে চুপ করে বসে পড়লো মেয়েটা। সে নিজেই উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছে এই প্রশ্নের। রাহাতের ড্রইংরুমে ফিরে এসেছে ওরা আবার। রান্নাঘর থেকে স্যান্ডউইচ বানিয়ে এনেছে সিফাত, ‘খেয়ে নে?’ ক্ষুধায় কাতর হলেও অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সে। টি-টেবিলের উপর রেখে আবার ল্যাপটপের কাছে ফিরে গেছে সিফাত। ওর ধারনা কিছু পাওয়া যেতে পারে ওতে। ব্যাকগ্রাউন্ডের ডক ফাইলটায় চোখ আটকে গেছে ওর। ‘বিদায়,মেঘ শহর’ নামের ডক ফাইল। ওপেন করে পড়া শুরু করে সিফাত। ল্যাপটপটা আস্তে করে তুলে নিয়ে ফারিহার সামনে বসল সিফাত। ‘মেরে ফেললি কেন রাহাতকে?’ কি? আবার বল। ক্যাম্পাসের শফিক ভাইয়ের সাথে তোর রিলেশন ছিলো? এইসব আবোল তাবোল কথার মানে কি সিফাত? রাহাত সব লিখে গেছে, শফিক ভাইয়ের সাথে তোর অন্তরঙ্গ একটা ছবিও আছে, দেখ। হুট করেই যেন হাজার ভোল্টের শক খেলো ফারিহা। চুপ হয়ে গেছে একেবারে। সিফাত আবার শুরু করলো এমন করলি কেন? রাহাত তো তোকে সত্যিই… খচ..কথাটা শেষ করতে পারলোনা সিফাত। সার্জিক্যাল ব্লেডটা ওর কণ্ঠনালী দুভাগ করে দিয়েছে। দুহাতে গলা চেপে ধরেছে ও। ওর কথা শেষ করে দিলো ফারিহা, ‘ভালবাসে! হা.হা.. লেটেস্ট নিউজটা হয়তো শোনেননি আপনি মি. সিফাত।শফিককে ওর ফ্ল্যাট থেকে ওকে মৃত উদ্ধার করা হয়েছে। কে যেন গলাটা কেটে ফেলেছে। হৃদপিণ্ড চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছে। দেহ থেকে হাত পা আলাদা করে দিয়েছে।’ হাহা..হাহা..পৈচাশিক হাসি শুনতে শুনতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো সিফাত। হত থেকে ল্যাপটপটা খসে পড়েছে, মেঝেতে পড়েই বন্ধ হয়ে গেল ওটা, সাথে সিফাতের জীবনপ্রদীপও।

পরিশিষ্ট:

দুই বছর পর, বিশেষ সেলে ফারিহার সামনে বসে আছে প্রফেসর শাফায়েত। ভদ্রলোক সাইকোলজিস্ট। এই মুহূর্তে প্রফেসর গভীরভাবে ফারিহার দিকে তাকিয়ে আছে। তার যেন বিষয়টা হজম করতে কষ্ট হচ্ছে, এই মেয়েটাই সাঁইত্রিশটা মার্ডার করেছে। নিজের বাবা-মাও মেয়েটার হাত থেকে রেহাই পায়নি। ছেলেদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে কিছুদিন পর খুব সন্তর্পণে গলাটা কেটে দিতো মেয়েটা। অথবা ইমোশোনাললি ব্ল্যাকমেইল করে নিষ্ঠুর আত্মঘাতী বানাতে এমেয়ের জুড়ি নেই। কাজটায় একধরনের অসুস্থ আনন্দ পেতো মেয়েটা। পৈচাশিক আনন্দ।

Leave a Comment: