প্রান্তিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশে এই মূহুর্তে ৪০ টি পাবলিক , ৯২ টি প্রাইভেট , ২ টি আন্তর্জাতিক এবং ২টি স্পেশালাইজড বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এদের মধ্য কোন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং নতুন হওয়া অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পিএইচডি ‘ এর অনুমোদন নেই।

– তথ্যসূত্রঃ Wikipedia

দীর্ঘদিন ধরেই অনেক প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক করছে। এক লেখাতে এতসব তুলে ধরা সম্ভব না, তাই আজ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অল্পকিছু বিষয় তুলে ধরতে চাই। এখন দেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অত্যন্ত প্রতিযোগিতামুলক এই পরীক্ষার পরে শিক্ষার্থীরা সরকারী ভর্তুকিপ্রাপ্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় ডিগ্রি অর্জন করার সুযোগ পাবে। কিন্তু কতটুকূ কাঠামোগত অবস্থা আমরা উপহার দিতে পারবো এই নতুন আরেকটি ব্যাচ কে ?

ইতমধ্যেই জেনেছি, নতুন হওয়া বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই উচ্চতর গবেষণার সুযোগ নাই। আর যেগুলোতে আছে সেগুলার অবস্থা কি ? কৃষি গবেষণায় আমাদের বেশ কয়েকটি সাফল্য আছে, কিন্তু অন্য সেক্টরগুলার কি অবস্থা ? বেশ কয়েক বছর ধরে আমাদের দেশে নোবেল পুরষ্কার নিয়ে অনেক কথা হয়, কিন্তু সেটা খুবই বিশেষভাবে নোবেল শান্তি পুরুস্কার এবং তার বিতর্ক নিয়ে। এইবার হয়ত আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেও নোবেল পেয়ে যেতে পারেন- তিনি সেটা ডিজার্ভও করেন। কিন্তু একবার কি ভেবেছি আমরা যে আমাদের চিকিৎসা ক্ষেত্রে নোবেল পাওয়া বা নোবেল পাওয়ার সুযোগ হওয়ার ক্ষেত্র তৈরী হওয়া উচিত ছিল ? দেশে এতগুলা বিজ্ঞান প্রোকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়… আমরা কি পদার্থ- রসায়নে নোবেল পেতে পারি না ? তৈরী করতেছি কি আমাদের? এতটুকু জায়গায় ১৬ কোটি মানুষের দারিদ্র-পিড়িত মানুষের এই দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ন, অর্থনীতির সূচকগুলো সবই ইতিবাচক- তাহলে আমাদের অর্থনীতিবিদ কোথায় যিনি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাবেন ? নাই। বরং কিছু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও বিবিএ এবং এমবিএ এর দিকটি লক্ষ্যনীয়।

এবার কিছুটা আলোচনা দেশীয় চাকরীর বাজার কেন্দ্রিক নাকি জাতি গঠন মূলক হওয়া উচিত আমি নিজেও ঠিক দ্বিধা-দন্দে পড়ে যায়! তবে যদি জাতিগঠনও হয় তবে আমাদের দক্ষ জনশক্তি তৈরী এটার ই অংশ। অনেক অনেক গ্রাজুয়েট উপহার দিচ্ছে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলা কোন সন্দেহ নাই, কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলা কি এই বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রীদের তৈরী করতে পারছে ? শিক্ষক বন্ধুদের সাথে কথা বলে জানতে পারি কাঠামোগত সমস্যা, কোয়ালিটি ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি ও অন্যকিছু সীমাবদ্ধতার কথা। আমি নিজেও বুঝি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, মেডিকেল এরপর অন্য জায়গায় পছন্দের তালিকা থাকে আমাদের। কিন্তু এটা বললেই সব শেষ হয়ে গেল ? আজকে যদি বিজনেস এডুকেসনের কথা বলি IBA, Dhaka University কি শুধু ভালো ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হয় এইজন্যই চাকুরীর বাজারে ভালো সফল হচ্ছে নাকি আছে নিজস্ব কিছু প্রক্রিয়া তাদের শিক্ষার্থীদের তৈরী করার জন্য ? সীমাবদ্ধতা এখানেও আছে, কিন্তু প্রচেষ্টাও আলাদা- লেটেস্ট ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে ক্লাসেই আলোচনা হয় যেন তাদের শিক্ষার্থীরা সময়ের সাথে প্রস্তুত থাকে। সবচেয়ে ফাকিবাজ মনে হওয়া শিক্ষকটিকেও দেখেছি পরীক্ষায় খাতায় যা লেখি খুব মনযোগ দিয়ে পড়ে নম্বর দিতে, দেশের ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়েনে কোন জায়গায় কাজ করা যায় তার পিছনে দিনের পর দিন ছুটে বেড়াতে! প্রান্তিক পর্যায়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও অনেক চেষ্টা করেন, নিজেই বুঝি কারণ আমি প্রান্তিক ও প্রাণ কেন্দ্র দুই জায়গার বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র ! কিন্তু পার্থক্যটা গড়ে দেয় দিন শেষে বই + কিছু জ্ঞানর্জনের সুযোগ!

এবারের প্রসংগ ছাত্র-ছাত্রীদের সংগঠন ও সামাজিক কার্যক্রম নিয়ে। সত্যকথা বলতে গেলে এটাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের একবারে নিজস্ব কিছু। দেশের প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ন সময়ে ছাত্র-ছাত্রীরাই জেগে উঠেছে। এখনকার ভুমিকা টা একটু ভিন্ন। ডিজিটাল একটা প্রজন্ম গড়ে উঠেছে এটা সত্য, তাই ভুমিকারও ধরন পরিবর্তন হয়েছে। এখনকার ট্রেন্ড অনুযায়ী বিতর্ক ক্লাবে লক্ষ্যনীয়ভাবে উপস্থিতিও বেড়েছে, হয়েছে ক্যারিয়ার ক্লাব, রিডিং ক্লাব, বিজনেস ক্লাব, সাইন্স ক্লাব সহ নতুন ধরনের সংগঠন। আর আগের মত নাটক, আবৃতি, নৃত্য আর সঙ্গিতের সংগঠন গুলাও রয়েছে। সময়ের সাথে ছাত্র-ছাত্রীদের সামাজিক এইসব সংগঠনে উপস্থিত বেড়েছে। আগের ক্লাবের সংখ্যাও বেড়েছে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে তাই একই কাজের জন্য একধিক সংগঠন দেখা যায়- যেটার ইতিবাচক ফলাফলও আছে। কেউ কেউ হয়ত ডিজাটালি সক্রিয় বেশী, কেউ আছে সবজায়গায়তেই। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় এইখানে ঢাকার বাইরের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহন। ঢাকার ছেলে- মেয়েরা যেমন বিভাগীয় বা জেলা পর্যায়ের আয়োজনে যাচ্ছে, প্রান্তিকের ছেলে-মেয়েরাও ঢাকায় আসতেছে। সম্প্রতি প্রান্তিক ছাত্র-ছাত্রীদের সাফল্যও চোখে পড়ার মত। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা, রংপুর সহ প্রান্তিক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা বিতর্ক, বিজনেস কেস, সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ভালো করছে। এমনকি আন্তর্জাতিক ট্যুর্নামেন্ট গুলাতেও অংশগ্রহন করছে। ঢাকা ও আশেপাশের বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা আলাদা করে এই লেখায় বলার কিছু নেই কারন তারা এমনিতেই এই জায়গাতে অনেক এগিয়ে।

এবার আসি নতুন কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। অবকাঠামো কবে হবে এটা আপনারাই (বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ) ভালোভাবেই জানেন, কিন্তু শিক্ষার্থীদের সামাজিক কার্যক্রমে প্রেরণা দেয়া এবং এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়া উচিত অত্যন্ত গুরত্বের সাথে। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের শিক্ষক রাজনীতির বাইরেই রাখা উচিত। আমি এমনও শুনেছি, ভাই স্যার এই মুহুর্তে এই অনুষ্ঠান (বিতর্কের) করতে দিবে না ! মুক্তবুদ্ধির কাজে ব্যাহত করলে আপনি নিজেই ই তো ছোট থাকবেন স্যার! আপনার যত্নের সন্তান ভালো করলে আপনার ব্র্যান্ডিং ই-তো বাড়ে ! এখানে কিছু কারন অবশ্য অন্যরকম একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যারকে দেখলাম এমন অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছেন যেটা আসলেই ছাত্র-ছাত্রীদের করা উচিত। এমনও শুনেছি ভাইয়া স্যার নিজে মডারেটর হতে চাচ্ছেন তাই গঠনতন্ত্র পাশ না করা পর্যন্ত ক্লাবের কার্যক্রম ঐভাবে হবে না। অথচ এই ভাইয়া/বন্ধুরা নিজেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাব করার সময় জানেন ছাত্র-ছাত্রীদের প্রকৃত বিকশিত করতে গেলে তাদের হাতেই ছেড়ে দিতে হবে সিদ্ধান্ত গ্রহন। আর পরাপর্শ ও সহযোগিতার ভূমিকাটা স্যারদেরই। আমি এসময় হিসেবে একটি ব্যতিক্রম উধাহরণ ই বলব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে। সব ধরনের ছাত্র সংগঠনের কার্যক্রম থাকলেও এই বিশ্ববিদ্যাল্যের ছাত্র হিসেবে মাত্র ১০ বছর আগেও আমাদের শুনতে হত মাদ্রাসায় পড়ি। প্রসাশনিক সহযোগিতায় ধরন টা ছিল একটা পরিবেশ দেয়া… আর ছাত্র-ছাত্রীদের অবস্থা দেখেন- নিজেরা নিজেদের অবস্থান, ব্র্যান্ডিং পরিবর্তন করেছে! বেশ কয়েকটা আধুনিক চিন্তা ধারার সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। এর মধ্য কিছুদিন আগে একটি বিতর্ক সংগঠন (BFDF,RU) সমস্ত উত্তর ও দক্ষিন বঙ্গের শিক্ষার্থীদের ৪০ টি দল নিয়ে ইংরেজি বিতর্কের আয়োজন করেছে, অংশগ্রহন করেছে আন্তর্জাতিক বিতর্কে। ক্যারিয়ার ক্লাব, মান, ইউনিস্যাব, আবৃতি ক্লাব, নাটক, গান, কিংবা রক্তদান সব ধরনের ক্লাবের কার্যক্রম চোখে পড়ার মতন। এখানে শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকাটাও পুরোপুরি অভিভাবকের মত। এমনকি সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের (বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, রাবি) ভূমিকা দেখেন- ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সুবিধার ক্যাম্পাস এলাকায় একটি নির্দিষ্ট পরিমান রিক্সা ভাড়া ধার্য করার প্রস্তাব দিয়েছে উপাযার্য স্যারের কাছে। ইতিবাচক পদক্ষেপ চাইলেই নেয়া যায়, এইসব নতুন ও প্রান্তিক পর্যায়ের জন্য এটাই বড় উদাহরণ কারন- প্রায়ই একটা যুক্তি থাকে যে ঢাকায় তো অনেক টাকা পসা পাওয়া যায়। রাজশাহীর জন্য যে বাস্তবতা অন্য একটি এলাকার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তবতায় খুব বেশী পার্থক্য আছে বলে মনে করি না। তাই দরকার সঠিক পদক্ষেপ। শিক্ষক বন্ধুদের অনূরোধ অভিভাবকের ভূমিকাটাই ধরে রাখা।

পরিশেষে, বাংলাদেশ সামগ্রিকভাবে উন্নত হতে গেলে প্রান্তিকের পেছনে পড়ে থাকাটা গলার কাটা হয়ে থাকবে বলে মনে করি। আর উন্নয়নের পথে প্রান্তিক থেকে প্রান্তিকের মানুষের ভুমিকা ই আসল। আমি নিজে উন্নয়ন না চাইলে, কে আমাকে তুলবে ? আমার বিশ্বাস প্রান্তিকে কাজ করার মত এখন অনেক প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত আছে। ব্যবসায়িক দিক থেকে চিন্তা করলে দেখা যাবে বেশিরভাগ কোম্পানিগুলা ঢাকার মার্কেট কাভারেজ করে এখন নজরটা প্রান্তিকেই। তাই প্রান্তিক এগিয়ে আসলে ছাত্র-ছাত্রীদের সামাজিক কাজের ফান্ডিং-ও বড় সমস্যা হবে বলে মনে করি না। শুধু দরকার সঠিক চিন্তা-ভাবনা ও পদক্ষেপের।

কামরুল হাসান
সামাজিক সংগঠক
ceo@ycdbangladesh.org

About the Author কামরুল হাসান

একজন সাধারণ মানুষ যে তার পছন্দ মত কাজ করতে ভালবাসে।

follow me on:

Leave a Comment: