দু’ জনে

ফাহিমের বাচ্চা, বদমাশ, বানর একটা। আজ আয় দেখাচ্ছি তোকে স্কুলের ছোট্ট টিনের ছাউনিতে এক ঘন্টা যাবত বসে আছে ফারিয়া । কি যেন জরুরি কথা আছে বলে সেই বিকাল 4টা থেকে বসিয়ে রেখেছে ফাহিম ওকে।

 

প্রায় 5 টা বাজতে চলল। দেখা নেই ওর। খুব তো মারতি আমাকে। আজ যদি তোর চুল না ছিড়ি তো মনে মনে বার কয়েক আবৃত্তি করে ও। স্কুল ছেড়েছে প্রায় 4 বছর হলো। আজ এত বছর পর কি বলবে ও?ভেবে পায়না ফারিয়া ।

 

ছোট্ট দুটি শালিক সেই কখন থেকে ঠোকাঠুকি করেই চলেছে। কেউ কম নয় কারো থেকে। ঠোকাঠুকি করে খানি দুরে সরে যায় ওরা। আবার কাছে এসে পালকে পালক ঘেঁষে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে । দেখতে দেখতে হেসে ফেলে ও।

 

নিজের ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে যায়। ফাহিমের সাথে চুল ছেঁড়াছিঁড়ি করে বড় হয়েছে দুজনে । কোনোদিন মারামারি না করে ভাত খেয়েছে বলে মনে পড়েনা।

 

ফারিয়ার স্কুল জীবনের সব চেয়ে ভালো বন্ধু ফাহিম । হুম বন্ধুই বটে চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেদিনের সেইসব ছেলেমানুষী। কখনো কখনো খেলার মাঝখান থেকে ফারিয়া কে চুল ধরে টেনে নিয়ে যেত ও।

 

ফাহিম : তোকে না বলছি অন্য ছেলেদের সাথে খেলবি না???

 

ফারিয়া : আমার বয়েই গেছে তোর কথা শুনতে যা ভাগ জংলি। কথা শেষ হবার আগেই পিঠের উপর তাল পড়তে শুরু করে। বেচারি ব্যথায় কুঁকড়ে যায়।কাঁদলে আরও মারবে ও তাই কাদতেঁ পারে না। তবুও চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে যায় ওর।

 

ফাহিম : আর ঢং করিস না। রিফাত- নাঈমের সাথে খেলতে দেব না তাই মেয়ের কান্না দেখ না যা ভাগ। মরগে যা তুই কিচ্ছু বলবো না আর আমি রাগে গজগজ করতে করতে চলে যায় ও। যাবার সময় বার কয়েক চোখ ও মুছে নেয় ও। ” আহারে খুব ব্যথা পাইছে হয়ত। এত জোরে না মারলেই পারতাম ” মুহূর্তেই ভ্রু কুঁচকে, “ভালো হইছে মারছি, আরও মারব ”

 

ওর সেদিনের সেই চোখের জল চোখ এড়ায়নি ফারিয়ার। ছোট্ট ফারিয়া এ অশ্রুর মানে বোঝেনি সেদিন। হয়ত বোঝেনি ছোট্ট ফাহিম ও। মাধ্যমিক এর রেজাল্ট এর কথা মনে পড়ে।দুজনই জিপিএ ফাইভ পেলেও বাংলার জন্য গোল্ডেন টা মিস্ হয় ওর।কিন্তু মনে মনে ভাবে জংলিটা কই গেল দেখছি না যে। পুরো স্কুল ঘুরে কোথাও পাইনি সেদিন ওকে। একমাস পর এই টিনের ছাউনিতেই ডাক পাঠিয়েছিলেন মহারাজা।

 

ফারিয়া : কিরে ট্রিট দেবার ভয়ে উধাও হয়ে গিছিলি??? ( (বলে নেওয়া ভালো যে ট্রিট চাওয়া ফারিয়ার কমন ডায়ালগ। চিকনা মাইয়াটা খালি খাই খাই করে কিন্তু খাইতে পারে না কিছুই। )

 

ফাহিম : (কষে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে) যা না রিফাত -নাঈমের ট্রিট খা। ওরাও তো গোল্ডেন পাইছে। বলেই রাগ করে চলে যায় ও। আর দেখা পায়নি ওর। পরে অবশ্য জানতে পেরেছিল ফাহিমের বাবা ঢাকায় বদলি হয়ে গেছেন। হয়ত ও সেই কথাই বলতে এসেছিল সেদিন। চোখের সামনে আজও সব কেমন পরিস্কার সেসব দিনগুলো। হঠাৎ যেন বাস্তবে ফিরে আসে ও। শয়তানটার এখনও দেখা নেই। আজ আয় তুই হঠাৎ চোখ পড়ে সামনের দিকে। স্কুল গেট খুলে অপরাধীর মত হেটে ফারিয়ার সামনে এসে দাড়াল ফাহিম ।

 

ফারিয়া : (কষিয়ে একটা থাপ্পড় দিয়ে) কোথায় ছিলি এতদিন? তোর বিকেল 4 টা বাজল এখন? কেন দেরি করলি বল????? অপরাধীর মত ফারিয়ার দিকে তাকায় ও। রাগে যেন আগুন ঠিকরে বেরোতে চাইছে ওর দু চোখ দিয়ে। ওর ছোট্ট সেই জঞ্জাল মেয়েটা বড় হয়ে গেছে অনেকটা। তীক্ষ্ণ হয়েছে সেই ছোট্ট চোখ জোড়া। কতটা সুন্দর হয়েছে সেই ছোট হাত পা গুলো। আর চুলগুলো? ওত ফাহিমের চির চেনা। ঔ কোঁকড়ানো চুল টেনে ফারিয়ার উপর কত অত্যাচারই না করত ও।বলত কোঁকড়ানো চুল না টানলে তোর চুল কোনোদিনই স্ট্রেইট হবে না। হাসি পেল ভাবতেই। কিন্ত ওমা একি ওর চুলগুলো তো আর কোঁকড়ানো নেই। স্ট্রেইট হলো কি করে? নিশ্চয়ই রিবন্ডিং করছে। দাড়া দেখাচ্ছি তোকে। কাছে গিয়ে থাপ্পড় বসিয়ে দেয় ওর গালে।চুল টেনে ধরে বলল তুই চুলগুলো পেত্নীর মত করলি কেন??? রাগে গজগজ করছে ফাহিম ।

 

ফারিয়া : আমার চুল আমি জাহান্নামে পাঠাবো। তাতে তোর কি? এত দেরি কেন করলি আগে সেটা বল।???

 

ফাহিম : গার্লফ্রেন্ডের সাথে কাজ ছিল। তোকে বলতে হবে?????

 

ফারিয়া : কি বললি??? গার্লফ্রেন্ড??? যা না তাহলে আমাকে কেন আসতে বলছিস??? গার্লফ্রেন্ড এর কাছে যা। বলেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে ও। চোখ মুছে নেয় রুমাল দিয়ে। রুমাল টা নজর এড়ায়না ফাহিমের। এটা ওরই রুমাল। ছোটবেলায় মারামারি করে কেড়ে নিয়েছিল ফারিয়া । আজও নিজের কাছেই রেখে দিয়েছে ও !

 

আমারও বয়ফ্রেন্ড ওয়েট করছে। আমি যাই। বলেই চলে যাচ্ছিল ফারিয়া।

 

ফাহিম : কি বললি???আবার বল্? মাথার চুল আর একটাও রাখব না তোর।

 

ফারিয়া : কেন না বলে চলে গেছিলি??? ফাহিমকে জড়িয়ে ধরে ও।

 

ফাহিম: দেখতে চাইছিলাম এই জঞ্জাল মেয়েটা আমাকে কতটা মনে রাখে।

 

ফারিয়া : কি বুঝলি?

 

ফাহিম : কিছুই বুঝিনি। বোঝার জন্য সারাটা জীবন দিবি আমাকে?????

 

ফারিয়া : যা ভাগ। তোর গার্লফ্রেন্ডের কাছে যা। আমি চাইনা তোর মত জংলি কে। কিন্তুু ওর গড়িয়ে পড়া অশ্রু বলে আমাকে ছেড়ে কখনো যাবি না বল????

About the Author তানিয়া পারভীন মুক্তা

তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি? নতুন নামে ডাকবে মোরে বাঁধবে, বাঁধবে নতুন বাহুডোরে, আসবো যাবো চিরোদিনের এই আমি ....... কখনো রবীন্দ্রের ভাবনায় ডুবেছি আবার কখনো হুমায়ূন বিচ্ছেদে ভক্তদের অশ্রুবর্ষনে ভিজেছি। লেখকের কলমের কালিকে অনূভব করেছি আর তখনি কেঁদেছি আমি......... ------ তানিয়া সব সাধারণ মানুষগুলোর মতই বেড়ে ওঠা এই বাংলার পরিসরে।

follow me on:

Leave a Comment: