নীড়হারা গাংচিল

দেয়ালের ঘড়িটায় সকাল নয়টা। হাল্কা নাস্তা খেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে পা বাড়ায় শামিম। উদ্দেশ্য নবীনবরণ অনুষ্ঠানে অংশ্রগ্রহণ। সে চান্স পেয়েছে এবার। তাই যাচ্ছে নবীনবরণে।

মেস থেকে পাঁচ মিনিটের পথ বিশ্ববিদ্যালয়। অচেনা চারপাশটার সাথে পরিচয় হতে হতে দ্রুত পৌঁছে যায় শামিম। কৃষ্ণচূড়া সড়কের মোড়টা পেরিয়ে সোজা অনুষ্ঠান স্থানে গিয়ে একপাশটায় বসে শামিম। অনুষ্ঠানটা শেষ হলো।

অতিথিবৃন্দ, স্যারদের বক্তব্যে অনেকেই বিচিত্র অভিজ্ঞতার দেখা পেল। অবচেতন মনে লালন করা স্বপ্নকে জাগ্রত করার পথ খুঁজে পেল। কিন্তু, কিছুটা অদ্ভুত স্বভাবের ছেলে শামিম অন্যদের মতো কোন স্বপ্নের খোঁজ পেলো না। সে ডেপার্টমেন্টের এক দুইটা বন্ধুর সাথে পরিচিত হলো। একটু আড্ডা দিল। বন্ধুদের সাথে সেলফি তুলে খানিকটা ঝড় তুলল ফেইসবুকে।

আড্ডার এক পর্যায় সামনে পড়ল একটা মাটির পরী। অবাক হয়ে দেখছিল শামিম। ভাল লাগল মেয়েটাকে। কথা বলার সুযোগ হলো না। সেই দিনের মতো চলে গেল সে।

বেশ কিছুদিন কাটলো। কোন কথা নাই সে মেয়েটিকে নিয়ে।

শামিম ক্লাশে যাচ্ছিল। সাথে ছিল বান্ধুবী নিশা,সুমাইয়া। হঠাৎ সেই পরীটা এসে দাঁড়িয়ে গেল ওদের পাশে। কিছুটা থমকে গেল শামিম। মেয়েটা নিশাদের পরিচিত সেটা জানা ছিল না তার।

মেয়েটিকে দেখে বান্ধুবীরা খুব খুশি। “গোধুলী” বলে ডাকলো তাকে। মেয়েটা ইশারায় কি যেন বলল। বুঝতে পারলো না শামিম। মেয়েটা কথা বলতে পারে না বুঝতে পেরে কষ্ট হয় শামিমের। দেখতে দেখতে ডেপার্টমেন্টের সামনে এসে যায় শামিম।

মেয়েটা ইশারায় বিদায় নিয়ে বিজ্ঞান অনুষদের দিকে পা বাড়ালো। শামিম তার বান্ধুবীদের সাথে ক্লাশে গেল। শামিম,সুমাইয়া ও নিশা একাউন্টিং ডেপার্টমেন্টের শিক্ষার্থী। শামিম ক্লাশ করে সোজা মেসে চলে আসলো।

মনটা খারাপ হয়ে গেছে তার। শুধু একটা প্রশ্ন বার বার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এত সুন্দর মেয়ে কথা বলতে পারে না?

রাতের ঘুমটা তো চুরি করেছে সেই গোধুলী। নির্ঘুম রাত কেটে যায়। সকালে উঠেই নিশাকে ফোন দেয় শামিম। গোধুলীর ফোন নাম্বারটা চায়। নিশা প্রথমে রাজি হয় না। রাগ করে ফোনটা কেটে দেয় শামিম। সারাদিন রাগ করে মেসে থাকে সে। ক্লাশে যায় না। বিকেলে আড্ডা দিতেও যায় নি।

সন্ধ্যা ছয়টা। ফোনে মেসেজ এলো বান্ধুবী নিশার ফোন থেকে। একটা ফোন নাম্বার লেখা, পাশে সেই ‘গোধুলী’ নামটা। মনটা আচমকা ভাল হয়ে গেল তার। মেসেজ দিয়ে বান্ধুবীকে ধন্যবাদ জানালো শামিম।

ফোনে মেসেজ দিলো মেয়েটাকে। পরিচয় দিলো। কেমন আছো, কি করো ইত্যাদি ইত্যাদি। মেয়েটা উত্তর দিলো। এমনিভাবেই দিন চারেক কথা বলতে বলতে একদিন গোধুলীকে প্রোপজ করেবসলো শামিম।

মেয়েটা সহজে উত্তর দিতে চায় না। বেশ কিছু সময় নিয়ে উত্তর আসে “আমি কথা বলতে পারি না। তুমি জেনে শুনে কেন আমার সাথে প্রেম করতে চাচ্ছো? মাফ চাই তোমার কাছে। আমার এমন জীবনের সাথে নিজেকে জড়িয়ে বৃথা কষ্ট পেতে তোমার যেমন ভাল লাগবে না তেমনি আমিও ভাল থাকবো না।”

মনটা আবার খারাপ হয়ে গেলো শামিমের। নিশাকে ফোন করে শামিম সব জানালো। নিশাও কিছুটা হতাশ। গোধুলীকে এতো ভালোবাসে শামিম, আর তাকেই ফিরিয়ে দিলো?

কয়েক দিন কেটে গেলো। কোন খোঁজ নেই শামিমের। সবাই খুব চিন্তিত। গোধুলির কানেও গেছে কথাটা। আজ বুঝতে পাচ্ছে শামিমের এই অবস্থার জন্য সেই দায়ী। সেই দিন মেসেজে আসল কথাটা বলা উচিৎ ছিলো। কেন যে বললো না !

বছর খানেক আগের কথা। কলেজের মাঠে বসে ক্রিকেট খেলা দেখছিলো গোধুলী। হঠাৎ করে বলটা এসে খুব জোরে লাগলো মাথায়।

তারপর কিছু মনে নেই তার। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন সে নিজেকে হাসপাতালের একটা কেবিনে আবিষ্কার করলো। সুস্থ হবার কিছুদিন পর জানতে পারলো ডাক্তার বলেছেন ধীরে ধীরে তার স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই ভয়েই সে শামিমকে জীবনে জড়াতে চাই নি। মনে মনে যখন এই কথাগুলি ভাবছিলো, ঠিক তখনই অজানা একটা নাম্বার থেকে মেসেজ আসলো গোধুলীর ফোনে।

“গোধুলী, জানি ভাল আছো। আমি ভাল নেই। আচ্ছা কি করছো তুমি? জানো যখন তুমি আনমনে বসে থাকো তখন তোমায় আমি দেখতে পাই। দেখি একটা ফড়িং তোমার মুখের উপর এসে পড়েছে, কি ভাবছো, ফড়িংটা আমি? হয়তো তাই। হয়তো তোমাকে ভালবাসি আজও। তাইতো কল্পনায় তোমার কাছে যাই। কি করব বলো? এর বেশি যে আমার কল্পনা করতে মানা। তোমাকে বড্ড ভালবাসি। ভাল যখন বাসলেই না তখন তোমার থেকে দূরেই থাকি। হয়তো কাছে গেলে তোমার স্মৃতিগুলি কাঁদাবে। এর চেয়ে ভাল হবে নীড়হারা গাংচিল হয়ে বেঁচে থাকা। ভাল থেকো গোধুলী।”

মেসেজটা পড়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো গোধুলী। বুঝতে পারলো এটা শামিমের মেসেজ। অনেক চেষ্টা করেও নাম্বারটাতে যোগাযোগ করতে পেলো না। হয়তো না পাওয়াটাও ভালবাসা। তাই বোধ হয় কেউ কাউকে পেলো না।

About the Author আল-আমীন আপেল

শ্বাসের আশায় ছাড়ি নিঃশ্বাস..

follow me on:

Leave a Comment: