সংগঠন ও সংগঠক : বিতর্ক (পর্ব-১)

৩১ ডিসেম্বর ২০১৫, রাত ১১ঃ৩০ মিনিট। সবায় যখন ব্যস্ত থার্টি ফাস্ট নাইট উৎযাপন করবে, আমি তখন অফিসে। কি বোর্ডের বাটমগুলা আরো দ্রুত চালানোর চেষ্টা করছি। না আমার অফিসের বস আমাকে দায়িত্ব দেই নাই, বরং আমি নিজেই নিজেকে বলেছি- চলতি বছরের বাৎসরিক রিপোর্ট চলতি বছরেই দিব।

আসলে আমরা জীবনে অনেক কাজ এ করি- কিন্তু কেন করি? জীবনে কি সবকিছুই নিশ্চিত? কে বললে করি, আর কে বললে করি না ? হয়ত এরকম অনেক প্রশ্নই মাথায় আসে! তবে সবসময় যে কাজটি করি তাহল আমি নিজেই নিজেকে লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেই। আমি জানি আমি এই পৃথিবীতে একটাই মাত্র নিশ্চয়তা নিয়ে জন্ম গ্রহন করেছি- মৃত্যু!! তাই যা ভালো লাগে করি, ভালোভাবে না পারা পর্যন্ত করি।

২০০৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই নিজেকে ব্যস্ত রেখেছি বিভিন্ন সাংগঠিনিক কর্মকান্ডে। এই কাজ করতে গিয়েই বিতর্ক নিয়ে কাজ করার সুযোগ আসে। সিসিডি নামের একটি সংস্থার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন- বাংলাদেশ এ্যাডভান্স স্টুডেন্ট এ্যালায়েন্স (বাসা)। সংগঠনটি অনেক কিছুই করতো। কিন্তু একদিকে মিশু ভাই, লিটু ভাই দের মত বিতার্কিক অন্যদিকে সংস্থাটির কর্ণধার গোলাম মূর্তজা ভাইয়ের আগ্রহের ফলে বিতর্কের কাজগুলো একটু বেশী হত। নিঃসন্দেহে বাসা ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তথা রাজশাহী শহরের সেরা বিতার্কিকদের মিলন মেলা। অনেকেই ছিল যারা বিতর্ক করত না কিন্তু সকল আয়োজনে সহযোগিতা করত। একবার আয়োজন হবে রাজশাহী বিতর্ক উৎসব- মোট ৬৬ টি দল বিতর্ক করবে। অনুষ্ঠানটি নিয়ে কত যে ইতিহাস!! অধ্যাপক ইউনুস স্যার হত্যা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেন্যূ না দেয়া আরও কত কি! শেষ পর্যন্ত আমরা ফাইনাল করেছিলাম মোন্নাফের মোড়ে। উন্মুক্ত মঞ্চে দর্শকের অভাব ছিল না ! প্রথম দিনের কথা- আমার সেমিস্টার ফাইনাল চলছিল। বুলবুল ভাই (বিডিএফ এর তৎকালীণ সভাপতি) ও তুষার ভাই আসবে কর্মশালা নিতে। তুষার ভাই না আসার সম্ভাবনা নিয়ে তোপের মুখে মিশু ভাই- লিটু ভাইয়ের সেই ইমোশনাল বক্তব্য! পরিক্ষার মধ্যেই কাজ করছি কাউকে বুঝতে দেই নাই। অবশেষে তুষার ভাই আসলেন। সকাল বেলা আমি মিশু ভাইয়ের সাথে গেছি হোটেলে বুলবুল ভাই এবং তুষার ভাইয়ের সাথে দেখা করতে। সেখান থেকে পরীক্ষার হলে- তিন ঘন্টার পরীক্ষা ২ ঘন্টা দিয়ে বের হলাম। যোগ দিলাম কর্মশালায়। ঐ পরীক্ষায় আমার গ্রেড সবচেয়ে কম আসলেও রিটেক নিতে হয় নাই। এই বিতর্কে কি যেন এক টান যা গত ১২ বছরে বহুবার ছারতে চেয়ে পারিনি!তাই আজও হয়ত ছুটে বেড়ায় শহর থেকে শহরে এই বিতর্কের ই কাজে !

নানা ঘটনা আর উদ্দিপনায় ভরা মাঝের ইতিহাস টুকু অন্য একদিন… ২০০৭ সালের ২ ডিসেম্বর আমরা শুরু করলাম BFDF,RU এর যাত্রা- আনুষ্ঠানিকভাবে ৬ই ফেব্রুয়ারি ২০০৮ সাল। শর্মী আপু,এনাম, রনি, জুবায়েদ, জহির সহ অনেকেই (যাদের নাম আমি আগের লেখাগুলোতে বলেছি) ছিল একটি স্বপ্ন বাস্তবায়নে। আসলে স্বপ্ন দেখা সহজ, বাস্তবায়ন অনেক কঠিন একটা কাজ। সেই সময়কার প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যবৃন্দ, শিক্ষক মন্ডলী, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, গত ৮ বছরের প্রতিটি সংগঠকের শ্রম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহীর প্রতিটা শুভাকাংখী, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিতার্কিক ও সংগঠকের শুভকামনা ও সহযোগিতা, এবং আগামীতে যারা নেতৃত্বে আসবে সবায়কে নিয়েই BFDF। সকলের আশির্বাদ নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

সংগঠন মানুষকে কি দিতে পারে আর কি দিতে পারে না সেটা বিগত বছর গুলোতে হয়ত কিছুটা বুঝেছি। তবে আমার মনে হয় একটি সংগঠন ধারাবাহিক সাফল্য পেতে হলে তার সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য থাকতে হয়। যেমন আমরা একটি জাতীয় বিতর্ক উৎসব করবো- এটাই কি সব? এধরণের ইভেন্ট সংগঠনের জৌলুস বাড়ায়- আদর্শ ব্যাপারটা আলাদা। ঐ ইভেন্ট এ আমারা কি করবো তার মধ্য আমরা কি চেতনা ধারণ করি তা কিছুটা প্রতিফলিত করা যায়। একটা বিতর্ক সংগঠনের লক্ষ্যগুলো কেমন হতে পারে? কিংবা নিজের প্রতিষ্ঠান বা দেশকে আসলেই আমরা কি দিতে পারছি এই সংগঠনের মাধ্যমে? প্রশ্নগুলো খুব গুরুত্বপূর্ন। সংগঠন BFDF শুরু থেকেই কিছু লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে সেইসাথে চেতনা ও আদর্শও এখানে সুস্পষ্ট। শত বিপদ আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও এই সংগঠনের ছেলে-মেয়েদের মানসিক দৃড়তা দেখে আজ নিজেই অভিভুত হয়ে যায়। তবে আমি মনে করি, এখনকার বাস্তবতায় বর্তমান নেতৃত্বের আরো বিচক্ষণ হতে হবে। নিজেদের প্রকাশ করার ক্ষমতা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক হলেই হবে না,নিজেদের প্রকৃত উন্নয়ন করতে হলে, বৃহত্তর স্বার্থে সাংগঠনিকভাবেই বড় হতে হবে। দেশের ভেতর তো বটেই দেশের বাইরেও চিন্তা করতে হবে। এই বিচক্ষনতা শুধু পূর্ববর্তী ১/২ টি কিংবা সবগুলা কমিটিকে ছাড়িয়ে যাওয়া নয়। বাবর শুরু করবে, আকবর বড় করবে, আর কয়েক পুরুষ পর বংশ হারিয়ে যাবে- সংগঠন সংস্কৃতি এটা না। এখানে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অনেক জরুরী। অহংকারী হওয়ার হেকে বিনয়ী হওয়াটা অনেক মাধূর্য্যের। একা কিংবা একটি কমিটি অনেক দ্রুত কাজ করতে পারে, কিন্তু অনেক দূর যেতে হলে পরিবারের সবাইকে আস্থার সাথে নিয়েই কাজ করার চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে স্বপ্নটা অনেক বড় হওয়াটা খুবুই বাঞ্ছনীয়। সংগঠন বড় হলে , সংগঠনের সাথে জড়িত সবায়ই বড় হয়। তাই আমি মনে করি ভালোকাজে অতীত বর্তমান সবার সহযোগিতার মানসীকতা থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ন। আমার কাছে সঙ্গঠন মানে গুটুবাজীর মাস্টার হওয়া না! বরং সংগঠন একটি ভালোবাসা, আদর্শ ও স্বপ্নের বাস্তবিক রুপ।

অনেক ঝামেলার মধ্যেও আমি জিসানের একটি ফোনে রাজী হয়ে যায় রাজশাহী যেতে- এবছরে প্রাপ্য সবগুলা ছুটিই শেষ করেছি বিতর্ক সংশ্লিষ্ট কাজে। এবার গিয়েছিলাম আমার অর্জিত ছুটি থেকে একটা দিন নিয়ে- কারণ আমি জানি এই ছেলে মেয়ে গুলা আমার দেখা সবচেয়ে নিবেদিত প্রাণ সংগঠকের তালিকায় পড়ে। বাংলাদেশের বিতর্ক অঙ্গনে এটি কিভাবে লেখা থাকবে জানি না, তবে আমি আমৃত্যু স্বরণ করবো তাদের যারা বিতর্ক করে ব্যক্তিগত পুরস্কার হিসেবে ল্যাপ্টপ জেতার পরে সেটা বিক্রয় করে সংগঠন কে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করে। তাদের কাছে ৪র্থ জাতীয় বিতর্ক উৎসব আয়োজন টা অনেক সম্মানের। আমি সংগঠনটির তৎকালীন নেতাকে (জিসান) ফোন দিয়েছিলাম-‘এতগুলা দল যাবে, বিচারক যাবে অনেক খরচ… পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান তো কোন নগদ অর্থ দিচ্ছে না, কি করবি?” তার উত্তর- ভাই আমারা ৮০ জন সংগঠক থাকতে ৩২ টা দল আর ২৫ জন বিচারক না খেয়ে থাকবে না, আপনি চিন্তা কইরেন না। আমি অভিভূত হই। ব্যক্তি স্বার্থ চিন্তা করলে আমি ঢাকায় একই সময়ে অনুষ্ঠিত এত বড় আয়োজনের সাথে থাকলেই পারতাম, কিন্তু এই মুখগুলা আমাকে স্বার্থপর হতে দেই নাই। আমি বিশ্বাস করি এদের পরিশ্রম ও সততা এদের একদিন বহুদূর নিয়ে যাবে। হয়ত এরাই সংগঠন BFDF নিয়ে যাবে নতুন উচ্চতায়। অভিনন্দন টিম বিএফডিএফ, রাবি। জয়তু বিতর্ক, জয়তু সংগঠন! অনেক ভালো আয়োজন ছিল ৪র্থ বিএফডিএফ জাতীয় বিতর্ক উৎসব।

বিঃদ্রঃ লেখাটি বিএফডিএফ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ৪র্থ জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকার জন্য।

About the Author কামরুল হাসান

একজন সাধারণ মানুষ যে তার পছন্দ মত কাজ করতে ভালবাসে।

follow me on:

Leave a Comment: