পকেটমারের খোঁজে

চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে উসখুশ করছিল সুমন ভাই।আমার সাথে হঠাৎই দেখা।আমি অফিস থেকে বেরিয়ে চায়ের সাথে টা মিলিয়ে খাচ্ছিলাম এমনসময় কোথা থেকে যেন সুমন ভাই এসে হাজির।কুশল বিনিময়ের পর বললাম চা খান।তিনি এক গাল হেসে দিয়ে বললেন চাতো খাবো না বরং পান করবো।আমি বললাম ভাই যে খাওয়া সেই পান করা। কিছু শব্দ আছে প্রচলিত অর্থে সঠিক এই চা খাওয়াটা হলো প্রচলিত সঠিক। চা পান করা বললে লোকে হাসবে যদিও কথাটি সঠিক। আর কথা না বাড়িয়ে তিনি ধোয়া ওঠা পেয়ালায় চুমুক দিলেন তবে তাকে বেশ উসখুশ করতে দেখে জানতে চাইলাম তা সুমনভাইকে খুব উসখুশ করতে দেখছি বিষয়টা কি? তিনি একগাল হাসি দিয়ে বললেন আর বলোনা একজন পকেটমার খুজতেছি কিন্তু পাচ্ছিনা।

আমি ভাবলাম লে হালুয়া ভাইয়ের পকেট মনে হয় কেউ একজন ছাপাছাপা করে দিয়েছে আর ভাই হয়তো সেই পকেটমারকেই খুঁজতেছে।আমি বললাম ভাই শেষ পযর্ন্ত আপনার পকেট কেটে নিয়ে গেল? তা কত টাকা ছিল পকেটে?আর কি কি নিছে?কখন নিল?টেরও পাইলেন না?

আমার একগাদা প্রশ্ন একসাথে শুনে তার কিছুটা রাগ হলো।বললো ধুরো মিয়া কি কও। আমার পকেট কাটতে যাবে কেন? চায়ের স্টলে আরো অনেকেই ছিল তাদের একজন আগ্রহ নিয়ে বললো তা ভাই তাহলে পকেটমার খুজতেছেন কেন? লোকটার প্রশ্ন শুনে বিস্তারিত ঘটনা বলতে শুরু করলেন সুমন ভাই।মতিঝিল গুলিস্থান নাকি এমন একটা জায়গা যেখানে গন্ডায় গন্ডায় পকেটমার ঘুরে বেড়ায়। অলিতে পকেটমার গলিতে পকেটমার বাসে পকেটমার পাবলিক টয়লেটে পকেটমার, ফাইলওভারে পকেটমার,ওভারব্রিজে পকেটমার সবখানেই নাকি পকেটমার। এই আজগুবি কথা তাকে কে বলেছে তা সেই জানে।

সে যেহেতু শুনেছে এই এলাকা হলো পকেটমারদের আড়ত।এখানে প্রত্যেক দুইকদম পা ফেলতে গেলে তিনজন পকেটমারের সাথে ধাক্কা লাগে।কথাটা সত্যি না মিথ্যা সেটা প্রমান করার জন্যই সেদিন ওই এলাকায় এসেছিল সুমন ভাই। কেউ যে নিজ থেকে পকেটমারের কবলে পড়ার মত বোকামী করতে পারে তা সুমন ভাইকে না দেখলে বিশ্বাসই হতোনা।

জিজ্ঞেস করলাম তা সুমন ভাই এতো এতো পকেটমারের কথা শুনে সত্যি সত্যিই এখানে পকেটমারের সন্ধানে এসে কি বুঝলেন?কোন পকেটমারের সাথে দেখা হলো? চায়ের পেয়ালাটা রাখতে রাখতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুমন ভাই বললেন আর পকেটমার! মানুষ সব কিছু এতো বাড়িয়ে বলে যে কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে তা বুঝে ওঠা দায়।এই এলাকায়তো দেখি কোন পকেটমারই নেই অথচ লোকে এলাকার বদনাম করে।আমি বললাম কি করে বুঝলেন এই এলাকায় কোন পকেটমার নেই? সুমন ভাই বললেন পকেটে এক হাজার টাকার একটা নোট নিয়ে দুই ঘন্টাধরে ঘুরেছি এই পুরো এলাকায় আর দেখতে চেয়েছি সত্যি সত্যিই পকেটমার আমার পকেটমারে কিনা।

কিন্তু আশ্চর্য হলাম কেউ আমার পকেট মারলোনা। সত্যিই যদি পকেটমার থাকতো তাহলে আমার টাকাটা কখন হাওয়া হয়ে যেত।আমি প্রতি বিশ মিনিট পর পর পকেটে হাত দিয়ে দেখি এক হাজার টাকার নোটটা সেরকমই আছে।আমি বললাম কী বলছেন সুমন ভাই? এই এলাকা এতো ভাল হলো কবে?তিনি বললেন তাইতো দেখছি। এতোদিন যে শুনে আসলাম পকেটমারের আড়ত হলো এই এলাকা আর আজ হাতে নাতে প্রমান পেলাম এই এলাকার মত নিরাপদ পকেটমারহিন আর কোন এলাকাই নেই।

চায়ের আড্ডা থেকে এক ভদ্রলোক উঠে গেল। যেতে যেতে সুমনভাইকে ইঙ্গিত করে বলে গেল ধুর মিয়া হুদাই প্যাচাল পাড়েন। পকেটে একটা এক হাজার টাকার জালনোট নিয়ে দুই ঘন্টা কেন দুই বছর ধরে ঘুরলেওতো পকেটমার হবেনা।লোকটার চেহারা দেখা হলোনা। এতোক্ষণ পাশেই বসে চা খাচ্ছিল অথচ খেয়ালই করা হলোনা।কিন্তু তার কথাটায় মনেরমধ্যে খটকা লাগলো। আমি সুমনভাইকে বললাম ভাই লোকটা কি করে বুঝলো আপনার পকেটের নোটটা জাল নোট!

সুমনভাই এবার মাথায় হাত দিয়ে বললেন ও মাই গড!! আমার পকেটে যে জালনোট এটাতো আমি ছাড়া আর কারো জানার কথাই না তাহলে ওই লোকটা কি করে জানলো?তার মানে লোকটা আমার পকেটে এখানে বসেই হাত দিয়ে টাকাটা পরখ করে দেখেছে।এর পর তিনি আশ্চর্য হয়ে বললেন কী অবাক কান্ড পাশে বসে থাকা ভদ্রলোকটিও পকেটে হাত দিয়ে আসল না নকল নোট বুঝে নিয়েছে মানে সেও একজন পকেটমার!অথচ বুঝতেই পারিনি কখন সে পকেটে হাত দিয়েছে।তার মানে এই দুই ঘন্টা ঘুরাঘুরিতে অন্তত বিশ পচিশজন পকেটে হাত ঢুকিয়ে বুঝেছে ওটা জাল নোট তাই কেউ নেয়নি!

চায়ের দোকানে বসে থাকা আরেক ভদ্রলোক বললেন ভাই আপনিতো দেখি সেরের উপরে সোয়াসের বলেই সেই লোকটাও উঠে চলে গেল।সুমনভাই তার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে হয়তো বুঝতে চেষ্টা করলেন এই লোকটাও পকেটমার কিনা।হতে পারে এই লোকটাও একবার হাত ঢুকিয়ে পরখ করে নিয়েছে।
সেদিনের মত সুমনভাইয়ের পকেটমারের খোঁজ করা শেষ হলো।তিনি চলে গেলেন আর আমিও চায়ের পেয়ালায় শেষ চুমুক দিয়ে অফিসের জন্য বেরিয়ে গেলাম।বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনের ষোল তলার জানালার ধারে বসে বার কয়েক বাইরে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল ওই বুঝি ভিড়ের মধ্যে সুমন ভাই নামে এক অদ্ভুত স্বভাবের লোক পকেটে একটা জাল এক হাজার টাকার নোট নিয়ে ঘুরছে কোন পকেটমারের খোঁজে।

About the Author জাজাফী

লেখক হয়ে জন্ম নেইনি, লেখক হতেও নয়। তবু আমি লেখক হলে, সেটাই হবে ভয়। জাজাফী এমন একজন যার অতীত এবং ভবিষ্যৎ জানা নেই, বর্তমানই সব।

follow me on:

Leave a Comment: