অভিশপ্ত ইতিকথা

ঘড়িতে বিকেল ৫টা বেজে দশ। বিমানবন্দর রেলওয়ে ষ্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে রোহন, সঙ্গে তার মা। আসলে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে বললে কিছুটা মিথ্যে বলা হয়ে যায়। রোহনের অপেক্ষা মূলত অন্য কোন একটা কিছুর জন্য। আজ তার এইসএসসি পরীক্ষা শেষ হলো। তবে প্র‍্যাকটিকেল পরীক্ষাগুলো এখনো বাকি। মা এতদিন তার পরীক্ষার সুবাদে ঢাকায় এসে ছিলেন। তাকেই রেখে আসতে যাচ্ছে রোহন। যদিও বাড়ি যাওয়ার পেছনের প্রকৃত কারণটা অন্য। বাবাই তার মাকে এসে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। আর বলেছিলেন, পরীক্ষা একেবারে শেষ করে তারপর বেশ কিছুদিন সময়ের জন্য বাড়ি যেতে। প্রায় একবছর যাবত সে বাড়িতে যায়নি। সেজন্যই বাবা বলেছিলেন এবারে একটু দীর্ঘ সময়ের জন্য যেতে। কিন্তু একপ্রকার জেদ করেই সে মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরছে আজ। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি ফিরে যেতে চায় রোহন। এবারে বাড়ি ফিরে গিয়ে সে তার অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তি ভিক্ষা চাইবে। ভিক্ষা চাইবে গত দু-বছর থেকে অভিশাপের গ্লানিতে হারিয়ে যাওয়া রাতের ঘুমটুকু কোন একজনের কাছে। কোন একজন বলছি কেন! মেয়েটিকে আমি চিনি। তার নাম প্রেমা। রোহনদের পাশের বাড়িতেই থাকে প্রেমা ও তার পরিবার। রোহন যখন ক্লাস এইটে তখন প্রেমারা তাদের পাশের বাড়িতে এসে ভাড়া নেয়। খুব অল্প সময়ের মাঝেই আর পাঁচটা মফস্বল শহরের নিয়মে দুটো পরিবারের মাঝে বেশ ভালো সখ্যতা গড়ে ওঠে। দুই বাড়ির মধ্যে দূরত্ব এতটাই কম ছিল যে, ঘর থেকে বেরোলেই একে অপরের মুখ দেখতে হয় এমন অবস্থা। প্রেমা বয়েসে রোহনের চাইতে এক বছরের ছোট। দেখতে শুনতে আহামরি সুন্দরী না হলেও বেশ লাবণ্যময়ী চেহারা তার। তার টানাটানা দু- চোখের দিকে তাকালেই সেখানে ভাসতে থাকা স্বপ্নগুলোর সন্ধান পাওয়া যায়। বেশ প্রানবন্ত, চটপটে স্বভাবের মেয়ে। আর মুখ দিয়ে যেন সর্বক্ষণই কথার খই ফুটতেই থাকে। খুব অল্প সময়ের মাঝেই সবার সাথে মিশে যেতে পারে সে।

অন্যদিকে রোহন হচ্ছে একদম তার বিপরীত। চুপচাপ ও ধীরস্থির প্রকৃতির ছেলে সে। কারোর সাথেই তেমন করে মেশে না। ঠিক মেশে না নয়, চাইলেও খুব সহজে কারোর সাথে মিশতে পারে না। খুব ছোট থেকেই তার চিন্তাধারাগুলো তার বয়সী অন্যান্যদের থেকে একটু আলাদা ধাঁচের। যে কারণে তার খুব বেশি বন্ধুবান্ধবও নেই। রোহনের মা আজ অবধি তাদের বাসায় রোহনের কোন বন্ধু এসেছে বলে মনে করতে পারেন না। ঠিক বিপরীত বৈশিষ্ট্যের বলেই হয়তো দেখতে দেখতে একটা সময় প্রেমার মনে রোহনের জন্য একটু একটু করে ভালোলাগা জন্মাতে শুরু করে। যে ভালোলাগা একটা পর্যায়ে এসে ভালোবাসাতেও পরিণত হয়। রাতদিন মনেমনে রোহনের জন্য অস্থির হয়ে থাকে সে। রোহন যতক্ষণ বাসায় থাকে, ঘরে বাইরে ঘুরঘুর করতে থাকে প্রেমা। শুধুমাত্র একবার চোখে দেখবার জন্য। কোন কোন সময় এটা ওটা ছুতো ধরে রোহনদের বাড়িতেও যায় সে। কিন্তু এতকিছুর পরও রোহন যে তাকে তাকিয়েও দেখে না। ভালোবাসার কথা বুঝতে পারা তো অনেক পরের ব্যাপার। দেখতে দেখতে বছর ঘুরতে থাকে আপন নিয়মে। একটা সময় প্রেমা বিভিন্ন ভাবে তার ভালোবাসার কথা বোঝাতে চেষ্টা করে রোহনকে, যদিও সে ব্যর্থই হয়েছে বারবার। তবে রোহন যে একেবারেই কিছু বোঝেনি তা ঠিক নয়। কিন্তু সে ভেবেছিল এসব নেহাতই ছেলেমানুষি ধরনের প্রেম ভালোবাসা। যা বরাবরই তার কাছে হাস্যকর একটা ব্যাপার ছিল। তাই বুঝেও না বোঝার ভান করেই থাকতো সে। এরকিছুদিন পরেই প্রেমা একপ্রকার বাধ্য হয়েই রোহনকে তার ভালোবাসার কথা জানায়। রোহনকে নিয়ে তার প্রতিটা অনুভূতি, আবেগ আর স্বপ্নগুলোর কথা এক এক করে বলতে থাকে। কিন্তু উত্তরে রোহন প্রেমাকে বাস্তবতা বুঝিয়ে ছিল। যে বাস্তবতার কাছে এ ভালোবাসাকে এক সময় হার মানতেই হবে, তাহলে শুধু দুটো জীবন নষ্ট করার মানে হয়না এসবই বুঝিয়ে ছিল রোহন প্রেমাকে। তাছাড়া রোহন ভেবেছিল তার প্রতি এটা ভালোবাসা ছিল না প্রেমার, ছিল শুধু অল্প বয়সের এট্রাকশন। যা বয়স বাড়ার সাথে সাথে সহজেই কেঁটে যাবে। আর তখন যদি এ সম্পর্কটা ভেঙ্গে যায় রোহন সেটা সহ্য করতে পারবে না। সে এ জীবনে একজনকেই ভালোবাসতে চায়, আর তার সঙ্গেই সারাটা জীবনের বন্ধনে আবদ্ধ হতে চায়। রোহনের প্রত্যাখ্যানে সেদিন আর কোনকিছু না বলেই সেখান থেকে ফিরে গিয়েছিল প্রেমা। রোহনও ভেবে নিয়েছিল হয়তো একটু কষ্ট পেয়েছে সে, কিন্তু এ কষ্ট অল্প কিছুদিন পরই কেঁটে যাবে।

এরপর স্বাভাবিক নিয়মেই চলছিল রোহনের দিনকাল। প্রেমাও আর আগের মতন রোহনের আশাপাশে ঘুরঘুর করে না। স্কুল, প্রাইভেট আর বাসা এর মধ্যেই নিজের গন্ডি বেঁধে নিয়েছিল সে। এসব লক্ষ্য করে রোহনও স্বস্তি পায় এ ভেবে যে যাক, মেয়েটা তার কথাগুলো বুঝতে পেরেছে। এভাবেই চলতে থাকে তাদের দিনগুলো নিজেদের মত করে। রোহন তার এসএসসি কমপ্লিট করে ঢাকায় এসে ভর্তি হয়। তার মত করে সে জীবন পথে এগিয়ে যেতে থাকে। একবার কলেজের পরীক্ষা শেষে বাড়িতে যায় রোহন। গিয়েই কথায় কথায় মার কাছে যা শোনে, এরপর রীতিমত চমকে ওঠে সে। আজ বিকেলে নাকি প্রেমাকে নিয়ে এলাকায় বিচার ডাকা হয়েছে। যার কারণ, একই সাথে এলাকার একাধিক ছেলের সঙ্গে প্রেম করছিল সে। এর আগেও নাকি তার নামে বেশ কয়েকবার এসব ব্যাপারে অভিযোগ এসেছিল। কিন্তু এবারে হাতেনাতে ধরা পড়ায় এলাকার মুরুব্বিরা বিচার সভা ডেকেছেন বিকেলবেলা। যে বিচারে প্রেমার পরিবারকে এলাকা থেকে বের ও করে দেয়ার সিদ্ধান্ত হতে পারে। মনেমনে নানান কথা ভাবতে থাকে রোহন। সে তো প্রেমাকে খুব সহজ, সরল এবং ভালো একটা মেয়ে বলেই ভাবতো। আর এ মেয়ের আজ এই অবস্থা। ছিহ, সত্যিই লজ্জাষ্কর! বিকেলবেলা প্রেমাকে নিয়ে তার পরিবার বিচার সভায় যাওয়ার জন্য বের হলে ভাগ্যক্রমে রোহনের সামনে পড়ে যান তারা। এক ফাঁকে প্রেমার দিকে তাকাতেই আজ সকালে প্রেমাকে বলা ছিহ শব্দটার জন্য ঘৃণায় মনেমনে নিজেকেই ছিহ ছিহ করতে থাকে সে। এ সে কি দেখলো প্রেমার চোখে! এতকিছুর পরও মেয়েটার চোখে এক বিন্দু অনুশোচনা কিংবা লজ্জাবোধ ছিল না। যা ছিল তা শুধুমাত্র তার প্রতি কঠিন তিরস্কার। যে তিরস্কার খুব সহজ ভাষায় নিমেষেই রোহনকে বুঝিয়ে দিয়েছে তার আজকের এই পরিস্থিতিরর জন্য সে ই দায়ী। তার প্রতি জন্মানো ভালোবাসাকে অবজ্ঞা করার ফল। এরপর আর রোহন নিজেকে শান্ত করতে পারেনি ভেতর থেকে। তার জন্য আজ একজনের এই করুণ পরিণতির কথা ভেবে নিঃশেষ করে দিয়েছে নিজেকে। নিজের প্রতি থাকা সবটুকু ভালোবাসা এক নিমেষেই ঘৃণায় পরিণত হয়েছে তার। এরপর পালিয়ে এসেছে সে ঐ দমবন্ধ হয়ে আসা শহর থেকে। খুব জরুরি কারণ ছাড়া বাড়িতে যাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছিল রোহন। যদিও দু- একবার যখনই গিয়েছে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে প্রেমার সঙ্গে একটা বারের জন্য কথা বলতে। সেদিনকে তার ভালোবাসা না বুঝতে পেরে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য এবং তার কারণে আজকের এই পরিস্থিতির জন্য একটিবার ক্ষমা চাইতে। কিন্তু সে সুযোগ পায়নি সে। কখনো প্রেমাকে একা পেলেও প্রেমাই রোহনকে সে সুযোগ দেয়নি। বরং প্রেমার চোখে নিজের জন্য এতটা তিক্ত তিরস্কার লক্ষ্য করে ক্ষমা চাইবার সাহসও হয়নি তার। কিন্তু এবারই শেষবারের মত চেষ্টা করতে চায় রোহন। ক্ষমা না পেলে যে, সে তিলেতিলে ধ্বংস হয়ে যাবে। গত দু- বছর যাবত এই একটা কারণে চোখে ঘুম নেই রোহনের। নিজেকে নিয়ে বুনা স্বপ্নগুলোও কেমন ঝিম ধরে আছে সেদিনকার পর থেকে। প্রেমা চাইলে তাকে এখনোও আপন করে নেবে রোহন। নাহ, করুণা অথবা অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য নয়। তার প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসার জন্যই আজ প্রেমাকে আপন করে নিতে চায় রোহন।

হুঁইসেল দিয়ে এরই মাঝে ট্রেন প্রবেশ করে ফেলেছে ষ্টেশনে। এবার ট্রেনে উঠে এক নিশ্বাসে বাড়ি ফেরার পালা রোহনের। ফেরার পালা ভালোবাসার কাছে। কিন্তু প্রেমা কি আদৌও রোহনকে আপন করে নেবে? সবকিছু ভুলে রোহনকে ক্ষমা করে পুরনো ভালোবাসার কাছে ফিরে আসবে, এখন সেটা জানারই অপেক্ষা আর মাত্র কয়েকটা ঘন্টার।

About the Author মুনতাসির সিয়াম

মুনতাসির সিয়াম। আমার নামটাই বিশেষণের বিশেষণ। এর পর আর কিছু যোগ করার প্রয়োজন পড়ে না।

follow me on:

Leave a Comment: