ফটোগ্রাফী আসক্তি

দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে আকাশের চাঁদ কারো চোখে সম্মোহন আনে আবার কারো চোখে সেটা হয়ে ওঠে ঝলসানো রুটি।অনেকটা সেই বিখ্যাত প্রবাদের মত “কেউ মদ বিক্রি করে দুধ কিনে খায় আর কেউ দুধ বিক্রি করে মদ কিনে খায়”।আগে যেখানে গ্রামতো দুরের কথা শহরেও খুব একটা ক্যামেরা দেখা যেতনা এখন সেখানে প্রায় জনে জনে কাধে ডিএসএলআর নিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।আর প্রত্যেকের হাতের মোবাইলেতো ক্যামেরা আছেই।চাই সেটা আইফোন হোক বা এক হাজার টাকা দামের কোন অখ্যাত ব্র্যান্ডের সেট হোক সবটাতেই ক্যামেরা অবধারিত। আর ক্যামেরার এই প্রতুলতার কারণে আমরা ক্ষণে ক্ষণে ফটোগ্রাফারের ভূমিকায় অবর্তীণ হচ্ছি।

কিন্তু কখনোই ভেবে দেখছিনা যে কাকের পিছনে ময়ুরের পুচ্ছ লাগলে যেমন কাক ময়ুর হয়ে যায়না তেমনি ডিএসএলআর বা এসএলআর বা অন্য যে কোন ক্যামেরা কাধে নিয়ে ক্লিকের পর ক্লিক করে ছবি তুললেই ফটোগ্রাফার হওয়া যায়না।

বিশেষত আজকের বাঙ্গালীর ফটোগ্রাফী প্রীতির কথা বলতে গেলে মনে পড়ে যাচ্ছে কেভিন কার্টারের কথা।

একটু পিছনে ফিরে গেলেই মনে পড়বে সেই মানুষটির কথা।১৯৯৩ সালে যিনি সুদানের দুর্ভিক্ষের ছবি তুলে পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছিলেন। কেভিন কার্টার সেদিন সুদানে একটি ছোট্টো বাচ্চার ছবি তুলেছিলেন। কংকাল প্রায় সেই বাচ্চাটি হামাগুড়ি দিয়ে এগুচ্ছিল খাবারের জন্য। নাহ যতদূর চোখ পড়ে খাবারের কোন চিহ্নই ছিলনা। সেই মৃতপ্রায় শিশুটির পাশেই একটি শকুন অপেক্ষা করছিলো বাচ্চাটি মারা যাবার জন্য। মৃত্যু কত কাছে ছিল। বলা হয়ে থাকে পুলিৎজার পুরস্কার প্রাপ্ত ফটোসাংবাদিক কেভিন কার্টার ওই বাচ্চাটি এবং তার মত আরো অনেক বাচ্চাকে খাবার পেতে সহায়তা না করার যন্ত্রনায় আত্মহত্যা করেছিলেন। যে মানুষটি ফটোগ্রাফীর জন্য সবথেকে দামি পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনিও আক্ষেপ নিয়ে চলে গেলেন।গুগল ঘাটলেই ভেসে ওঠে কেভিন কার্টারের মূখ।

অন্যদিকে ইউরোপে প্রবেশের পথে এইতো ক’দিন আগে কত কত মানুষ লাশ হয়ে ভেসে গেল সাগরের জলে।কোনদিন তাদের আর খোঁজ মিলবেনা।সেই সব অভুক্ত মানুষের ছবিও আমরা দেখেছি নানা মাধ্যমে।সাগর পাড়ে মুখ থুবড়ে পড়ে ছিল ছোট্ট আয়লান।সাগর পাড়ের আয়লানের ছবি তোলা সেই সাধারন ফটোগ্রাফারের কথাই ধরুন। যেই ছবিটি সারা দুনিয়া কাঁপিয়ে দিলো।

একজন ফটোগ্রাফার একটু যত্ন নিয়ে চেষ্টা করলেই দেশটাকে অন্যের কাছে খুব সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করতে পারে।আমাদের অগচরেই হয়তো লুকিয়ে আছে অনেক সৌন্দর্য।সবাইতো সেই সৌন্দর্য খুঁজে পায়না।আমরা যদি সেসব ক্যামেরার চোখ দিয়ে বন্দি করে অন্যদের সামনে তুলে ধরি তাহলে সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে আরো অনেকে।

চারদিকে কত কত অসংগতি।আমাদের কাঁধে ঝুলছে দামী লেন্সের ডিএসএলআর ক্যামেরা। চাইলে সেই ক্যামেরায় তুলে আনতে পারি সেই সব অসংগতি আর জানিয়ে দিতে পারি পুরো বিশ্বকে। কিন্তু আমাদের রুচিতে অরুচিকর সব বিষয় ঢুকে পড়েছে।আমরা তাই ঝুকে পড়েছি ফটোগ্রাফী নামে অফটোগ্রাফীতে। আমরা প্রতিনিয়ত ছবি তুলছি আর ফেসবুকে আপলোড দিচ্ছি।সেই সব ছবিতে আমাদের কারো মূখ বাকানো কারো জিহ্ববা দুই ইঞ্চি মুখের বাইরে ধরে রাখা।কারো চোখ বন্ধ, কারো বা নাক বাকানো।আমরা যেটাকে বলছি সেলফী। সেই সব সেলফী নামে অফটোগ্রাফীতে আমরা যেন আমাদেরকে উপস্থাপন করছি মানসিক প্রতিবন্ধীর মত করে আর ক্যাপশন দিচ্ছি উন্মাদের মত। অথচ একবার আয়নার সামনে দাড়িয়ে দেখুনতো আপনাকে আমাকে কতইনা সৌন্দর্য দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে।সেই সুন্দর মুখটাকে বাকিয়ে ছবি তুলে আমরা বরং সৃষ্টিকেই অপমান করছি।

আমাদের বিকৃত মস্তিষ্কও যে দিন দিন আরো বেশি বিকৃত হয়ে যাচ্ছে এগুলোই তার প্রমান। আধুনিকতার নামে, সেলফীর নামে আজ যা চলছে তা সত্যিই অরুচিকর।বাবার লাশ কাঁধে নিয়েও কেউ কেউ যে সেলফী তুলে আপলোড দিচ্ছেনা তাইবা বলি কি করে।সব ছবিতো আমাদের কোন একজনের পক্ষে দেখাও সম্ভব নয়।আমাদের রুচিবোধের যে সামান্য অংশটুকু বাকি আছে তা রক্ষা করতে হয়তো ফেসবুকের যে সে গ্রুপে যুক্ত হতে পারিনা তাই সব ছবিও দেখা হয়না।কিন্তু হরহামেশাই ওসব ভেসে আসে কারো না কারো মাধ্যমে।সদ্য খোড়া কবরের পাশে দাড়িয়ে সেলফী তুলতে তাই অনেকেই দ্বিধা করেনা।

মৃত দাদুর শিয়রের পাশে দাড়িয়ে আমাদেরই কেউ কেউ সেলফী তুলে ক্যাপশন দেই ‘গুডবাই দাদু’। সেই সব সেলফী নাম ধারী ছবিগুলো দেখলে মনে হয় পুরো দেশ ও সমাজ প্রতিবন্ধীতে ভরে গেছে।গুগলের কল্যাণে দেখা যাচ্ছে কয়েক লাখ টাকা খরচ করে হজ্ব পালন করতে গিয়ে কাবা ঘরের মধ্যেও সেলফী তুলে আপলোড দিচ্ছে আর ক্যাপশন দিচ্ছে ‘ইটস অ্যামাজিন,আই ক্যান নট বিলিভ’।দেখে মনে হয় হজ্বব্রত পালন মূখ্য উদ্দেশ্য নয়,উদ্দেশ্য হলো সেলফী তুলে সেটা চারদিকে ছড়িয়ে দিয়ে সবাইকে জানান দেওয়া যে আমি হজ্ব করতে গিয়েছিলাম।মক্কা শরীফের মধ্যে ইমানদারেরা যায় খোদাভীতি অর্জন করতে আর আমরা কেউ কেউ যাই ধর্মপালনের অছিলায় ছবি তুলতে। সেই তালিকায় বাদ পড়েনা আমাদের এদেশীয় কতিপয় খ্যাতিমান নায়ক,গায়কেরাও।

ক্যামেরা নয় বরং ক্যামেরার ধারক ও বাহকই মূলত ছবির কারিগর হিসেবে কাজ করেন।ক্যামেরার আর কী সাধ্য অমন ছবি তোলার।তাইতো আমরা দেখতে পাই শাকুর মজিদের ক্যামেরার চোখে ধরা পড়ে মিশরের সৌন্দর্য,নেবেলের শহর আর লেসওয়ালেসার দেশের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অপার সৌন্দর্য।মঈনুস সুলতানের ক্যামেরায় ধরা পড়ে ইউরোপ,আফ্রিকা সহ আরো অনেক অনেক দেশ ও জাতির সচিত্র ইতিহাস।সেই সব ছবি একটার পর একটা সাজিয়ে লেখা হয় অসাধারণ সব ভ্রমন কাহিনী।কিংবা প্রখ্যাত ফটোগ্রাফার নাসির আলী মামুনের কথাই ধরা যাক যার ক্যামেরা খুঁজে নিয়েছে দেশী বিদেশী বিখ্যাত সব মানুষের মুখ। যার ক্যামেরার বদৌলতে আমরা প্রিয় সব মানুষদের অসাধারণ সব মুহুর্তকে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছি।

সেলফী আক্রান্তের হার দিন দিন বেড়েই চলেছে।এইতো কদিন আগেও এই শব্দটা ছিল অপরিচিত আর হুট করে সেটাই হয়ে উঠলো বর্তমান বিশ্বের বিশেষত বাংলাদেশের সব থেকে আলোচিত একটি শব্দ।তারই ধারাবাহিকতায় সেটি ঢুকে পড়লো বাংলা একাডেমি প্রকাশিত নতুন বাংলা অভিধানে।

ফটোগ্রাফী কোন দোষের কিছু নয়।কিন্তু অফটোগ্রাফী অবশ্যই দোষনীয়।ঐতিহ্যবাহী কোন স্থানে ঘুরতে গিয়ে সেই স্থানের সৌন্দর্য উপভোগের পরিবর্তে যখন সেলফী তোলাই মূখ্য হয়ে ওঠে,ধর্মীয় আচার পালনে মক্কাশরীফে গিয়ে যখন ধর্মকে টপকে ছবি তুলে ফেসবুকে দেওয়াই মুখ্য হয়ে ওঠে তখন সেই ফটোগ্রাফীকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করাইকি স্বাভাবিক নয়।

যারা সেলফী প্রচলন করেছিল তারা কিন্তু আসক্ত হয়ে পড়েনি কিন্তু আমরা আসক্ত হয়ে পড়েছি।মার্ক জুকারবার্গ ফেসবুক বানিয়ে ছেড়ে দিলেও তিনি খুব বেশি ফেসবুকে থাকেন না অথচ আমরা দিনরাত পড়ে থাকি।সর্বপরি ফটোগ্রাফীর নামে যে অফটোগ্রাফীর যুগ শুরু হয়েছে তা এখনি বন্ধ হওয়া উচিত।সেফলীর নামে যে প্রতিবন্ধীটাইপ ছবি তুলে উন্মাদটাইপ ক্যাপশন দেওয়ার রীতিতে আমরা আসক্ত হয়ে উঠেছি তা আমাদের ভবিষ্যতকে বিপথেই ঠেলে দেবে।

হাতের ছুরিটা দিয়ে যেমন আপেল কাটা যায় তেমনি অন্যের গলায় বসিয়ে দেওয়া যায়।আমাদের উচিত অন্যের গলায় ছুরি না বসিয়ে সেটা দিয়ে আপেল কাটা।আমাদের উচিত হাতে ক্যামেরা পেয়ে অফটোগ্রাফীতে না মেতে সত্যিকার ফটো তুলি,যে ছবি হৃদয়ের কথা বলে,যে ছবি ব্যথীত মানুষের পাশে দাড়ানোর গল্প শোনায়।যেটা দেখলে প্রশান্তি আসে,মনে হয় নাহ ফটোগ্রাফীটাও একটা আর্ট একটা শিল্প।

About the Author জাজাফী

লেখক হয়ে জন্ম নেইনি, লেখক হতেও নয়। তবু আমি লেখক হলে, সেটাই হবে ভয়। জাজাফী এমন একজন যার অতীত এবং ভবিষ্যৎ জানা নেই, বর্তমানই সব।

follow me on:

Leave a Comment: