ওয়ালপোস্ট এবং অতঃপর……

সকাল ৯টার দিকে দরজায় ক্রমাগত করাঘাতের শব্দ শুনে ঘুম থেকে জেগে ওঠে শাহেদ । তার মা ডাকছে নাস্তা খাওয়ার জন্য । ১০টার দিকে গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস আছে । তাই মা কে বলেছিল ঘুম থেকে ডেকে তুলে দিতে । ক্লাসের অ্যাসাইনমেন্ট কমপ্লিট করে,নেট ব্রাউজ করে,ফেসবুকে ঢুঁ মেরে,চ্যাটিং করে ভোর চারটার দিকে ঘুমাতে গিয়েছিল । সেই ঘুম ভাঙ্গল এখন,মায়ের ডাকে। আড়মোড়া ভেঙ্গে,বড় একটা হাই তুলে বিছানা থেকে নেমে ওয়াশ রুমের দিকে যায় সে । ফ্রেশ হয়ে এসেই বসে পড়ে কম্পিউটারের মনিটরের সামনে । উদ্দেশ্য ফেসবুকের নোটিফিকেশনগুলো চেক করা । লগ ইন করতেই নিজের ওয়ালে দেখতে পায় একটি পোস্ট । পোস্টটি ছিল এরকম-“ তুমি একটা আস্ত বোকা ” । সকালে ঘুম থেকে উঠেই এ ধরণের একটা পোস্ট দেখে শাহেদ অবাক হয়ে গেল । সে কি এমন বোকামি করেছে ?

 

একটু পরে পোস্টটি যে করেছে তার নাম দেখে সে চমকে উঠল । পোস্টটা করেছে তার ডিপার্টমেন্টেরই এক মেয়ে । নাম আনিলা । ভার্সিটি লাইফের প্রথম ক্লাসেই দেখা হয়েছিল তার সাথে । হরিণীর মত টানা টানা চোখ,কোমর পর্যন্ত নেমে যাওয়া চুল আর অপূর্ব মাধুর্যময় চেহারার অধিকারিণী আনিলাকে প্রথম দেখাতেই ভালবেসে ফেলে শাহেদ । কিন্তু কখনো বলা হয়ে ওঠেনি-“ ভালবাসি তোমায় ” ।

 

একদিন আনিলাকে নিজের মনের কথা জানাবার জন্য চিঠি লিখতে বসল । নিজের পছন্দ ও ভালোলাগার অনুভূতিগুলো জানিয়ে একটা চিঠিও লিখলো । কিন্তু নানা কারণে (কিংবা সুযোগ ও সাহসের অভাবে) আনিলাকে দেয়া হয়ে ওঠেনি সেই চিঠি । সযত্নে একটা নোট-বইয়ের ভিতরে রেখে দিয়েছিল চিঠিটি ।

 

দিন কেটে যায়, মাস কেটে যায়, কেটে যায় পুরো একটা বছরও । ক্লাসে,ক্যাম্পাসে বা পথে-ঘাটে দেখা হলেই শাহেদ তাকিয়ে থাকত আনিলার দিকে, গভীর ভালোবাসা নিয়ে অপলক দৃষ্টিতে । নোট-বই আদান-প্রদান কিংবা পাঠ্য বিষয় সম্পর্কে আলাপের ছুঁতোয় আনিলার সাথে কথা বলার সুযোগ খুঁজত । কিন্তু আনিলা তেমন একটা পাত্তা দিত না ওকে । যদিও আনিলাকে কখনো তার উপর রাগ করতে দেখেনি । এমনকি মাঝে মাঝে সে ও অর্থপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে শাহেদের দিকে তাকাতো । তার চোখের ভাষা শাহেদ কখনো বুঝতে পারে নি ।

 

আনিলার কাছ থেকে এরকম একটি পোস্ট পাওয়ার পর শাহেদের মনটা কেমন যেন করে উঠলো । সিদ্ধান্ত নিল ভার্সিটিতে গিয়েই দেখা করবে আনিলার সাথে । দ্রুত রেডি হয়ে, নাস্তা খেয়েই সে বেরিয়ে পড়ে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে। ডিপার্টমেন্টের দিকে যাওয়ার পথেই দেখা হয়ে যায় ওর সাথে । বান্ধবীদের সাথে গল্প করছে করিডোরের এক পাশে দাঁড়িয়ে । বান্ধবীরা সাথে আছে দেখে শাহেদ ঠিক করল যখন ও একা থাকবে তখন সে কথা বলবে ওর সাথে । এই ভেবে সে আনিলাকে কিছু না জিজ্ঞেস করে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে লাগলো । ঠিক তখনই পিছন থেকে আনিলা ডাক দিল শাহেদকে ।

 

অন্যান্য সময় দেখা গেছে শাহেদই যেচে গিয়ে বিভিন্ন ছুঁতোয় আনিলাকে ডাকত । তবে যখন সে একা থাকত,তখন । কিন্তু এখন বান্ধবীদের সামনেই আনিলা ডাক দিল শাহেদকে । বিষয়টা অবাক করলো তাকে । কিন্তু সেটা চেপে রেখে সে এগিয়ে গেল আনিলার দিকে । সে যাওয়া মাত্রই আনিলা একটু মুচকি হেসে শাহেদের হাতে একটা নোট-বই ধরিয়ে দিল । শাহেদ তাকিয়ে দেখল নোট-বইটা তারই । মাত্র গতকালই সে এটা তাকে দিয়েছে । কিন্তু আজ তো এটা তার ফেরত দেয়ার কথা নয় । আর এর সাথে ফেসবুকের ওয়ালপোস্টটার সম্পর্কই বা কি ? শাহেদ  কিছুতেই বুঝতেই পারছে না কি হচ্ছে । সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে আনিলার সামনে । আনিলা ঘুরে চলে গেল মাঠের দিকে, বান্ধবীদের নিয়ে । শাহেদ বিস্ময়ভরা চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে তার হেঁটে যাওয়া পথের দিকে । কি যেন এক ঘোরের মধ্যে সে আছে ।

 

ঘোর কাটলো ঘনিষ্ঠ বন্ধু আসিফের কথায়-“ কি রে, এভাবে বোকার মত দাঁড়িয়ে আছিস কেন ? ” শাহেদ তখন তাকে ওয়ালপোস্ট আর নোট-বইয়ের ব্যাপারটা খুলে বললো । শুনে আসিফ একচোট হেসে নিলো । তারপর বললো- “ তুই তো আসলেই বোকা । নোট-বইটা খুলে দেখেছিস একবারও ?” “ না তো ! ”,বলেই সে নোট-বইটা খুললো । খুলে দেখলো এর ভিতরে একটা ভাঁজ করা কাগজ । আর তাতে নীল কালি দিয়ে লেখা-“ সব কিছু কি মুখে বলে বোঝাতে হয় ? তুমি যদি বুদ্ধিমান হতে তবে প্রথমেই বুঝে নিতে । নিজের মনের কথাটাও সরাসরি বলতে পার না? তুমি আসলেই একটা বোকা । আর তোমার এই বোকামির জন্যই তোমাকে আমার অনেক ভাল লাগে । আই লাভ ইউ । ”

 

শাহেদ চিঠিটা পড়ে খানিকটা পুলকিত হলেও বুঝলো না এটা কি করে সম্ভব ? তখন তার আর এক বন্ধু অপু জানায়- “ এটা সেই নোট-বইটা যার ভিতরে ছিল অনেকদিন আগে আনিলাকে নিজের ভালোলাগার  কথাগুলো জানিয়ে লেখা চিঠিটা,যেটা কখনো দেয়া হয় নি তাকে । সেটাই গতকাল হাতে পেয়ে আনিলার এই চিঠি আর আজকের সকালে ফেসবুকের ওয়ালপোস্ট । ”

 

কথাগুলো শুনেই আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে দৌড়ে ছুটে গেল মাঠের দিকে । মাঠের এক কোণায় বান্ধবীদের সাথে দাঁড়িয়ে আছে আনিলা । তার কাছে গিয়ে সবার সামনেই উদ্ভ্রান্তের মত বলে উঠলো, “ আনিলা,আই লাভ ইউ । ” তারপর একটা হাত বাড়িয়ে দিল আনিলার দিকে । শাহেদের সেই বাড়িয়ে দেয়া হাতটা ধরল আনিলা । হেঁটে চলল একসাথে । আজ থেকে শুরু হল দুজনের নতুন পথ চলা…।

About the Author রায়হানুল ইকবাল ইভান

স্বপ্ন দেখতে খুব ভালোবাসি। তবে তা ঘুমের মধ্যে নয়,বাস্তবে। আমি বিশ্বাস করি প্রতিটি মানুষের মধ্যেই এমন কিছু গুণাবলী বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে যার দ্বারা সে ব্যক্তিগত,পারিবারিক,সামাজিক,রাষ্ট্রীয় এমনকি বিশ্বের সফল পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম।কিন্তু সেই গুণাবলী অনেকে নিজে নিজেই প্রকাশ করে,কেউ অন্যের সহযোগিতায় প্রকাশ করে এবং কেউবা করেই না। ভালোবাসি প্রতিনিয়ত নতুন কিছু জানতে ও শিখতে।বিশেষ করে প্রযুক্তি নির্ভর কিছু।কিন্তু মনে রাখার ক্ষমতা অনেক কম। ভালো লাগে সৃজনশীলতা।সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রায় অনেক শাখাতেই পা রাখার চেষ্টা করেছি,এখনো করছি। জীবনটাকে প্রতিদিন নতুনভাবে গড়ে তোলার অদম্য ইচ্ছা (সে অনুপাতে চেষ্টা কম)। সবাইকে সাহায্য করার মনোভাবটা প্রবলভাবে বিরাজমান। আবেগের ডিপো কিন্তু চোখের পানি কোন এক অজানা কারণে প্রায় শুকিয়েই গেছে বলা চলে। নিজের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানি না।কিভাবে জানবো তাও জানি না,আদৌ জানবো কিনা তাও জানি না।

follow me on:

Leave a Comment: