অতিথি

যার আসার কোন নির্ধারিত সময় নেই তিনিই অতিথি।তাদের আসার সময় অসময় না থাকলেও আমরা কিন্তু ঠিকই তাদের আপায়্যনে কোন রুপ কমতি রাখিনা। তাইতো আমাদেরকে অতিথি পরায়ণ জাতি বলা হয়।এমনও দেখা যায় ঘরে চাল নেই,বসতে দেওয়ার যায়গা নেই তারপরও আমরা চাই অতিথি আসুক এবং অতিথি আসলে আমাদের সাধ্যেরও বেশি তাদের আপ্যায়ন করতে চেষ্টা করি। মাসের একটা দিন হয়তো পরিবারের চার সদস্যের জন্য চারটুকরা মাছ কিনে আনা হয়ছে। তিনজন খেতে বসেছে শুধু বাকি আছেন পরিবারের গৃহকর্তী। সেই সময়ে অতিথি আসলে তাকে সমাদর করে বসতে দেওয়া হয় এবং গৃহকর্তীর জন্য বরাদ্দ শেষ মাছের টুকরাটিও অতিথির পাতে তুলে দেয় বাঙ্গালী।ওই মাসে সেই গৃহকর্তীর ভাগ্যে আর কোন মাছের টুকরা জোটেনা, তার পরও তিনি খুশি।

 

এই অতিথি পরায়নতার ভীড়েও কিন্তু কিছু কিছু অতিথি আছে যাদের আগমনকে আমরা মোটেও পছন্দ করিনা। এমনকি যথেষ্ট সামর্থ থাকলেও সেই সব অনাহুত অতিথিকে আপ্যায়ন করতে গেলে আমাদের বিবেকে বাঁধে,মেজাজ খারাপ হয়। কিন্তু ওই যে বাঙ্গালী অতিথি পরায়ণ খেতাবের কারণে সেটা বাইরে প্রকাশ করতে পারেনা।ওই সব অনাহুত অতিথি বছরে দু বছরে এক দুবার আসে। কিন্তু ওই এক দুবারেই মনের মধ্যে জ্বলুনি দিয়ে যায়। গরীব চাষি আতর আলী। সারা বছর দিনে আনি দিনে খাই এভাবে খুব সুখেই চলে যায় তার। আত্মীয় পরিজন আসলে নুন ভাত যা জোটে খাওয়াতে কুন্ঠা বোধ করেনা।

 

কিন্তু তিনি মাঝে মাঝেই বছরে দু বছরে একবার ওরকম অতিথির কবলে পড়েন। যে অতিথি তার ছনের একচালা ঘরের বারান্দায় এসে উঠে  লম্বা সালাম দিয়ে বলে চাচা ভাল আছেন। এই ভাল আছেন কথাটা শুনেও তার মনের মধ্যে খ্যাচ খ্যাচ করে।আতর আলীর বয়সতো আর কম নয়। এই অনাহুত উটকো অতিথিকে এক জীবনে অন্তত বিশ বছর ধরে আপ্যায়ন করে চলেছেন। তিনি স্থানীয় সাংসদ। ভোটের আগে আসেন আহ্লাদে গদগদ হয়ে চাচার বাড়িতে বসে চাচার মেয়ে জামাইয়ের জন্য তৈরি করা শেষ দুটো নাড়ু চিড়ে খেয়ে বিদায় হন।তিনিতো একা আসেন না, আসেন আরো কিছু সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে।একটা হিসাব করে আতর আলী দেখলেন এই উটকো অতিথিকে আপ্যায়নে প্রতি বার যদি তার পঞ্চাশ টাকাও খরচ হয় তো বিগত বিশ বছরে তার হাজার খানেক টাকা খরচ হয়েছে। বিনীময়ে তিনি কি পেয়েছেন?স্বাধীনতার পর থেকে তিনি দেখে এসেছেন এই সব অতিথিদের।

 

তারা আসে বড় বড় কথা বলে আর গরীবের কষ্টের টাকায় বানানো নাড়ু চিড়ে পেট পুরে খেয়ে চলে যায়।সেই কাচা রাস্তা এখনো কাচাই আছে,প্রতি বছর নাকি কয়েকশো মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নতুন করে উৎপাদন হচ্ছে কিন্তু আতর আলীদের গ্রামে বিদ্যুৎ নেই। ডিজিটাল বাংলাদেশ বলে আতর আলী একটা শব্দ শুনেছে কিন্তু তার কোন ভাবেই বিশ্বাস হয়না।তার মতে ডুমুরের ফুল যেমন কেউ দেখেনি এই তথা কথিত কয়েকশো মেগাওয়াট বিদ্যুৎও আসলে কিছু না। যদি তাই হতো তবে স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ততো কম বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়নি তাহলে সে গুলো গেল কোথায়। আতর আলীদের গ্রাম কিংবা তার পাশের গ্রামেও বিদ্যুৎ নেই কেন?

 

যে অনাহুত অতিথি মেয়ে জামাইয়ের জন্য বানিয়ে রাখা নাড়ু চিড়ে বার বার এসে খেয়ে গেছেন তিনিতো এখন শুধুই সংসদ সদস্য নন।তিনিতো আরো উপরে উঠেছেন। বাংলাদেশ ক্রিকট দল যখন স্টেডিয়ামে অন্য দলকে নাস্তানাবুদে ব্যস্ত তিনি তখন ভিআইপি লাউঞ্জে মূখে একরাশ হাসি নিয়ে বসে থাকেন। ক্যামেরায় বার বার সেটা ধরা পড়ে। টিভিতে আতর আলীরা সেটা দেখে আর হতাশ হয়।তারা কি তবে কেবল মাত্র ওই অনাহুত অতিথির নিজের মূখের হাসি ফোটানোর জন্য তাকে নির্বাচিত করেছিল?আতর আলীরা তা বুঝে উঠতে পারেনা।

 

এক রাজা একবার বিলেত ভ্রমনে গিয়ে সেখানকার শহরের আলোক সজ্জা দেখে অভিভুত হয়ে দেশে এসে মন্ত্রিকে নির্দেশ দিলেন তিনি বিলেতের মত তার রাজ্যটাকেও আলোকিত করবেন।এ জন্য তিনি দুই কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেন। মন্ত্রী তার অধঃস্থন কর্মকতার্কে রাজার নির্দেশের কথা জানালেন এবং বললেন রাজা এক কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন।নির্দেশটা মাত্র একজন থেকে আরেকজনের কাছে পৌছাতেই বরাদ্দের পরিমান অর্ধেকে নেমে আসলো।সেই অধঃস্থন আবার তার নিচের কর্মকতার্কে বললেন পঞ্চাশ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছে।এভাবে একে একে যখন ঘোষণাটি ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছে পৌছলো তখন টাকার পরিমান দাড়ালো দশ হাজারে। যেটা দিয়ে কোনভাবেই শহর আলোকিত করা সম্ভব নয়।

 

তাছাড়া কাউন্সিলরেরওতো একটা ভাগ থাকা উচিত। তাই ওয়ার্ড কাউন্সিলর বাড়ি বাড়ি গিয়ে রাজার নির্দেশ শোনালেন যে রাজা চান প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনা আলোকিত হোক। সবাই কালকের মধ্যে নিজ নিজ আঙ্গিনায় আলোকসজ্জা করবেন।নির্দেশ মত সত্যি সত্যিই পুরো রাজ্য আলোকিত হলো। রাজা খুশি হলেন তার মন্ত্রী কর্মচারিদের কাজে।কিন্তু তিনি কোনদিন জানতেও পারলেন না তার বরাদ্দকৃত দুই কোটি টাকা কিভাবে খরচ হলো।আতর আলীরা অনাহুত অতিথি আপ্যায়নে যথেষ্ট খরচ করেছেন,বিনিময়ে পাননি কিছুই। আজীবন অন্ধকারে থেকেছেন আর হেটেছেন কর্দমাক্ত পথে।অনাহুত অতিথি সেই সব আতর আলীদের পিঠে পা রেখে মন্ত্রীত্ব বরণ করছেন।

 

তাই বলে আতর আলীরা এখন আর অন্ধকারে নেই।রাজার আদেশ যেভাবে পালিত হয়েছিল ঠিক সেভাবে না হলেও আতর আলীরা সৌরবিদ্যুৎ লাগিয়ে নিয়েছেন।সামনেতো দিন আসছে। অনাহুত অতিথি আবার আসবে, তাকেতো আর অন্ধকারে আপ্যায়ন করা যাবেনা। আর তা ছাড়া অতিথি নির্লজ্জ হতে পারেন কিন্তু গ্রামের সহজ সরল আতর আলীরাতো নির্লজ্জ নয়।

About the Author জাজাফী

লেখক হয়ে জন্ম নেইনি, লেখক হতেও নয়। তবু আমি লেখক হলে, সেটাই হবে ভয়। জাজাফী এমন একজন যার অতীত এবং ভবিষ্যৎ জানা নেই, বর্তমানই সব।

follow me on:

Leave a Comment: