স্কুলে প্রথম দিন

 

আজ শনিবার।

 

তমার জীবনের প্রথম স্কুল আজ। মাত্র পাঁচ বছরের ফুটফুটে মেয়েটি আজ স্কুলে যাবে, খাঁচায় বন্দি পাখিদের মতন থাকবে। শুক্রবার সপরিবারে ঢাকায় এসেছেন আলিম সরকার। ঢাকার পরিবেশে মানিয়ে নিতে বেশি সময় লাগবে না তার। কিন্তু তার স্ত্রী-কন্যারা মানিয়ে নিতে পারবে কি না, এ নিয়ে সংশয় যেন তারা করে তাকে।

 

নতুন বাসায় এসেই তমা ঘুমিয়ে গেছে। খাওয়াদাওয়া সেরে আলিম সরকার ও তার স্ত্রীও ঘুমিয়েছেন বেশ সকাল-সকাল, যাকে গ্রাম্য ভাষায় বলে পাছারাত মানে সন্ধ্যারাত। সকাল দশটায় স্কুল, কিন্তু তমা আজ বেশ সকালে উঠেছে। ভোরে উঠে সে তার আম্মুকে বলল, ‘আম্মু সময় হয়ে গেছে। চলো স্কুলে যাব।’ তার আম্মু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল, ‘মামণি এখন ৬টা বাজে। তোমার স্কুল শুরু হতে এখনো চার ঘণ্টা দেরি। আলিম সরকার ঘুম থেকে উঠেই কাজে দৌড়িয়েছেন, আজ তার অনেক কাজ।

 

নতুন অফিসে জয়েন, স্যারদের সঙ্গে কথাবলাসহ অনেক কাজেই ব্যস্ত থাকবেন তিনি। তাই আলিম সরকার তার স্ত্রী পুর্ণতা সরকারকে বলে গেলেন, ‘তমাকে ঠিকঠাক স্কুলে নিয়ে যেতে।’ অবশ্য আলিম সরকার ভালো করে বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন তার স্ত্রী পুর্ণতা সরকারকে, কিভাবে কোন দিক দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু তার জঘন্য একটা ভুল হয়েছিল, যা তিনি বলতে ভুলেই গেছিলেন। সেটা হলো ঢাকা শহরের মূল সমস্যা তথা যানজট সমস্যা। স্কুল বেশি দূরে নয়, মাত্র দেড় কি দুই কিলোমিটার।

 

পুর্ণতা সরকার ভাবলেন ঢাকা শহরে তো বাসে যাতায়াত করতে হয়, তাই একটু দেরি করে গেলেও কোনো সমস্যা নেই। যেই ভাবা সেই কাজ। যখন ঘড়ির কাঁটা ন’টা ছুঁয়েছে তখন পুর্ণতা সরকার তার মেয়ে তমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। কিন্তু বাস টার্মিনালে গিয়ে তাকে দুর্গতিতে পড়তে হয়। কেননা যেসব বাস আসছে, সবই মানুষে পরিপূর্ণ! তবুও মানুষ জোর করেই সেখানে উঠছে। এভাবে কিছুক্ষণ থেকে তিনি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বুঝলেন ঢের দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু উপায়ও তো নেই! তাই তিনি একটা সি.এন.জি যান নিলেন। কিন্তু এটাও কিছুদূর যেয়েই থেমে গেল। পুর্ণতা সরকার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেন, মাত্র ১৫ মিনিট বাকি। কিন্তু পাশ কাটিয়ে যাবারো উপায় নেই। কেননা শতশত যানবাহন সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যাকে টিভিতে যানজট বলে আখ্যায়িত করতে শুনেছেন। এভাবে কিছুদূর যেতে না যেতেই নতুন করে যানজট সৃষ্টি হয়। এভাবে অনেক কষ্ট শয়ে অবশেষে কাঙ্ক্ষিত জায়গায় এসে যায় তারা। কিন্তু ভাড়া নিয়ে আবার বাধে বিতর্ক, সি.এন.জির মিটারে উঠেছে ২১০ টাকা কিন্তু সি.এন.জি চালক চাচ্ছেন ৩০০ টাকা। এ নিয়ে কিছুক্ষণ তর্কাতর্কি শেষে পুর্ণতা সরকার বাধ্য হয়েই দিয়ে দেন চালকের চাওয়া টাকাটি। তিনি ভাবেন, এই শহরে কি সাধারণ মানুষ থাকে? নাকি শুধু মানুষ শোষিত হয় এখানে? ওদিকে তমা কাঁদোকাঁদো ভাব। কেননা নতুন স্কুল, তবুও দেরি। যা মানতে পারছে না সে।

 

যখনি যানজট হচ্ছিল, তখনো সে কান্না শুরু করছিল। এভাবে কান্না করতে করতেই সে পৌঁছে যায় স্কুলে। অবশেষে স্কুলের গেটে পা দেবে। এমন সময় পিছন থেকে কেউ ব্যাগে টান দিয়ে বলল, ‘তোকে অনেক কষ্ট করে নিয়ে এলাম স্কুলে। ভালো করে পড়িস। আর আমি এখানেই আছি। ভেঙে পড়িস না কেমন?’ তমা শুধু মাথা নেড়ে ভিতরে চলে যায়।

About the Author ফাতিন ইসরাক আবির

follow me on:

Leave a Comment: