হাসনাহেনার সুবাস

স্তব্ধ হয়ে বাড়ির বারান্দায় বসে আছেন বৃদ্ধ দবির মিয়া। লজ্জায় তিনি মাটি থেকে চোখ সরাতে পারছেন না। নিচের দিকে তাকিয়ে থাকার অবশ্য আরও একটা কারণ রয়েছে। তার চোখের অশ্রুগুলো যেন স্ত্রীরচোখে ধরা পড়ে না যায় সে ভয়ে। কিন্তু দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর সংসার করার পর এ প্রয়াস যেন ব্যর্থ। দরজার পাশ ঘেষে দাঁড়িয়ে দবির মিয়ার স্ত্রী খোদেজা খাতুন সব লক্ষ্য করছেন। আর গর্বে তার বুক ভরেউঠছে। গর্ব হবে নাইবা কেন! মেয়ে যে তার মান রেখেছে। অসহায় মায়ের ওপর হওয়া সমস্ত অবিচারের যোগ্য উত্তর দিয়ে চলেছে তার মেয়ে।

খোদেজা খাতুন যখন অন্তঃসত্তা, তখন বাড়ির সকলে আশা করেছিল সংসারের কান্ডারি স্বরূপ তিনি একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিবেন। যে দরিদ্র পিতার ঢাল হয়ে উঠবে। কিন্তু সংসারের কান্ডারির পরিবর্তে তিনিবয়ে নিয়ে এলেন নতুন এক বাড়তি বোঝা। জন্ম দিলেন একটি মেয়ে শিশুর। বাবা দবির মিয়া রেগে মেয়ের মুখ পর্যন্ত দেখেননি। বাধ্য হয়ে মা নিজেই তার মেয়ের নাম ঠিক করলেন হাসনাহেনা। কিন্তু নামেরআকিকা হলো না। মেয়ে সন্তান জন্ম দেয়ার অপরাধে অভিযুক্ত মাকে যে অপমান অপদস্থ হতে হয়েছে সেসবের যোগ্য জবাব দিবে একদিন তার মেয়ে। এ মেয়ে হবে হাসনাহেনা ফুলের মতোই সৌন্দর্যেরপ্রতীক। হাসনাহেনা ফুলের মতোই প্রাণবন্ত। যার সুবাসে সুবাসিত হবে এই পরিবার সহ সমস্ত গ্রাম আর গ্রামবাসী যারা এহ দবিরের পোড়া কপাল, মেয়ে হইছে রে! বলে টিটকারি দিয়েছে।

কিছুক্ষণ আগেই হেনা ফোন করেছিল তার বাবার কাছে। মেয়ে কি বললো জানতে চাইলে দবির মিয়া উল্লাস কন্ঠে জবাব দিলেন- জান হেনার মা, আমাগো মেয়ে ঢাকার যে হাসপাতালে ডাক্তারি করে, সেইখানথাইকা সরকার তারে আরও বড় ডাক্তার হওয়ার জন্যে লন্ডন পাঠাবো। পড়ালেখা সহ তার হাত খরচের জন্যও নাকি সে অনেক ট্যাকা পয়সা পাবো। এবার হেনার মা শান্ত কন্ঠে জবাব দেন- হেনা আমাগোদুইজনারই মেয়ে নাকি? আমি তো জানতাম….. শেষ না করেই তিনি থেমে যান। তিনি যা বোঝাতে চেয়েছেন তা যে তার বৃদ্ধ স্বামীর বুকে গিয়ে আঘাত করেছে। স্বামীর জবাবের অপেক্ষা না করে তিনি তারসিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়ে বললেন এরপর মেয়ে যখন তাকে ফোন করবে তখন তিনি যেন মেয়েকে বলেন- বিদেশে যাওয়ার পর সে যে বাড়তি ট্যাকা পাবো তা যেন বাড়িতে না পাঠায়ে ব্যাংকে জমায়। এখন যাপাঠায় মাস শেষে তাই ফুরায় না। তার থাইকা ওই জমানো ট্যাকা দিয়া মেয়ে বিদেশ থেকে ফিরার পর গ্রামে একটা হাসপাতাল বানাইতে কমু। হাসপাতালে আমার হেনা মা বিনা পয়সায় সবাইরে চিকিৎসাকরবো। তার সু- চিকিৎসায় গ্রামবাসী তখন সুস্থ- সুন্দর চিন্তা ভাবনা করতে পারবো।

দবির মিয়া এবারে আর কিছু বলেন না। কিইবা বলবেন! তার স্ত্রী ভুল তো কিছু বলেননি। সত্যিই তো যে মেয়েকে অস্বীকার করেছিলেন তিনি, আজ কি করে সেই মেয়ে তার হয়ে যায়! মেয়ে মানুষের আবারনামের আকিকা বলে তিনি উপহাস করেছিলেন একসময়। অথচ সেই মেয়ের নাম নিলে আজ তার মাথা উঁচু হয়। মেয়েলোকের পড়ালেখার দাম নাই। ছেলে হলে তবু পয়সা খরচ করে পড়াতেন এমনটা বলেমেয়ের স্কুল যাওয়া বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মেধাবী মেয়ে বৃত্তির টাকায় কষ্ট করে আজ মস্ত ডাক্তার হয়েছে। এর পেছনে তার একবিন্দু অবদানও নেই। অথচ এই মেয়েই আজ বৃদ্ধ বাবারকান্ডারির ভূমিকা পালন করছে। বাবার সমস্ত দরিদ্রতা দূর করে সংসারে সুখের যাদু নিয়ে এসেছে। আজ দবির মিয়া তার ভুল বুঝতে পারেন। তার অনুতপ্ত হওয়ার মধ্যদিয়ে ভুল স্বীকার করে নেয় গোটা সমাজ।

About the Author মুনতাসির সিয়াম

মুনতাসির সিয়াম। আমার নামটাই বিশেষণের বিশেষণ। এর পর আর কিছু যোগ করার প্রয়োজন পড়ে না।

follow me on:

Leave a Comment: