বাজেট যেভাবে মাইর খায়

বাজেট নিয়ে লিখবো বলে ভাববেন না যে আমি অর্থনীতি কপচাবো। এটা নিরেট একটা কল্পিত বাজেটের গল্প। কল্পিত হলেও বাস্তবের সাথে মিল থাকে অনেকটাই।মশিউর সাহেব ঢাকায় থাকেন। তার সাথে তার ছোট ভাইও থাকে।ছোট ভাইয়ের নাম নাদের। ঈদের মাত্র একদিন আগে মশিউর সাহেব ছুটি পাবেন তাই নাদেরের হাতে টাকা দিয়ে সে বলে দিল কি কি করতে হবে। নাদের সেই টাকা নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হল।মনে মনে ভাবল ভাইতো চার হাজার টাকা দিয়েছে। সব যদি দিয়েই দেই তাহলে আর আমার ভাগে কি থাকে। নাদের সেখান থেকে দুই হাজার টাকা সরিয়ে রাখল।সে জানে তার ভাই তাকে খুবই বিশ্বাস করে।তাই কোন দিন ভাবির কাছে প্রশ্নও করবেনা যে নাদের তোমাকে কত টাকা দিয়েছিল।

 

অজ পাড়া গায়ে তাদের বাড়ি। শহরে পৌছার পর মশিউর সাহেবের বড় ছেলের কাবুলের সাথে দেখা হলো নাদেরের। কাবুল খুশিতে আটখানা হয়ে বললো কাকা কেমন আছ? বাবা কবে আসবে? নাদের সব বললো এবং কাবুলের হাতে সেই দুই হাজার টাকা ধরিয়ে দিয়ে মশিউর সাহেব যা যা করতে বলেছেন তাই তাই করতে বলল। তার বাড়ি যেতে নাকি সন্ধ্যা হবে। এবার মশিউর সাহেবের বড় ছেলে কাবুল টাকা গুলো নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলো। যেতে যেতে ভাবলো টাকাটা যদি সব মায়ের হাতে তুলে দেই তবেতো আমার তেমন কিছু থাকবেই না। তাই সে সেখান থেকে এক হাজার টাকা সরিয়ে রাখলো।

 

কাবুল জানে তার বাবা মা সবাই তাকে অত্যন্ত বিশ্বাস করে। তাই কাকা তার হাতে কত টাকা দিয়েছিল তা নিয়ে কেউ প্রশ্নই করবেনা। এমনকি কাকাও মাকে বলবেনা যে কাবুলের হাতে এতোটাকা দিয়েছিলাম।সেই ভাবনা থেকেই কাবুল এক হাজার টাকা সরিয়ে নিল।পথেই বড় আপার সাথে দেখা। সে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাবে বলে বড় আপার হাতে বাকি সেই এক হাজার টাকা দিয়ে কাকা যা যা বলেছেন তা বুঝিয়ে দিল। বড় আপা কলেজে পড়ে।তারও বেশ হাতখরচ লাগে। সব সময়তো বাবা মা ঠিকঠাক দিতে পারেনা। সে ভাবলো এক হাজার টাকাই যদি মাকে দিয়ে দেই তাহলেতো আমার ভাগে কিছুই থাকলোনা। সে তাই বুদ্ধি করে সেখান থেকে পাচশো টাকা সরিয়ে রাখলো। বাকি থাকলো পাচশো টাকা।পাচশো টাকাই মায়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বাবা যা যা করতে বলেছেন তা তা করতে বলবে বলে মন স্থির করলো।

 

হঠাৎ ফুটবল খেলে বাড়ির দিকে যাচ্ছিল তুহিন। তুহিন হলো মশিউর সাহেবের ছোট ছেলে। ক্লাস নাইনে পড়ে সে।তুহিনের বড় আপা ওকে থামিয়ে বললো এই তুহিন শোন বাবা কিছু টাকা পাঠিয়েছে। এই নে এটা মাকে দিয়ে বলবি বাবা এটা এটা করতে বলেছে। বাবার আসতে দেরি হবে। ঈদের আগের দিন আসবে।তুহিন টাকাটা নিয়ে বাড়ির দিকে যেতে যেতে ভাবলো ঈদতো এসেই গেল। বাবা মা ঈদে পঞ্চাশ টাকার বেশি দিবেই না। তাছাড়া আর কত দিন অন্যের বল খেলা যায়।এই ভেবে সে বড় আপার ধরিয়ে দেওয়া পাচশোটাকা প্যান্টের পিছন পকেটে রেখে বাড়িতে গিয়ে গুটিগুটি পায়ে মায়ের সামনে দাড়াল। মুখটা হাসি হাসি করে বললো মা জানো বাবা খবর পাঠিয়েছে সে ঈদের আগেরদিন বাড়িতে আসবে।আর তোমাকে সব কিছু সামলে নিতে বলেছে। তোমার কাছে যে টাকা আছে সেখান থেকে সবার জন্য টুকটাক বাজার করতে বলেছে। এবার অফিসে নাকি কি ঝামেলা আছে।

 

মশিউর সাহেবের স্ত্রী তার ছোট ছেলের মুখে সব শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। মশিউর সাহেব ঈদে বাড়িতে এসে দেখলেন তিনি যেভাবে যা যা করতে বলেছেন তার স্ত্রী ঠিক সেভাবেই সব সামলে নিয়েছেন। তিনি মনে মনে ভীষণ খুশি হলেন। তার পাঠানো টাকাগুলো তাহলে সঠিক ভাবেই ব্যয় হয়েছে!!

 

অথচ তিনি সত্যিটা জানতেই পারলেন না।

 

উপরের গল্পটা কল্পিত হলেও বাস্তবে এমটিই হয়। প্রতিবছর যে বিপুল পরিমান বাজেট ঘোষণা করা হয় তা মাঠ পযার্য়ে এভাবেই পৌছে। যদি সত্যি সত্যি বাজেটের অন্তত অর্ধাংশও সত্যিকার কাজে ব্যয় করা যেত তবে এই ছোট্ট দেশে একটাও কাদা মাটির রাস্তা থাকতো না। আমাদের গ্রাম থেকে শুরু করে কাটার মাস্টার মুস্তাফিজের গ্রামের মত কোন গ্রামই বিদ্যুতের আলো থেকে বঞ্চিত হতো না।

About the Author জাজাফী

লেখক হয়ে জন্ম নেইনি, লেখক হতেও নয়। তবু আমি লেখক হলে, সেটাই হবে ভয়। জাজাফী এমন একজন যার অতীত এবং ভবিষ্যৎ জানা নেই, বর্তমানই সব।

follow me on:

Leave a Comment: