মাদকাসক্ত রাকিব

আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছ খরস্রোতা খাল। খালের ওপারে রুপসী গ্রাম। গ্রামের শেষপ্রান্তে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দু’গ্রামের সেতুবন্ধ একটা বাঁশকাঠের সাঁকো। আমাদের গ্রামের ছেলেমেয়েদের বিদ্যালাভ নিমিত্তে প্রত্যহ বাঁশনির্মিত সাঁকো পার হয়ে চার কিলো পাড়ি দিতে হয়। নড়বড়ে সাঁকো পাড়ি দিয়ে ৬কিলো হেটে দরিদ্রতার অজুহাতে বিদ্যালাভের কষ্টটা সইতে না পেরে অনেকেই পড়ালেখাকে পাঠিয়েছে নির্বাসনে। এমনই এক কিশোর রাকিব। হতদরিদ্রের সপ্তম সন্তান সে। পড়ালেখাই অত্যন্ত মেধাবী থাকা স্বত্বেও দরিদ্রতাকে অজুহাত করে পড়ালেখা ছাড়ায় তার পিতা। অনেক বুঝিয়েছি ভদ্রলোকের সাফ এককথা গরীবের আবার লেখাপড়া! স্কুলের পথে পূর্বমত প্রায়শই রাকিবের সাথে দেখা হত। এবার অবশ্য আমার হাতে যেখানে বই, তার হাতে সেখানে চাষের মই। আমাকে দেখে কেন জানি সে লুকায়। নিজেকে আড়ালে রাখতে চায়। অথচ তার অন্তরঙ্গ বন্ধু এই আমিই ছিলাম। তার এইরকম লুকোচুরিতে ক্ষানিকটা ফুসছিলাম।যাইহোক একের পর এক দুর্দশা ক্রমশ তার পরিবারে হানছিল আঘাত। সেই কালবৈশাখীতে তাদের একমাত্র চালাঘরটাও উড়ে গেলে খোলা আকাশের নিচে বসত বাসে।এত কিছুর পরও তার মুখে সেই চিরচেনা স্বভাবসুলভ হাসিটা লেগেই থাকত। সপ্তাহখানেক তাকে আর দেখছি নে তাই,তার বাড়ি যাই। বাড়িতে কেউ নাই খোজ নিয়ে জানা যায় ছিল দেনার দায়। পরিশোধ করতে না পারায়,ভিটে ছেড়ে শহরে চলে যায়। তারপর দীর্ঘদিন তার দেখা মেলে নি। এই দিনে আমিও গ্রাম্য পাঠশালার পাঠ চুকে,মাধ্যমিক স্কুল পাড়ি দিয়ে শহরে কলেজে পড়ছি। পিচডালা এ শহরে যখনি গ্রামের স্মৃতি মনে পড়ে মনে পড়ে যায় বাল্যবন্ধু রাকিবের কথাই। জানিনে বন্ধু রাকিব কেমন আছে কোথায় আছে। শুধু মনে পড়ে বৃষ্টিতে খালের জলে একসাথে সাতরানোর কথা। মনে পড়ে লিচুবাগানের লিচু চুরির কথা। বন্ধু হারানোর ব্যথা,আজ জাগিয়ে তুলে যত দুঃখকথা।

 

যাইহোক রাকিবের সাথে কিন্তূ আমার দেখা হয়েছিল। ব্যস্ত রাস্তা ধরে হাটছি পিছন থেকে কে যেন বললো কিরে চিকন! এ যে বাল্যবন্ধুদের মাঝে আমার ডাকনাম। রাকিবই তো এই নামে প্রায়শই ডাকত আমায়। তাহলে কি? হ্যা, পিছনে তাকাতেই দেখি রাকিব! অর্ধযুগ এর অনেক পরে দেখা অথচ এত সহজেই চিনে ফেললাম। আত্মার বন্ধন বুঝি চিরকাল রয়। আসলে চিনতে তার চেহারা যতটুকু কষ্ট দিয়েছে, ঠিক তার কন্ঠ ততটুকুই সহায়তা করেছে। একই সে কন্ঠ, একই সে ডাক। চিনতে পারিস? কি যে বলিস না রাকিব! তা চল কোন রেষ্টুরেন্টে যাওয়া যাক। রাকিবের পক্ষ থেকে সম্মতি নেই। আরে রাকিব! এতদিন পরে দেখা। ওমা তোর চেহারা ফ্যাকাসে লাগছে কেন? শরীরের ঘাম, তোয়ালে দিয়ে মুছে দিলাম। তারপর বললাম ভাল আছিস? আর বলিস না গরীবের আবার ভাল থাকা! ঠিক যেমন তার বাবা একবার বলেছিন গরীবের আবার লেখাপড়া! এর মত লাগল। যাইহোক বাসায় নিতে চাইলাম,পারলাম না। উল্টো তার বাসাতে যেতে হল। রেললাইনের পাশে এক বস্তিতে থাকে সে। তার ঘরে প্রবেশ করতেই কোন এক মেয়েকে দেখলুম স্বলজ্জ ঘোমটা দিতে।কে রে মেয়েটা?  আমার বউ!!মানে রাকিব! তুই বিয়ে করেছিস? কবে?

 

সে এক ইতিহাস। পরে জানলুম টাকার জন্য বাবা জোর করে তাকে বিয়ে করায় কন্যাপক্ষ প্রদত্ত যৌতুকের আশায়! যে বয়সটা খাতাকলম বগলে কলেজে যাবার কথা সেই বয়সে রাকিব অন্নযোগাড়ে ব্যস্ত! বড় নির্মম বিধাতা বড় নির্মম। দারিদ্রতার নির্মম শিকার রাকিবরা। এই রাকিবরা মাদকাসক্ত হবে না তো কি হবে? রাকিব দুঃখনিবারণে ধূমপান করে। জানিনা রাকিবের মত কিশোরদের দুঃখনিবারণে মাদক কতটা কার্যকরী। শুধু জানি বন্ধু রাকিব এক অমানবেতর জীবনযাপন করছে।একসময়ের মেধাবী রাকিব অঙ্কুরেই ঝড়ে গেল! যে রাকিব খালে ঝাপটে স্বপ্ন দেখত আটলান্টা পাড়ির সে রাকিবের দৌড় আজ কমলাপুর রেলস্ট্যাশান পর্যন্ত। কি ছিল তার অপরাধ?জন্মই কি তার আজন্ম পাপ? এক দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে রাকিবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসায় ফিরলুম।

About the Author ইয়াছির আরাফাত

যদিও ব্যক্তি ক্ষুদ্র তথাপি আমি ভদ্র, কি বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি? ব্যবহারই বলবে আমি বামুন না শুদ্র।

follow me on:

Leave a Comment: