রেলওয়ে কলোনীর কলি

এপ্রিলের মাঝামাঝি হবে। তখন আমি মাত্র ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিলাম। হাতে লম্বা ছুটি। বন্ধের এই সময়টাতে আর দশটা ফলাফল প্রত্যাশীর মত আমিও ছিলাম চিন্তাগ্রস্ত একইসাথে ভ্রমণপিপাসু। বিশেষ করে ট্রেন ভ্রমণের উপর আমার খুব ঝোক ছিল। বন্ধের সময়টাতে এমন দিন খুব কমই পাবেন যে দিন ট্রেন ভ্রমণ নিমিত্তে স্টেশনে যায়নি। অবশ্য জেনে আশ্চর্যান্মিত হবেন যে এতদ্ব আগ্রহ স্বত্বেও আমার ট্রেন ভ্রমণ রেঞ্জটা ১৫কিলোমিটার ছাড়ায় নি! কুলিয়ারচর ও ভৈরব দুটি রেলওয়ে স্টেশানের মধ্যবর্তী দূরত্ব ঐ ১৫কিমি। আর প্রায়শ ঐ দুটি স্টেশানে আসা যাওয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল আমার ট্রেন ভ্রমণ। আমার ভ্রমণ ব্যয়সংকটই হতে পারে এ সীমাবদ্ধতার কারন। যাইহোক,নিত্যকার­­ ভ্রমণকর্ম নিমিত্তে রেলস্টেশানে যাতায়াতের আধিক্যের কারনে সেখানে আমি ইষৎ পরিচিতি লাভ করি। ঘটনার সূত্রপাত সেখান থেকেই। স্টেশনে প্রায়শই বিশ্রী পোশাকে সুশ্রী একটা ষোল বছরের(আনুমানিক) মেয়েকে দেখা যেত যে কিনা স্টেশন মাষ্টারের ফুট ফরমাশ খাটত। প্রথম দেখাতেই তার প্রতি একটা মায়া জন্মে যায়। অবশ্য তার মায়াবী মুখ দর্শনে ঘোরতর শত্রুরও তার প্রতি মায়া জন্মাবে। সূচিশুভ্র চেহারার অধিকারী মেয়েটির চেহারার সাথে তার বিশ্রী পোশাক বড্ড মেমানান দেখাত।
তবু আমার চোখে তার বিশ্রী পোশাককে ছাপিয়া তার পুষ্পতুল্য মুখই মুখ্য ছিল। তাকে দেখার পর থেকে আমার দামি পোশাকের প্রতি আগ্রহটা শুন্যের কোটায় নেমে যায়। তাকে প্রথম দেখার পর থেকে কেন জানি তার সহিত আলাপের আগ্রহ জাগে যদিও তাকে দেখার পূর্ব পর্যন্ত মেয়েদের কিছুটা এড়িয়েই চলতাম। চাচাত বোন মিমির খুনসুটি,হাসি টাট্টা ইত্যাদিকে ছাপিয়ে আমার মনোজগতের পুরোটাই দখলে নেয় স্টেশানের সেই সূচিশুভ্র নাম না জানা মেয়েটি। ফলে ক্রমশ আমি হয়ে পড়ি আনমনা,হয়ে পড়ি স্টেশানমুখী। স্টেশানে­­ যাই তার দেখা পাই অথচ কথা বলা হয়ে উঠছিলো না। কথা বলতে না পারার আক্ষেপে জ্বলছিলাম। শেষে না পেরে বলেই বসলুম, এই যে একটা টিকিট করে দিবেন? আমারে কইতাছেন? হ্যা আপনাকে। আমি কেমনে টিকিট করে দিমু? না মানে স্টেশান মাষ্টারের সাথে তো আপনার যোগাযোগ ভাল দেখছি। একটা করে দিন না। ঠিক আছে দিন দিচ্ছি। তার সাথে কথা বলার ইচ্ছে ছিল তাই,তাকে দিয়ে টিকিট ক্রয় করাই। ৫০কিমির টিকিট ক্রয় করে ১৫কিমি ভ্রমণ করে কুলিয়ারচর নেমে যাই। আসলে ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিলনা। ছিল শুধু তার সহিত কথা বলা। পাখির মধুর কন্ঠের সহিত যদি মানুষের কন্ঠের মধুরতার তুলনা চলে তবে আমি এই মেয়েটির কন্ঠকেই শীর্ষে রাখবো। সে এক সুকন্ঠী মেয়ে।
তার চন্দ্রমাখা মুখ দর্শনের পাশাপাশি তার মধুমাখা কন্ঠের প্রেমে আকুন্ঠ হয়ে পড়ি। ফলে টানা তিনদিন ধরে তাকে দিয়ে এভাবে টিকিট করাই। এবং তিনদিনই ৫০কিমির টিকিট করে পূর্বমত ১৫কিমি গিয়ে নেমে পড়ি। জানি টাকার অপচয় হচ্ছিল।কিন্তূ ভাবনাতে তা ছিল না,ছিল শুধু মেয়েটির সহিত আরো কথা বলার আকাঙ্খা। চতুর্থ দিন একই কাজ করতে গিয়ে ধরা খেলুম।মানে মেয়েটি এবার বলতে লাগল কি প্রতিদিন টিকিট ক্রয় করে কিশোরগঞ্জ গিয়ে করেন? বাপের টাকা বেশি হইছে বুঝি।? না মানে। থাক আর মানে মানে করতে হবে নে। তা আপনি আমার দিকে এভাবে থাকিয়ে থাকেন কেন? কেমনে তাকাই? তার উত্তর ঐ যে কেমন যেন থাকান।অপলক তাকিয়ে থাকেন। তারপর থেকে তার সহিত প্রতিদিন কথা বলতাম। আমার মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করলাম। তারপর বাকিটা ইতিহাস। উভয়েরই মনের কথা প্রকাশ পেল। মেয়েটির সমন্ধে অতঃপর যা জানলাম তার সারাংশ এই তার নাম কলি। থাকে রেলওয়ে কলোনীতে। রেলওয়ে কলোনীতে থাকাতে কলির যত দুঃখ কলির কথাবার্তাতে তাই মনে হত। অপরাহ্নের আড্ডায় প্রায়শই কলি আমাকে বলত রেলওয়ে কলোনীর কলিকে কি তোমার পরিবার মেনে নিবে? আমি তাকে নিশ্চিত করে সান্তনা দিতাম। সে দিন বুঝিনি। আজ বুঝি কলির দুঃখের কারন এই আমি। কেননা কলি আমাকে খুব ভালবাসত।
সে সবসময় নিজেকে আমার অনুপযুক্ত ভাবত। তার মাঝে একটা অপরাধবোধ কাজ করত এই ভেবে যে রেল কলোনীর কলি আমি,আমি তো তার উপযুক্ত নই? তাহলে কি তাকে ঠকাচ্ছি? কেন জানি কলি ক্রমশ দূরে দূরে থাকত।আসলে এসব কলির যত উদ্ভট ভাবনা। আমার ভাবনার পুরোটাতেই ছিল কলি। ফলে তার দূরে থাকার চেষ্টা আমাকে তার আরো কাছে নিয়ে যায়। আজো রেলস্টেশানে একগাদা বেলি ফুল সমেত কলিকে বুকে টেনে বলি চিরদিনই তুমি যে আমার কলি। অবশ্য আজো তার সেই বোকা প্রশ্ন, রেলওয়ে কলোনীর কলিকে কি মেনে নিবে তোমার পরিবার!!??

About the Author ইয়াছির আরাফাত

যদিও ব্যক্তি ক্ষুদ্র তথাপি আমি ভদ্র, কি বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি? ব্যবহারই বলবে আমি বামুন না শুদ্র।

follow me on:

Leave a Comment: