ছবি নির্ভর অণুগল্প

ছবি নির্ভর অণুগল্প

“মা কলি কথা কয় না কেন, ওর কি হইছে, এতক্ষনতো কানতাছিল, অহন চুপ কেন?”
মা: “কলি ঘুমাইছে, তুই তারাতারি চল।”
“কলিরে খাওয়াইছিলা মা ?”
মা: “না, খাওয়াই নাই, তুই তারাতারি পা চালা, দেরি করলে বিপদ হইব।”

কলি আমার ছোট বইন, বয়স ২ বছর। আমরা দুই ভাই এক বইন, আমার নাম রাসেল বয়স ১১, আমার ছোট ভাইয়ের নাম সোহেল বয়স ৫ বছর, আর কলিরে তো অহন আপনে চিনেন। আমার মা পায়ে একটা কোপ খাইছে, গোড়ালির একটু উপরে, দাওয়ের কোপ, তিন ইঞ্চির মত কাটছে দরদর কইরা রক্ত পরতেছিল, অহন কাদার ভিতরে পা পইরা রক্ত প্রায় বন্ধ হইছে, মা কয় বেশি কাটে নাই। আমরা পলাইতাছি, দৌড়াইতে দৌড়াইতে অহন একটা পুকুর পাড় দিয়া হাটতাছি, কাঁচা পুকুর, এত কাদার মইধ্যে আর দৌড়ান যায় না। আমার পা কাদার ভিতরে এমনভাবে আটকাইছে প্রায় দুই মিনিটের মত হইছে অহনো ছুটাইতে পারি নাই, আমার দুই হাত অনেক ব্যাথা করতাছে, আমার কান্ধে সোহেল, মনে হইতাছে শরীরের শক্তি শেষ, গত প্রায় দুই দিন আমাগো কারো পেটে কোন দানাপানি পরে নাই। কলিরে মা কয়েকবার খালি বুকের দুধ খাওয়াইছে, কলি কেন যে কান্দেনা, আমার আর ভাল লাগেনা।

“মা, কলি কি আসলেই ঘুমাইছে?”
মা: “এত কথা কইসনাতো বাপ খালি তারাতারি পলা নাইলে আমাগো বাচন লাগবো না”
“মা, আব্বারে ওরা মাইরা ফালাইলো কেন?”
“জানিনা তারাতারি চল”
সোহেল: “ভাই আমরা কই যাইতাছি?”
“জানিনারে ভাই খালি আল্লার কাছে দোয়া কর যেন বাইচ্চা থাকি”
সোহেল: “ভাই আমার খুব ক্ষিদা লাগছে”
“আরেকটু ধৈর্য ধর ভাই”
সোহেল: “আর পারতাছিনা ভাই, মনে হইতাছে মইরা যামু”
“আরেকটু সবুর কর ভাই, আল্লার কাছে দোয়া কর”

আমার পা এতক্ষনে ছুটছে, কিন্তু ছুটলে কি হইব, আরেক পা দিলে আবারো হাটু পর্যন্ত কাদার ভিতরে ঢুইক্যা যায়। আমাগো বাড়ি ঘর সব ওরা জ্বালাইয়া দিছে, পরনে কাপড় যা ছিল, তা ছাড়া আর কিছুই লগে আনতে পারি নাই, কোনরকম জানটা হাতে লইয়া পলাইছি। আমার আব্বারে ওরা নাকি জবাই কইরা দিছে। রাইতের আন্ধারে মা কেমনে জানি আমাগো লইয়া পলাইছে। কতদূর যামু কই যামু কিছুই জানিনা, কিন্তু না পলাইলে বাচুমনা এইটুক জানি। আমার চোখ ঝাপসা লাগতাছে, রইদের তাপে ক্ষিদায় শরীর আর চলতে চায়না, আবার সোহেল আমার কান্ধে, দৌড়াইতে গিয়া সোহেল একবার মাথা ঘুরাইয়া পইরা গেছিল, তাই ওরে আমি কান্ধে নিছি। কিন্তু আর কতক্ষণ, আরতো পারতাছিনা। পিছন ফিরা দেখি আমার মায়ের কোলে কলির মাথা ঝুইলা পরছে।

“মা, কলি কি মইরা গেছে?”
মা: “রাসেল তুই এত কথা কস কেন, অহনো মরে নাই, ঘুমাইছে।”

মার কথা শুইনা হঠাৎ মনে হইল আমরা সবাই যদি ঘুম থাকতাম আর এইগুলা সব যদি দু:স্বপ্ন হইত কত ভাল হইত। আমরাতো ঘুমেই ছিলাম কিন্তু হঠাৎ মার ডাকে জাইগা দেখি এগুলাই সত্য। এই জঘন্য সত্য আর কতদিন চলব জানিনা, মনে হইতেছে সামনে আজীবনের ঘুম আমাগো সবাইরে ডাকতাছে।

Leave a Comment: