সাঁতার শেখার গল্প

 

আমরা বোনরা কয়েক বছর পরপরই আব্বা-আম্মার সাথে সাথে নতুন জায়গায় যেতাম। পুরাতন শহরের সাজানো বাসা, স্কুল আর প্রিয় বন্ধুদের ছেড়ে নতুন শহরে যাওয়া আমাদের কাছে নতুন না হলেও, ভীষণ কষ্টের একটা অনুভুতি রেখেযেত। কুষ্টিয়ার আগের কোনো জায়গা নিয়ে এমন নোনাজলে ভেজা অভিজ্ঞতা আমার স্মৃতিতে নেই। তাই, প্রথম যেদিন আমরা কুষ্টিয়া জেলখানায় পৌছালাম, সেদিনের কথাও তেমন মনে নেই। শুধু মনে আছে আমি সম্পূর্ণ বাসার চারিপাশদেখতে বের হয়েছিলাম। আমাদের বাসার ভেতর ছোট, ময়লা পুকুরটা দেখে কেমন যেন মন খারাপও হয়েছিল। পাড়ে বসে ব্যাঙ্গাচি দেখে অবাক হয়েছিলাম, মাছের পোনা ভেবে। তখন কি আর জানতাম, আর কিছুদিনের মধ্যে আমিও ওদেরমত সাঁতার কেটে বেড়াব এই নোংরা-ময়লা পুকুরে! এই ময়লা পানি ছেড়ে উঠতে মন চাইবে না! নতুন বাসায় আসার পরে আম্মা ভয়ে অস্থির। যেহেতু আম্মা সাঁতার জানে না, আম্মা পানি অসম্ভব ভয় পায় আর এখানে বাসার ভেতরে পুকুর।তাঁর উপরে আমার মত ইবলিশ-শয়তান বাচ্চা ঘরে, যাকে কোথাও বসিয়ে রাখা মোটামুটি অসম্ভবের কাছাকাছি কাজ। কোনদিন যে পুকুরে ডুবে মরে যাব ব্যাঙ্গাচি আর মাছ দেখতে যেয়ে, কোনো ঠিক আছে?

 

 

 

আমার বড়আপুর নাম মিতু। আপু দেখতে আদর্শ বাঙ্গালী মেয়ে। শ্যামা মেয়ের কাজল কালো টানা চোখ। কোমর সমান কোঁকড়ানো চুল আর মিষ্টি হাসি। ছেলেবেলা থেকেই আপু ভীষণ চঞ্চল আর সাহসী। কিছুতেই ভয় ছিল না ওর। জেলখানারঠিক ঊল্টোদিকে কুষ্টিয়া সরকারী মহিলা কলেজ, যেখানে বড়আপু আর মেজআপু পড়ত। কলেজের ভেতর বিশাল বড় আর গভীর এক পুকুর। কাকচক্ষু জল বলতে যা বোঝায় আরকি। কুষ্টিয়ার ভয়াবহ গরমের দিনে হোস্টেলের মেয়েরা সেইপুকুরে সাঁতার কাটে। আমার সাহসী বড়আপু বাসায় না বলে বান্ধবীদের কাছ থেকে একা একা সাঁতার শিখে ফেলল। এরপর থেকে মাঝে মাঝে বাসার পুকুরে নেমে যেত। প্রথম যেদিন নামলো, সেদিন আপু পুকুরে নেমেছে শুনে আম্মা চিৎকারদিয়ে বের হয়ে এসেছিল আপু ডুবে যাবে ভেবে। ছেলেবেলাতে আব্বা যখন বরিশালে ছিল, আপু একদিন স্কিপিং রোপ তুলতে যেয়ে খালের পানিতে ভেসে গিয়েছিল। তখন থেকে আমার আম্মার জলাতংক! বলা বাহুল্য, এই বাসায় আসার পর থেকেআমাকে পুকুর থেকে দূরে রাখার জন্য আম্মা অনেকবার এই গল্প শুনিয়েছিল। জলে ভেসে যাওয়া আমার সেই আপু সাঁতার কেটে, পানির মধ্যে মাছের মত ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আমি পাড়ে দাঁড়িয়ে আপুকে অনেক অনুরোধ করলাম আমিও শিখব।আমি অনেক ছোট, পারবো না, এই বলে আমাকে নামতে দেয়া হল না। তবে এই দুঃখ কমে গেল যখন আপুকে পাহারা দেয়ার দায়িত্ব পেলাম। আব্বা দুপুরে ভাত খেতে বাসায় আসতেন। আমার দায়িত্ব ছিল আব্বা আসার আগেই আপুকে সাবধানকরা। তবে লাভ বেশী হয়নি। আব্বার কানে কিভাবে কিভাবে যেন পৌঁছেই গেল। রাগ করার বদলে আব্বা খুশিই হলেন। বাকি বোনদের সাঁতার শেখানোর দায়িত্ব আপুকে দিয়ে দিলেন। পুকুরের ময়লা পরিষ্কার করে, পানিতে চুন আর দুটাকলাগাছ কেটে দিয়ে দেয়া হল। বড়আপুর ক্লাসে আমাদের সাঁতার শেখা শুরু হয়ে গেল।

 

 

 

পানির নিজের একটা ক্ষমতা আছে। মানুষকে টানতে পারে। একবার নামলে আর ওঠার কথা মনে থাকে না। প্রথম প্রথম যেই ভয়টা থাকে, একবার কেটে গেলেই হল। আর নিজেকে আটকিয়ে রাখার উপায় থাকে না। পানির ভয় কাটার পরসাঁতার শেখার প্রথম সিঁড়ি ভাসতে শেখা। কলাগাছ দিয়ে সারা পুকুর চক্কর দিয়ে আসতে খুব বেশি সময় লাগে নি আমার। ফ্রক দিয়ে বাতাস আটকিয়ে পানিতে ভাসাও মজার কাজ। কিন্তু পাড় ছেড়ে আর কোথাও ভয়ে যাই না একা একা। কাজেইভাসা শেখার পরে সাঁতার শেখা আর আগাচ্ছিল না। বড়আপু যত যাই বলে, কাজ হচ্ছিল না। কোনো এক শুক্রবারের কথা। আব্বা গোসল করে নামাজ পড়তে গেছে। আমরা বোনরা সবাই পুকুরে দাপাদাপি করছি। আব্বা নামাজ থেকে ফিরেভাত খেতে বসতেন, আমরাও তাই। আব্বা ফেরার আগেই সবাই গোসল করে তৈরি থাকতাম। ওইদিন পানি থেকে উঠতেই ইচ্ছা করছিল না। আব্বা এসে দেখেন আমরা সবাই পানিতে। আব্বা গ্রামের ছেলে, মাছের মত সাঁতার কাটতে পারে।আমাদের অবস্থা দেখে হেসে অস্থির। পাড়ে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ আমাদের মাঝপুকুরে নেয়ার চেষ্টা করলেন। কোনোভাবেই যখন কাজ হল না, তখন নিজে পুকুরে নেমে গেলেন। আমরা তো খুশিতে আটখানা! আব্বা আমাদের সাথে নেমেছে! কিন্তুএই খুশি আমার বেশিক্ষন টিকল না। হাতের কাছে পেয়েই আমার এক হাত আর এক পা ধরে ঝাঁকিজাল ছোঁড়ার মত আমাকে মাঝপুকুরে ছুঁড়ে দিল! দিয়েই বলে হাত-পা ছোঁড়ো, সাঁতার কাটো। ছোট্ট মানুষ আমি, হাবুডুবু খেয়ে তলিয়ে যাচ্ছিলামপ্রায়। আব্বা সাঁতরে আমাকে পাড়ে নিয়ে আসলো। আম্মা পুকুর পাড় থেকে কান্নাকাটি শুরু করে দিল, “ওগো, আমার মেয়েটা মরে যাবে! এভাবে কেউ বাচ্চাকে পানিতে ফেলে!!” এক পেট পানি খেয়ে, ভয়ে, আতংকে আম্মার কান্নার সাথে সাথেআমিও গলা ছেড়ে কান্না শুরু করলাম। আব্বা বলল, কাঁদলে সাঁতার শেখা যাবে না। একটু থামতেই আবার হাত-পা ধরে ছুঁড়ে দিলো! আবারো আমি হাবুডুবু আর পানি খেয়ে কাহিল। কিন্তু এইবার কিভাবে কিভাবে যেন হাত-পা ছুঁড়ে আমি পাড়েচলে আসলাম। আর কয়েক সপ্তাহে যা হয়নি, কয়েক মিনিটে হয়ে গেল। আমি সাঁতার শিখে ফেললাম! একই প্রক্রিয়া নোয়াআপু আর তোনীর উপরেও চালানো হল। সবাই তো আর তানী না। কি আর করা! তবে, আস্তে আস্তে ওরাও শিখে গেল।আমি কত জ্ঞান সবাইকে দান করেছিলাম সেগুলি আর মনে করতে চাই না। আমি আমার অত্যন্ত বিনয়ী মানুষ কিনা!

 

 

 

এজন্য আমি আর বললাম না যে, বড়আপুর পরে আমিই প্রথম সাঁতার শিখে ফেললাম। মেজআপু, সেজআপু, নোয়াআপু আর তোনীরও আগে। নিজের ঢোল কি আর নিজে পেটানো যায়? আমি আবার লাজুক মানুষ তো! আরও বললাম না যে,আমি পানির পোকার মত সাঁতার শিখে ফেললাম। সোজা সাঁতার, চিৎ সাঁতার, ডুব সাঁতার সব রকম সাঁতার দিতে পারি। এসব কি আর বলার মত কথা নাকি? তাই না?

Leave a Comment: