একটি বিকেল

 

সজল শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাগে, অপমানে ওর সমস্ত অনুভুতি ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। বাবা মেরেছে বলে নয়, রোজকার দুষ্টুমির কিছু ধূলো বাবার হাতেই ঝাড়া হয়ে যায়। কিন্তু আজকের ব্যাপারটা অন্যরকম। পাড়ার অনেকের ঘিরে ধরা ভিড়ের মাঝে সজল একবার চোখ তুলেই নামিয়ে নিল। হ্যাঁ, সে তাকিয়ে আছে। আদৃতা তার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই চোখে কি ছিলো সজল জানে না। জলে টইটুম্বুর একজোড়া চোখ আর কেঁপে কেঁপে ওঠা ঠোঁটের ভাষা বোঝার মত অবস্থা এখন ওর নেই। বাবা একবার জিজ্ঞেস করলো না কি হয়েছে। এভাবে সবার সামনে মেরে বসায় ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিলো ওর।

 

 

 

সজল তার বন্ধুদের সাথে মাঠে খেলছিলো। প্রতিদিনই খেলতে আসে তারা। মাঠের পাশের রাস্তা দিয়ে আদৃতা তার মা’র সাথে হেঁটে হেঁটে পার্থ স্যারের কাছে পড়তে যায়। স্যার রসায়ন পড়ান। শুধু খেলতে আসে বললে ভুল বলা হবে। শুধুমাত্র একটাবারের জন্য এই মেয়েটাকে চোখের দেখা দেখতে সে প্রতিদিন আসে। সপ্তাহে চার দিন, গুটি গুটি পায়ে তার যাওয়া-আসা দেখে। মাঝে মাঝে চোখে চোখ পড়ে যায়। দু’জনেই অপ্রস্তুতভাবে চোখ সরিয়ে নেয়। মাঠের পাশ দিয়ে যাবার সময় আদৃতার চোখ যে তাকে খোঁজে, এটা সজল জানে। বাকী তিন দিন যেন অপূর্ণ থেকে যায় তার। কবে থেকে যে এমন হল সজলের, ঠিক মনে নেই। যখন ক্লাস এইটে পড়ে, তখন থেকে কি? গার্লস স্কুলের ছোট-খাট এই মেয়েটা যে এভাবে তার বিকেলগুলোর মানে পালটে দেবে, জানা ছিলো না তার। আগে জানলে সায়েন্স নিতো। কমার্স নিয়ে এখন মাথা চাপড়ানো ছাড়া উপায় কি? জেলা স্কুলে সজলের সহপাঠীরা কয়েকজন পার্থ স্যারের কাছেই পড়ে। ওদের দেখলে কষ্টটা আরও বেড়ে যায়। ও নিজেও তো পড়তে পারতো। সায়েন্স ছেড়ে কমার্স নেয়ার আক্ষেপটা গত দু’বছরে শুধু বেড়েই চলেছে তার।

 

 

 

আজ কোন একটা কারণে আদৃতার মা ওর সাথে আসেন নি। যাবার পথে ওকে একলা দেখে মনের ভেতর ইচ্ছেরা শোরগোল করে ওঠে। একটু এগিয়ে যেয়ে কথা বলে ফেলবে নাকি আজ। মিষ্টি একটা হাসি ছুঁড়ে দিয়ে আদৃতার চলে যায়। দেখতে দেখতে সজল ভাবে, কতদিন হয়ে গেল প্রায় রোজ বিকেলেই দেখা হয়। পরিচিত হয়ে ওঠার কাজটা আজকে সেরেই ফেলবে নাকি। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব, বন্ধুত্ব থেকে ভালো লাগা, তারপর… না, নিজের ভাবনার রাশ টেনে ধরে সজল। বড় ছ্যাবলামি মনে হয় এভাবে কথা বলাটাকে। রায়হানের ওভার চলছে। খেলায় মন ফেরায় সে। খেলতে খেলতে কতক্ষণ পার হয়েছে হিসেব থাকে না। হঠাত দেখে আদৃতা মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে অস্থিরভাবে কাকে যেন খুঁজছে। রায়হান, কিংশুক, রাতুলরা খেলা ফেলে একজন আরেকজনের দিকে তাকায়। সবার দৃষ্টি অনুসরণ করে আদৃতা সজলের দিকে দৌড়ে আসতে শুরু করে। আদৃতা কাছাকাছি হতেই দেখে তার চোখে জল। বার বার ভীত চোখে পেছনে ফিরে দেখছে। স্তম্ভিত সজল পেছনে খেয়াল করতেই দেখে, দর্জি মহল্লার চার-পাঁচটা ছেলে মাঠের পাশে এসে হাসা-হাসি করছে। কোন কুশল-প্রশ্ন নয়, প্রথম পরিচয়ের উদ্বিগ্নতা নয়, সজল সরাসরি জিজ্ঞেস করে, “ওরা কিছু বলেছে?” নিজেকে আর সামলাতে পারে না আদৃতা, কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। মুহূর্তে নিজের ভেতরে বিষ্ফোরণ হয়ে যায় তার। সজলকে একা যেতে দেখে রায়হান, কিংশুক, রাতুল আর অনীক এগিয়ে আসে খেলা ফেলে। এক কথা, দু’কথা থেকে তর্ক শুরু হয়ে যায়। তর্কাতর্কি থেকে হাতাহাতি, এরপর মারামারি শুরু হতে সময় লাগে না।

 

 

 

সজলের বাবা জুলফিকার সাহেব রিক্সায় করে বাসায় ফিরছিলেন। আজকে বেতন পেয়েছেন বলে মনটা বেশ খুশি। মাঠ থেকে ছেলেকে নিয়ে বাসায় যাবেন বলে থামতেই দেখেন মাঠের মাঝে মারামারি চলছে। তাড়াতাড়ি ভাড়া মিটিয়ে এগিয়ে আসতেই দেখেন তাঁর ছেলে ধূলোয় লুটোপুটি খেয়ে অন্য পাড়ার ছেলেদের সাথে মারামারি করছে। মহল্লার অনেকেই পাশে দাঁড়িয়ে দেখছে। মুহূর্তে মেজাজ সপ্তমে উঠে গেল তাঁর। দৌড়ে এসে সজলকে জাপটে ধরে সরালেন। এরপরই কথা নেই, বার্তা নেই, ঠাশ করে একটা চড় বসিয়ে দিলেন ছেলের গালে। সজল একটা কথা বলল না। জুলফিকার সাহেব বললেন, “বাসায় যাও।” সজল আস্তে করে বলল, “মেয়েটাকে এগিয়ে দিয়ে এসো। আমি যাচ্ছি।” বলেই ঘুরে হাঁটা শুরু করলো। জুলফিকার সাহেব এতক্ষণে মেয়েটাকে দেখলেন। তাঁর ছেলের নীরবে চলে যাওয়া দেখলেন। সবাইকে বাসায় যেতে বলে তিনি আদৃতার দিকে এগিয়ে আসলেন। মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার বাসা কোথায় মা? আমি এগিয়ে দিচ্ছি, চল।” ভয়ে শুকিয়ে যাওয়া মুখটা দেখে মায়ায় মনটা ভরে গেলো তাঁর। বাড়ি পৌছে দিতে দিতে আদৃতার কাছ থেকে কি হয়েছিলো জিজ্ঞেস করলেন। ইতস্তত করলেও আদৃতা আস্তে আস্তে সব খুলে বলল। দর্জিমহল্লার ছেলেগুলি স্যারের বাসা থেকে আসার পথে তাকে বাজে মন্তব্য করছিলো। রেগে গিয়ে আদৃতা তাদের বেয়াদব বলে। এরপর, ছেলেগুলি ওকে ঘিরে ধরে, ওর গায়ের ওড়না ধরেও টান দেয়। আদৃতা কোনক্রমে দৌড়ে বের হয়ে মাঠে চলে আসে। ছেলেগুলিও ওর পিছু পিছু আসতে থাকে। এরপর কি ঘটেছে জুলফিকার সাহেব আন্দাজ করতে পারেন।

 

 

 

আদৃতাদের বাসার বেল চাপতেই কাজের মেয়ে দরজা খুলে দেয়। আদৃতার মা’র জ্বর। মেয়ের ফিরতে দেরী হচ্ছে দেখে অসুস্থ শরীরেই তিনি বারান্দায় বসে আছেন। আদৃতাকে  রেখে জুলফিকার সাহেব বাসার পথ ধরেন। বড় মিষ্টি আদৃতা মেয়েটা। এক অদ্ভুত ভালো লাগায় তাঁর মন ভরে ওঠে। ছেলেকে মেরেছেন বলে খারাপ লাগতে শুরু করে। মোড়ের দোকান থেকে সজলের প্রিয় চকোলেট আইস্ক্রীমের বক্স কিনে নেন।  আজ রাতে ছেলের সাথে কথা বলতে হবে। এ কথা মনে হতেই কেমন নার্ভাস লাগতে থাকে। হঠাত নিজের মনে হেসে ওঠেন। ছেলে তাঁর বড় হয়ে যাচ্ছে। শাসন করার পাশাপাশি বন্ধুত্ব করাটাও জরুরি মনে হতে থাকে। “বড্ড মাথা গরম ছেলেটা আমার”- ভাবতে ভাবতে বাসার দরজায় পৌছে যান। বেল চেপে আনমনা হয়ে যান। নিজের কৈশোরের দিনগুলির কথা মনে পড়ে যায়। না, আজকে সজলের সাথে কথা বলতেই হবে। বড় অভিমানী বয়স এটা। একবার দূরত্ব হয়ে গেলে সমস্যা, কমিয়ে আনাটা অনেক কঠিন হয়ে যায়। “সজল… সজল…” ডাকতে ডাকতে ঘরে ঢুকে যান তিনি।

Leave a Comment: