নত হও, কাঁদো তুমি, আজ শোক, আজ বর্ষা মাস

 

বাঙ্গালীদের সাথে বিশ্বাস ঘতকতার ইতিহাস বেশ পুরোনো।১৭৫৭ সালে পলাশীতে বাংলার স্বাধীনতার সুয ডুবেছিল মীর জাফরদের বিশ্বাস ঘাতকতার কারণে।১৯৭১ সালে একদল বাঙ্গালী নামধারীদের বিশ্বাসঘাতকতায় আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছিল। আমরা হারিয়েছিলাম ত্রিশ লক্ষ স্বজন দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রম। যখন স্বাধীনতার সুবাতাস বইবে বইবে করছে তখনই বাংলার ইতিহাসের নিকৃষ্ঠতম বিশ্বাসঘাতকতার জন্ম হল। রচিত হল রক্তাক্ত করুন ইতিহাস। বাঙ্গালীর সবকালের সবর্শ্রেষ্ঠতম মানুষটিকে এ দেশেরই কিছু কুলাঙ্গার স্বপরিবারে নৃসংশভাবে হত্যা করলো। তিনি যাদের স্নেহ দিয়ে আগলে রেখেছিলেন তাদেরই অনেকে জড়িয়ে ছিল সেই নারকীয় তান্ডবের সাথে। বঙ্গবন্ধুকে যখন বলা হল আপনার আরো সাবধান হওয়া উচিৎ আপনার প্রাণ সংহারকের অভাব নেই বঙ্গবন্ধুতো নামে বঙ্গ বন্ধু ছিলেন না তিনি বরং বাংলাকে এবং বাঙ্গালীকে ভালবাসতেন বলেই তিনি বঙ্গবন্ধু। তিনি বলেছিলেন পাকিস্তান আর্মি যেখানে আমাকে হত্যা করার সাহস করেনি সেখানে আমার বাঙ্গালী কেন আমাকে হত্যা করবে? বিশ্বাসঘাতক কিছু বাঙ্গালী সেদিন বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাসকে ধুলোয় লুটিয়ে দিয়ে তাকে স্বপরিবারে হত্যা করেছিল।

যে মানুষটির তর্জনীর ইশারায় মজুর, মুটে,কুলি,ধনী,দরিদ্র এক নিমিষে জীবন উৎসর্গ করার মিছিলে নেমে নয় মাস যুদ্ধ করে আমাদের জন্য একটি লাল সবুজের পতাকা উপহার দিয়েছিল সেই মানুষটিকে কুলাঙ্গারেরা হত্যা করলো। ইতিহাস সাক্ষী দেয় বীর কখনো কোন কিছুতে ভয় পায়না। সশস্ত্র হন্তারকেরা যখন বঙ্গবন্ধুর সামনে দাড়ানো তখনো তিনি বলিষ্ঠ কন্ঠে তাদের সাথে কথা বলেছেন। তার কন্ঠ সশস্ত্র হন্তারকদেরও কাঁপিয়ে দিয়েছিল। আজ সেই গানটির কথা মনে পড়ছে-

“যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই,

তবে বিশ্ব পেতো এক মহান নেতা,আমরা পেতাম ফিরে জাতির পিতা”।

আমরা মহান নেতাকে হারিয়েছি।শত্রুরা ভয় পেতো বঙ্গবন্ধু ও তার আদর্শকে। তারা ভেবেছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেই বঙ্গবন্ধু ও তার আদর্শ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুতো সারা পৃথিবীতে একজন, একবারই জন্ম নেয়, যে কখনো হারিয়ে যায় না। কবি বলেছেন “যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা গৌরি যমুনা বহমান ততোদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান” প্রতি বছর ১৫ আগষ্ট যখন আমরা শোক দিবস পালন করি তখন মনে হয় বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আমাদের দেশটা কত আগেই আরো সমৃদ্ধ হতে পারতো। তবে সত্যি কথা বলতে রাস্তায় চলতে গিয়ে ভীষন লজ্জা লাগে যখন দেখি সম্মানের নামে বঙ্গবন্ধুকে নানা ভাবে অসম্মান করা হচ্ছে। পোষ্টারে পোষ্টারে ছেয়ে যাচ্ছে সারা শহর সারাদেশ।

যাদের নেতা হওয়ার যোগ্যতাই নেই তারাও অযাচিত ভাবে পোষ্টারে অবলিলাক্রমে বঙ্গবন্ধুর ছবি ব্যবহার করছে এবং এক সময় দেখা যাচ্ছে ঝড়ো বাতাসে রশিতে ঝুলানো বঙ্গবন্ধুর ছবি যুক্ত পোষ্টার রাস্তার ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে আর জেনে না জেনে মানুষ বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত সেই পোষ্টার পায়ে মাড়িয়ে যাচ্ছে। এতে কি বঙ্গবন্ধুকে অপমান করা হচ্ছেনা? এ দেশে একজন বাঙ্গালীকে মনে রাখতে হলে তিনি অতি অবশ্যই বঙ্গবন্ধু। তার ছবি যখন যে যেভাবে পারছে ব্যবহার করছে। ফেসবুকে লাইকের জন্য থাম্বসআপে বঙ্গবন্ধুর ছবি লাগানো হচ্ছে এবং দেখা গেছে পাবলিক টয়লেট উদ্বোধনের যে ব্যানার তৈরি করা হচ্ছে তাতেও বঙ্গবন্ধুর ছবি হরদম ব্যবহার করছে। এটা বঙ্গবন্ধুকে অপমানেরই শামিল বলে আমি মনে করি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য বর্ষিয়ান নেতারা কি কখনো এটা ভেবে দেখেছেন? বঙ্গবন্ধু সহ সব বরণীয় ব্যক্তিদের ছবি ব্যবহারে নীতিমালা প্রনয়ন করা উচিত। টাকার উপরে ছবি দেওয়াও বন্ধ হওয়া উচিত বলেই আমি মনে করি।

যে বঙ্গবন্ধুর ছবি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর কাযার্লয় থেকে শুরু করে ব্যক্তি মানুষের ঘরের দেয়ালে শোভা পাচ্ছে এবং শ্রদ্ধার সাথে প্রতিনিয়ত যত্নে রাখা হচ্ছে সেই মানুষটির ছবিই নানা ভাবে ব্যবহার করে তাকে অসম্মান ও করা হচ্ছে। মাংস কাটার পর রক্তমাখা হাতে বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত টাকা হাতে নিচ্ছি এবং ছবিতে রক্তের দাগ লাগছে। মাছ কাটার পর সেই হাতে বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত টাকা হাতে নিচ্ছি কোমরে গুজে রাখছি কখনো কখনো এবং সব চেয়ে লজ্জার ও অপমানের কথা যারা নিষিদ্ধ পল্লীতে যাচ্ছে তারাও সাথে করে নিয়ে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুর ছবি যুক্ত টাকা। চোরা কারবারী থেকে শুরু করে জঙ্গীগোষ্ঠিরাও প্রকারান্তে বঙ্গবন্ধুর ছবি যুক্ত টাকা ব্যবহার করছে। এভাবেই আমরা সবর্কালের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালীকে সম্মানের নামে নানা ভাবে অপমান করে চলেছি তা সম্ভবত আমার মত অতি নগন্য একজন মানুষ অনুভব করলেও যাদের অনুভব করার কথা ছিল তারা অনুভব করেনা।তারা মনে করে বঙ্গবন্ধুর ছবি এবং নাম ব্যবহার করলেই বঙ্গবন্ধুকে সম্মান দেখানো হয়।

জাতীয় পতাকা ব্যবহারের যেমন ক্ষেত্র আছে নীতিমালা আছে এবং চাইলেই কেউ তার গাড়িতে বা ব্যক্তিগত ভাবে জাতীয় পতাকা ব্যবহার করতে পারেনা ঠিক একই ভাবে বঙ্গবন্ধু এবং অন্যান্য বরনীয় ব্যক্তির ছবি ও নাম ব্যবহারে নীতিমালা হওয়া চাই। তাদেরকে যদি শ্রদ্ধা করি,ভালবাসি, তবে কোন ভাবেই আমরা চাইতে পারিনা টাকা বা অন্য কোন মাধ্যম হয়ে বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য বরণীয় ব্যক্তির ছবি বাথরুম থেকে শুরু করে নিষিদ্ধ পল্লী কিংবা চোরাচালানীদের হাতে যাক। আমরা চাইনা অস্ত্র মাদকদ্রব্য সহ কোন অবৈধ কাজের সাথে বঙ্গবন্ধুর নাম কিংবা ছবি জড়িয়ে পড়ুক। শোক দিবস পালনের নামে আমরা যে সব ব্যানার তৈরি করি সেসবে বঙ্গবন্ধুর ছবির উপর রক্তের ছাপ দিয়ে দেওয়ার যে রীতি আমরা দেখতে পাই তার অবসান হওয়া উচিত। যাকে বুকে ধরেছি তাকে কেন আমরা পিট দেখাবো। রাষ্ট্রের যে সে স্থাপনা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহারে সতর্ক থাকা উচিত। বঙ্গবন্ধুর মুল্যকি এতোটাই কম যে একটা কালভার্ট কিংবা আরো ছোট কিছু প্রতিস্থাপন করলেই সেটার নামকরণ করতে হবে মহান এই নেতার নামে। ছাইদানিতে যেমন কোহিনুর হিরে মানায় না তেমনি বঙ্গবন্ধুর নাম ও ছবি যে সে পাত্রে মানায় না। তার অবস্থান হওয়া উচিত সব কিছুর উপরে।

আমরা মোটাবুদ্ধি নিয়ে চলি বলেই যত্রতত্র বঙ্গবন্ধুকে টেনে আনি এবং অন্যপক্ষকে খোঁচা মেরে কথা বলার সুযোগ তৈরি করে দেই। আপনাকে যদি আপনার সন্তানই সম্মান না করে তবে অন্যের সন্তান কেন আপনাকে সম্মান করবে? বঙ্গবন্ধুকে যদি সত্যিকার অর্থে ভালবাসেন তবে তাকে বুকে রাখুন অন্তরের মনিকোঠায় ঠাই দিন যত্রতত্র তাকে এবং তার নাম ব্যবহার করে কলুষিত করবেন না।কিন্তু আমরা এও জানি চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী। টিক সেই ভাবেই যারা পায়ের তলায় ঠাই পাওয়ার যোগ্য নয় তারা বুকে ঠাই পাওয়ার আশায় বঙ্গবন্ধুকে ব্যবহার করে পার পেয়ে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর মহাপ্রয়ানের এই দিনে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলী প্রকাশ করছি। আর আক্ষেপ নিয়ে কবি মহাদেব সাহার কবিতার উদ্ধৃতি দিতে হচ্ছে-

“নত হও,কাঁদো তুমি,আজ শোক,আজ বর্ষা মাস

কি করে ভুলবে বলো, কলঙ্কের সেই ইতিহাস।

বাংলার নদনদী ভরে ওঠো, রাখো ভরে দু’চোখের জল

ধোয়াও চোখের জলে রক্তমাখা তার পদতল।

About the Author জাজাফী

লেখক হয়ে জন্ম নেইনি, লেখক হতেও নয়। তবু আমি লেখক হলে, সেটাই হবে ভয়। জাজাফী এমন একজন যার অতীত এবং ভবিষ্যৎ জানা নেই, বর্তমানই সব।

follow me on:

Leave a Comment: