অবয়ব

 

মেয়াটা অনেক বেশিই কল্পনাপ্রবন।সেই কত বছর ধরে চিনি তবু বারবার মনে হয় বদলে গেছে।কিন্তু অাসলে ও অমনই।একই সাথে গার্লস স্কুলে পড়তাম।তারপর কলেজ অালাদা হলেও প্রায়ই দেখা হতো।

তখন কলেজ লাইফ প্রায় শেষ।রেজাল্টের অপেক্ষা চলছে।এমনই একদিন অামি অার সাঁঝ কোচিং শেষে ওদের বাড়ির ছাদে বসে পড়ন্ত, বিকেলের ডুবন্ত সূর্যটা দেখছিলাম।

চুপ চাপ!হঠাৎ সাঁঝ বলে উঠল,কল্পনাতেও মানুষ থাকে জানিস?এরকম সূর্যও থাকে।মানুষ গুলোর সাথে বসে সূর্যের উদয় অস্ত দেখা যায়।

-মানে?

=মানে টা খুবই সোজা।অামরা যখন একা থাকি তখন কি অাসলে একা থাকি?

-নয়ত কি?

=উঁহু,তখন অামরা কোনো বিষয় নিয়ে ভাবি।অন্য কাওকে নিয়ে বা কোনো বিষয় নিয়ে।ভাবনা টা একা একা বসে ভাবলেই বুঝি সত্যি সত্যি একা থাকা যায়?

-যায় না?

=না যায় না।

-তাহলে সত্যি সত্যি একা থাকা কখনোই যায় না?

=যায়!,,সাঁঝের চোখ জোড়া চকচক করে উঠল।ওর মনের মতন প্রশ্ন পেলে ও এমন করে।তারপর অনেকটা বক্তৃতা দেয়ার মত করে বলতে থাকল,

=সত্যি সত্যি একা থাকাটা হচ্ছে নিজেকে এবং নিজের কল্পনাকে নিয়ে থাকা।ভালো মতন সত্যি সত্যি একা থাকতে হলে কল্পনার একটা জগৎ বানিয়ে নিতে হয়!

-ভালো মতন সত্যি সত্যি।হা হা হা।

অামার হাসি দেখে চোখ কটমটিয়ে বাচ্চাদের মত মুখ লাল করে দুহাত কোমরে দিয়ে প্রশ্ন করল,

= হাসছিস যে! বুঝিস কিছু??

-না ভাই,বুঝি না।সব তুই ই বুঝিস।

=মসকরা হচ্ছে?

-না না।সত্যি এই ব্যাপারটা অামি বুঝিনা।অাসলে কখনো ভাবিনি।

=ভাবতেও হবে না।

বলেই ধপ করে পাশে বসে পরল মুখ ভার করে।আলতো করে ওর কাঁধে টোকা দিয়ে বললাম,

-বল।মাঝ পথে থেমে গেলে কি অার চলে?বল,শুনছি।

অামার দিকে ফিরে মিস্টি করে হেসে বললো,

=অামি জানতাম তুই শুনবি।তবে শোন,…প্রতিটা মানুষই কল্পনা করে।নিজেদের মতামত মত বুদ্ধি দিয়ে পছন্দ অপছন্দ গুলো সাজিয়ে তোলে সেই খানে একটা জগৎ তৈরী হয়।কেও কেও বানিয়ে ফেলে একটা রাজ্য!তাতে কত রকম মানুষ।তার অপছন্দ অার পছন্দ মিলিয়ে বানানো সব মানুষ।খারাপ,ভাল,বন্ধু, শত্রু যাকে সে যে অাসনে বসাতে চায় বসায়।বসাতে পারে।কারন সেটা তার রাজ্য।

কেও যখন সত্যিকার অর্থে একা থাকে বা থাকতে চায় তখন সে বাস্তব জগতের মানুষ গুলোকে নিয়ে না ভেবে বরং নিজেই কল্পনার জগতে পাড়ি জমায়।সেখানকার মানুষদের নিয়ে ভাবে।সময় কাটায়।কথাও বলে।যেন সব জীবন্ত!!

হয়ত মনের গহীনে কল্পনার রাজ্যে সে অনেকের সাথে অনেকের মাঝে।কিন্তু বস্তুত সে একা!কারন তার চারপাশের কাল্পনিক মানুষ গুলো তার মনেরই সৃষ্টি। তার স্বত্বার অংশ।

-হুম।

সাঁঝের মুখে মুচকি হাসি।সাধারন হাসি নয়।হাসিটা অনেক গভীর আর রহস্যময়!ও অাবার বলতে থাকে,

=জানিস তো ত্রপা,সেই মানুষ গুলোর সাথে জীবনের অনেক বিষয় জড়িয়ে থাকে।

-যেনম?

=যেমন ধর বন্ধু,ভাললাগা, মন্দলাগা।

-ভাললাগা?অার ভাললাগার মানুষ??

=হা হা।ঠিক ধরেছিস।একজন মানুষ কখন কাওকে পছন্দ করে জানিস?

-যখন তার ভাল লাগে।

=অারে বুদ্ধু কখন ভাল লাগে?

…তখন,যখন তার কল্পনা করা ভাল লাগার সাথে কারো চরিত্র,চেহারা মিলে যায়।

-বাহ ভাল বলেছিস তো!

=অামার অাছে।

বাঁকা চোখে অামার দিকে তাকিয়ে চোখ সরু করে বললো,

তোরও অাছে।

-অা..অামার?

=হ্যাঁ।অারে ঘাবড়াচ্ছিস কেনো?এটা সাধারন ব্যাপার।

এতক্ষণ দুজন একই দিকে তাকিয়ে ছিলাম।ও শেষ কথাটা বলেই অামার দিকে তাকালো এক ঝটকায়।অার অমনি একটা হাসিন রোল পরে গেলো।খানিক বাদে দুজন হাসি থামালাম।

=চল নিচে যাই।এক্ষুণি অাজান দেবে।

নামতে নামতে হঠাৎ থেমে বলল,

=ত্রপা,অামার কল্পনার রাজ্যে একদম মন মতন করে একজন কে গড়েছি।বলতে পারিস মনের মানুষ।হি হি।তোর কেমন কল্পনা বল শুনি।

-অামার নেই।

=ধুর বুদ্ধু।সবার থাকে তোর ও অাছে।তুই হয়ত কখনও খুঁজে দেখিসনি।এখন থেকে খুঁজবি।খুঁজে পেলে অামায় বলিস কেমন?

-বলব ক্ষন।…অাচ্ছা তোরটা বল।

=না ভাই অামি কেন বলব?অাগে অামি বলে দেব অার তোর টা বাকি?তা হবেনা।বাকির নাম ফাঁকি।যেদিন তুই বলবি সেদিন বলব।…চল।

-হুম।

কয়েক ধাপ নেমেই অাবার বলে উঠল,

=চেহারা কল্পনা করতে যাস না।চেহারা কল্পনায় অানতে গেলে অবচেতনে বাস্তবের কাওকে মনে অাসতে পারে।তাহলে সব ভেস্তে যাবে।দোষ, গুন,স্বভাব এসবই অাসলে।অাসলে চেহারা কিংবা টাকা পয়সা বাস্তবেও অামার গুরুত্ব পূর্ণ লাগে না।মানুষ টা কেমন সেটাই অাসল।

-হুম।

=তবে অামি কিন্তু সেই মানুষটার একটা নাম দিয়েছি!

অামার দিকে ফিরে অামার হাতটা চেপে ধরে বলল,

=নিহাল!ভাল না?

-বেশ ভাল।

=হি হি হি।

 

অনেক দিন হয়ে গেছে দেখা নেই সাঁঝের সাথে।অাজ দেখা হবে।দেখা হবে ভেবে কেমন যে লাগছে অামার অামি নিজেও বুঝতে পারছি না!

 

খুব বেশি ভাল একটা মেয়ে।যে কিনা কথায় কথায় মাতিয়ে রাখত সব্বাই কে।

বাসের জানালার পাশের সিটে বসে অাছি অামি।জানালার ওপাশে নিশ্চই সব কিছু বাসের বিপরীতে ছুটছে।কিন্তু বৃষ্টির পানিতে ভেজা কাঁচে সব কিছু ঝাপসা হয়ে অাছে।

সেদিনও বৃষ্টি হচ্ছিল।তখন অামরা সবে ভার্সিটিতে পড়ি।অামার স্পস্ট মনে অাছে।পড়ার চাপ ছিলনা তাই সাঁঝ ডেকেছিল গল্প করতে।ওর বাড়িতে সেদিন বৃষ্টিতে অাটকা পরে গিয়েছিলাম।অামাকে বারান্দায় বসিয়ে রেখে বলল অাসছি একটু থাম।

খানিক বাদে দুটো টুকরিতে করে মাখানো মুড়ি নিয়ে এলো।চাল ভাজা অার চিড়ে ভাজা মেশানো।তাতে কুচোনো পেঁয়াজ অার কাঁচা মরিচ গুচ্ছেক খানেক।

অামার দিকে টুকরিটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল নে,শুরু কর শুরু কর।

অামি ওর হাত থেকে নিয়ে যেই খেতে যাবো ওমনি..!

=থাম!অামি কবার বলেছি শুরুকরতে?

-দুবার!

=হি হি।দুটো কাজ শুরু করতে বলেছি।

-অারেকটা কি?

=ওই যে তোর কল্পনার মানুষের কথা বলবি না?নিহালের টা শুনতে হলে তোকে অাগে বলতে হবে যে বাছা!নাকি তোর এখনও খুঁজে পাওয়াই হয়নি???

-হ্যাঁ,হ্যাঁ শুনব বৈকি।অার বলব তো।পেয়েছি খুঁজে..

=সত্যি!?বাহ বেশ বেশ।বল তবে শুনি।

-যে অামায় বুঝবে,ভালবাবে,সবাইকে অাপন করতে জানবে।

=ব্যাস?….অাচ্ছা ছাড়।

-এবার বল,

=হুম. শোন তবে,নিহাল সৎ,ভদ্র,সবার থেকে একটু খানি অালাদা।নিজের সার্থের চেয়ে অন্যদের কথা ভাবতে বেশি ভালবাসে।ওর কাছে টাকা সব নয় অাসল অস্ত্র অান্তরিকতা।মোটেই দাম্ভিক নয়।অার একদমই বদরাগী নয়।অার সে অাভিমান,অাবদার,অার রাগের পার্থক্যটা বোঝে। …কি রে কি দেখছিস?

-তোকে।

=কেনো?

-কি করে এত সুন্দর করে বলিস??

=হা হা হা।থাক তোমায় অার দার্শনিক হতে হবে না।অামি এমনই।জানিস না?

সেদিনের অালাপটা ওখানেই শেষ হয়েছিল।

.

সত্যিই ও অমন ই।।ওর মতন।অার কেও ওর মতন না!

.

ক্যাম্পাসে থাকা কালে প্রায়ই যাওয়া অাসা ছিল।তবে আমার বিয়ের পর এই দিয়ে দ্বিতীয় বার যাচ্ছি সাঁঝের বাড়ি।প্রথমবার গিয়েছিলাম ওর বিয়েতে।অার এবার….!

সেবার অবশ্য একা গিয়েছিলাম।রনকের কাজ ছিল বলে অাসতে পারেনি।

বাস থেকে নেমে দেখি রনক অাসবেনা শুনে সাঁঝ অামাকে নিতে এসেছে।বললাম,

-বিয়ের দুদিন অাগে এসব কি, মেয়ে?

কে শোনে কার কথা।সেসব গা না করে অামাকে বলল অামাকে এখন ওর সাথে ফুচকা অার অাইস্ক্রিম খেতে যাইতে হবে।কি অার করা!গেলাম অগত্যা।

তবে অনেক দিন পর দুজনে বেশ মজা হয়েছিল।ওর হুট হাট অাবদারের শিকার অামাকে প্রায়ই হতে হত।কিন্তু সেদিন ওর চোখে মুখে অন্য রকম একটা ছাপ ছিল।একটা চিন্তা চিন্তা ছাপ!

কিন্তু অামি কিছুতেই কোনো খেই পাচ্ছিলাম না।ওর চোখের দিকে তাকিয়ে কিছুই ঠিক ঠাক বলা যায় না।চোখ গুলো যেমন ডাগর তেমনই গভীর।

বাড়ি ফিরেই ওর চিরদিনের সেই হাসির অাড়ালে সব যেনো লুকিয়ে পড়ল!

টংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে ফুচকার টকে চামুচ নাড়াতে নাড়াতে ওর অানমনা সেই চিন্তিত চোখ দুটো হাসির প্রলেপে ঢাকা পরে গেলো।

অামি সেদিন খানিক ভয় পেয়েছিলাম।তারপর থেকে ওকে চোখের অাড়াল করিনি,সব সময় পাশে পাশে ছিলাম।

ওকে সহজে বোঝা যায় না।কিন্তু এমন জটিল ধাঁধায় এর অাগে কখনো পরিনি।

সারা বিকেল গেল ব্যাস্ততায়।তবে সেদিনও তত মানুষ অাসে নি।কারন ততটা অাড়ম্বর করে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানটা হয়নি।শরিয়ত অনুসারে শুধুই অাত্মীয়া মহিলাদের নিয়ে ছোট্ট ঘরোয়া একটা অায়োজন।

সেদিন রাতে বাড়িতে অনেকে থাকবে।অান্টি সব তদারকি করছেন।এমন সময় মেয়ে তাকে গিয়ে বলে বসল,

“অামি অামার ঘরে অাজ একলা শোবো।কেও যেনো না থাকে।একা অামি।”

অান্টি তো পারলে ওকে চিবিয়ে খায়।কিন্তু তাতে যেনো ওর বয়েই গেলো।অামি অান্টিকে বুঝিয়ে রাজি করালাম।অান্টি রাজি হলেন বটে তবে চরম মাত্রার বিরক্ত হলেন অার নতুন করে অাবার সব ব্যাবস্থা করলেন।

সন্ধ্যা নাগাদ ওর হাতে মেহেদী পরিয়ে দিয়েছি।তারপর রাতের খাবারের পর ও তেমন বেরোয় নি ঘর থেকে।

অামি পাশের ঘরে ছিলাম।মাঝ রাত,প্রায় সবাই ঘুম।অামি তখনও ঘুমাইনি।

হঠাৎ অনুভব করলাম অামার অাড়া অাড়ি দুই ঠোঁটের ওপর লম্বা লম্বি করে একটা অাঙ্গুল চেপে ধরে রাখা।চোখ না খুলেই বুঝলাম এটা সাঁঝ ছাড়া অার কেও হতেই পারে না।

চমকে উঠে হঠাৎ শব্দ করে যাতে অন্যদের জাগিয়ে না দিই তাই সাঁঝের এ অভিনব ব্যাবস্থা।

অামাকে ইশারা করল ওর ঘরে যেতে।দুজনে পা টিপে টিপে ওর ঘরের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম।

খোলা জানালা দিয়ে চাঁদের অালো এসে পড়ছে ঘরের মেঝে অবধি।

সাঁঝ অামার দিকে তাকিয়ে ঘাড় একদিকে কাত করে সম্মতি চেয়ে বলল,

=”বসি?”

ওর বলার এই ধরনটা এমনই যে , না করতে পারবেনা কেও।

দুজন পাশাপাশি বসলাম।তারপর ও’ হেসে পরিস্থিতিটাকে খুব সহজ করে নিল।বলল,

=তোর রনক অাহমেদ কেমন রে?তোকে বোঝে,ভালবাসে,সবাইকে অাপন করতে জানে?

-তোর মনে অাছে?…হুম।অনেকটাই ।

=কেনো থাকবে না?তুই ভুলে গেছিস বলে অামিও..

ওকে মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে বললাম,

-ভুলিনি।

=অাচ্ছা……. তোর কি মনো হয়, রজত নিহালের মত হবে?কতটুকু হতে পারে?অার কত টুকু নয়?

-তা কি করে বলব বল?এটা তো বলা যায় না।

=একটু সহজ হয়ে সুজোগ পেলেই অামি উনাকে(রজত) নিহালের কথা বলব ঠিক করেছি। হি হি।

-বেশ তো।তাই বলিস।তোর সাথে কখনো কথা হয়নি রজত সাহেবের?

=উঁহু না।হয়নি।

তারপর এক ঝাঁক নীরবতা!অার সেই নীরবতা নিজেই যে কি অদ্ভুডভাবে কথোপকথনটা চালিয়ো নিতে পারে বলে বুঝানো যাবে না।

দুজনেই চুপ অথচ যেনো কত কথা হয়ে গেলো!

 

অামি জানি।ও অাকাশ পাতাল ভাবছে।যেসব ভাবনার কোনো শেষ নেই।

তাই এখন অামিও যদি ভাবতে বসি তাহলে চলবে না।অার ভেবেও কখনো ওর ভাবনার নাগাল পাবো না।তাই হাল ছেড়ে দিয়ে চুপ করে বসে রইলাম।

কারন অামি জানতাম অসংখ্য ভাবনার ভীড়ে ছুটে বেড়ানো দস্যি মেয়েটার বেশিক্ষণ অামার নিথরতা সইবে না।

নীরবতার মায়াজাল ভেদ করে সে নিজেই কথা বলে উঠবে।এবং সেটাই হলো,

=তোর কি মনে হয়?উনি(রজত) সহজ মানুষ নন?

-কি জানি!জানা নেই।

=মানুষের মন বড়ই অদ্ভুত বস্তু।তার নাগাল সে নিজেই পায় না।অার তো অন্য কেও!

-তবু লোকে বলে চেহারা দেখে অনেক কে বোঝা যায়।অাবার অনেক কে বোঝা যায় না।

=সত্যি কি তাই?নাকি কাওকে দেখে মানুষ অান্দাজে ধারনা করে?অার তার পর মিলে গেলে বলে,”জানতাম সে অমন।”

অার না মিললে বলে, “চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই/ছিল না,যে সে এত বড় ভন্ড!”… বল।

অামি বলার মত কিছু খুঁজে পাইনি ওই ব্যাখ্যাটা শোনার পর।পাশ কাটিয়ে নিতে তাই বললাম,

-অত শত ভাবিস না তো এখন।

=হুম।ভাববো না।ভেবেই বা কি হবে?ভাগ্য।ভাগ্যে যা অাছে তাই হবে।ভাগ্যের লিখন,না যায় খন্ডন!

অামি অবাক হয়েছিলাম।খুব অবাক।

ওর কথা গুলোতে অাক্ষেপ ছিল না।ছিল না কোনো অভিযোগ কিংবা অভিলাস।এমনকি উপহাস ও নয়।

শুধুই যেনো পাশ কাটিয়ে এড়িয়ে চলা।

অনিচ্ছাবশত।

অথচ বৃহৎ ক্ষুদ্র কোনো বিষয় কেই এড়িয়ে যাবার মেয়ে সে নয়।মধ্যরাতে চন্দ্রালোকে অাচ্ছন্নের মত বসে থাকা সাঁঝের বাক্য মালায় অামার পুরানো সাঁঝের কোনো ছোঁয়াই যেনো ছিল না!

যখনই কোথাও কোনো সমস্যা।কোনো ঝামেলা,গন্ডগোল হত,ওর কাছে এসে বললেই শান্ত লাগত।যেনো সব বোঝা হালকা হয়ে গেলো!

ও ঠিক তেমন, যেমন একজন কাউন্সিলর!

সর্বাবস্থায় ওর কাছে সমাধান থাকত।সিরিয়াস ভাবে কথা বললেও মাঝে মাঝে হেসে উড়িয়ে দিতো।তখন খুব রাগ হতো।পরক্ষণে যখন বুঝতাম অাসলেই বিষয়টা সিরিয়াস কিছু না। তখন দেখতাম ও দূরে বসে মুচকি মুচকি হাসছে।

অাবার অাড্ডার ফাঁকে হঠাৎ দুটো কথা বলত মাঝে মাঝে।কদিন বাদে সেটার ফল পেতাম।বুঝতাম ব্যাপারটা গুরুতরই বটে।

কিন্তু ও যে কি করে অাগে সব বুঝে যেতো!সে ব্যাপারে ভেবে কখনো কূল কিনারা পাইনি।অাজও ভাবতে ইচ্ছা করছে না।

.

মেয়েটা সব সময় হাসতে পারে।কোনটা অাসল কোনটা নকল বোঝা যায় না।বড় অদ্ভুত লাগে ওর থিওরি গুলো।অথচ কোনোটাই ফেলনা নয়।

যেমন ওর থিওরি হচ্ছে নিজের কষ্টটা অন্যের সামনে হা হুতেস করে বলে বেড়িয়ে বাকি দের পেইন দেয়াটা একটা অকাজ।যদি পারিস তো সুখে থাকার,ভাল থাকার কথা বল।

সাঁঝ বলে,”অামি দুঃখ বিলাসি নই!হতে চাই না।”

ওসব নাকি ওর সাথে যায় না।

.

ওর বিয়ের পর বেশ কয়েকবার ফোন করেছিলাম।কথা হয়েছে।কিন্তু কিছুতেই অালাপটা দীর্ঘ করতে পারিনি।অাবার কথা বলেনি এমন অভিযোগ ও করা যায় না।

যা যা বলেছি প্রতিটা কথার পাল্টা জবাব দিয়েছে বটে। কিন্তু জবাব গুলো খুব নিখুঁত এবং সংক্ষিপ্ত।

সাঁঝের হাসির অাওয়াজ শুনতে পারছিলাম।যেটা বার বার বলতে চাইছিল সে ভাল অাছে।যার অাবৃত্তি মোহময়।

যে শুধু মাত্র তার কন্ঠের অাবৃত্তি দিয়েই কবিতায় কবির ব্যক্ত পরিবেশের প্রতিচ্ছায়া সৃষ্টি করতে পারে,সে যে তার কন্ঠের ধারাতেই নতুন এক পরিবেশ সৃণ্টি করে অাসল পরিবেশের অাবহাওয়াটাকে পুরোপুরি পাল্টে দিতে পারে তা অামি মনের ভেতর অানতে পারিনি।তার ছলনা বুঝিনি।

অামি হেরে গেছি বলব না।বলব সাঁঝ জিতে গেছে।বরাবরের মত।

নিজ কন্ঠে বিষ ধারন করে সনাতনের দেবাতা যেমন বিশ্ব সংসার রক্ষা করেছিল।তেমনই কন্ঠের উচ্চারনে সাঁঝ এক মায়া অাবেশ তৈরী করেছিল।

অামায় অাসল কথা গুলো অাড়াল করেছে।

এখন যেমন অাসল ঘটনাটা জানি।তবু জানি না ও কি করছে।কি ভাবছে।

নিশ্চই নিজের মত কোনো লজিক খুঁজে বার করেছে।ঠিক করেছে কি করবে।

তা না হলে এত দিন সময় লাগতনা ওর শ্বশুরঘর ছেড়ে অাসতে।

শ্বশুরবাড়ি ঠিক বলা যাবে না।কারন রজত সাহেব অার সাঁঝ অালাদা বাড়ি নিয়ে থাকত।

সাঁঝের কপালে যে এই ছিল….।নাহ ছিল বলতেও ইচ্ছে করছে না।ওর মতন একটা মেয়ে!ওর নিশ্চই ভাল কিছু হবে।

হে অাল্লাহ! ভাল মানুষ গুলো কেনো এত পরীক্ষা নাও তুমি?

জোরে একটা শ্বাস ফেলতেই রনক একটু নড়ে চড়ে বসল।

বেচারা চুপ চাপ বসে অাছে।ওর দিকে কোনো খেয়ালই দিচ্ছি না।

কিন্তু রনক সব জানে।অামি জানি অামার অাচরনে ওর কোনো অভিযোগ নেই।কারন সাঁঝের কথা সে জানে।

সাঁঝের ফোন টা পাবার পরে কাঁন্না করেছি অনেক।সাঁঝের কত কথা বলেছি রনক কে।

অামি বিকেল বেলা বারান্দায় বসে বিনুনি করছিলাম।অমনিসাঁঝের ফোন!

চমকে উঠেছিলাম।খুশিতে গদ গদ হয়ে ফোন ধরেছিলাম।

এমনকি সালাম টা দিতে পর্যন্ত ভুলে গিয়েছিলাম।

সাঁঝ প্রথমেই সালাম দিলো।

সালাম টা নিলাম ও হাসতে হাসতে।

তারপর লম্বা লম্বা কয়েকটা বাক্য!

সাঁঝের সেই ঠান্ডা গলার অাওয়াজ অামার শিড় দাঁড়া দিয়ে একটা শীতল স্রোত নামিয়ে দিল।

গলা শক্ত হয়ে অাসছিল চাপা কান্নায়।

কিন্তু যতক্ষণ ও লাইনে ছিল।কাঁদতে পারিনি!

 

এখন হঠাৎ বৃষ্টি থেমেছে।পৌঁছুতে অার বেশি দেরী নেই।সাঁঝকে জানিয়েছি অামি অাসছি।কিন্তু এবার ও অামাকে নিতে অাসবে না।

গন্তব্যের যত কাছাকাছি যাচ্ছি ততই সাঁঝের ফোনে সেই শীতল কন্ঠের উচ্চারন গুলো কানে বাজছিল!

অাচ্ছন্নের মত হয়ে অাছি।দৃষ্টি অনির্দিষ্ট সীমান্তে।কন্ঠ রুদ্ধ।অার চিন্তা শক্তি যেন অবস হয়ে অাসছে!

গাড়ি থেকে নামলাম মাত্র।এখন বৃষ্টি নেই।কিন্তু অাবহাওয়া বেশ অাদ্র।এসি বাস থেকে নামতেই চশমার কাঁচ ঝাপসা হয়ে অামার চিন্তার জগতের ওপর ক্ষণিকের জন্য একটা পর্দা টেনে দিল!

অামি যেন একটা বিরতি পেলাম।নিজেকে কিছুটা ধাতস্থ করেনিয়ে একটা খোলা রিক্সা ধরে রওনা দিলাম সাঁঝের বাড়ির দিকে।

.

বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কত কথা মনে পরে যাচ্ছে!অামি সেই বাড়িটাতেই অাবারও এসেছি যেখানে দাঅড়িয়ে অাছি যেখানে অামি অামার সব থেকে দুরন্ত বন্ধুটির সাথে অত্যন্ত প্রাণবন্ত কিছু সময় কাটিয়েছি।

ভাবতেই অবাক লাগছে এরকম একটা সময় উপস্থিত হয়েছে যেখানে অামি এসেছি সাঁঝের বিপদে ওকে সাহায্য করতে।তাও অাবার মেন্টাল সাপোর্ট!

সাঁঝ কে বলতাম বিয়ের পর ওর বাড়ি যাবো সানে ওর সংসার দেখতে।সেই সাধ কখনো পূরন হবে কিনা জানি না।

.

সিঁড়িয়ে দিয়ে উঠতে যেনো কোনো তাগিদ পাচ্ছি না। ক্রমশ যেনো সিঁড়ি গুলো অারো উঁচু হয়ে যাচ্ছে!

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অার মন চাইছেনা ভেতরে।

একটা কথাই মনে বাজছে!

অামি পারব তো সাঁঝের মুখোমুখি হতে?!

ভাবতে ভাবতেই দরজাটা খুলে গেলো।দরজা খুলেছে সাঁঝ।

সেই পরিচিত হাসি লেগে অাছে সাঁঝের ঠোটে।গভীর।রহস্যময়।

সব স্বাভাবিক অাছে এমন ভাবেই ও অামাদের অতিথিয়তা করল।

সব ফরমালিটি শেষ করে রনককে গেস্ট রুমে বসিয়ে অামি সাঁঞের ঘরে গেলাম।

সাঁঝ তখন কি একটা কাজ করছিল।

একটু হেসে অামায় বলল,

=বস্।

-হুম

এই ঘরে কত হুটোপুটি করেছি দুজনে।অাজও দুজন।অথচ ঘরটা যেন ছম ছম করছে।কারন এই দুজন হুবুহু অাগের দুজন নয়।

.

অামি অবাক গয়ে দেখছি মানুষটাকে!

অামি কিছুতেই ভাবতে পারছি না কেও কিভাবে এত মায়াবী একটা মেয়ের সাথে।

বিয়ের দিন কিংবা পরেও দু একবার সাক্ষাতে কিংবা ফোনে অালাপে কখনও কুঝতে পারিনি রজত সাহেব এতটা….।

এতটা কি?!নিচ!হীন!কপট!পিশাচ!নিষ্ঠুর!বর্বর!হৃদয়হীন!

অার কেনো খুঁজে পাচ্ছি না!

.

রজত সাহেব কোনো অংশে নিহালের মত নয়।বিন্দু মাত্র ভাল অংশ দূরে থাক!সে নিহালের পুরো উল্টো।

সাঁঝের বাবা।

অামাদের অাংকেল খুব ভাল মানুষ।

সাঁঝ বদরাগী লোকদের ভয় করত। সাথে ঘৃণাও।

অথচ এই রজত ছিল প্রচন্ড তীব্র রাগী!তার কোনো কাজে কখনো কোনো ত্রুচি করত না সাঁঝ।

সাঁঝ দস্যি হলেও কতটা সহনশীলা অার ধৈর্যবতী অামি জানি।কত বার ফেন করেছি।কখনও কোনো অভিযোগ করেনি।

অথচ সেই মানুষটা(সাঁঝ) জ্বরের ঘোরে দুটো কথা বলেছিল!

অার তার জন্য সাঁঝকে একলা ঘরে জ্কর অবস্থায় বন্দি করে রাখে টানা ২দিন!

যন্ত্রনা মাত্রাছাড়িয়ে গেলে পাশের সাঁঝ অগ্নিমূর্তি ধারন করে।

অতপর প্রস্থান করে সেই বিষাক্ত স্থান।

কিন্ত এখন কি করবে সাঁঝ?

.

সাঁঝ হাতের কাজ শেষ করে অামার পাশে এসে বসল।

একটু হাসল।অার অামি খেই হারিয়ে ফেললাম!

 

রজত কে নিহালের ব্যাপারে কখনওই খোলাখুলি ভাবো কথা বলার সুজোগ কিংবা পরিবেশ কোনোটাই সাঁঝ পায়নি।

পরিস্থিতি বুঝে,মানুষটা রাগী তাই সে কখনও কিছু বলেনি কাওকে।ক্রমশ নিজের মন কেই বুঝিয়েছে।পজেটিভ ভাবতে চেয়েছে।চেষ্টা করেছে প্রাণ পন।মানিয়ে নেয়ার জন্য।অনেকটা পেরে ছিল।

দাঁতে দাঁত চেপে দিন কাটছিল ওর।

হঠাৎ সাঁঝের কন্ঠে চমকে উঠলাম!

=জানিস তো,ত্রপা,কখনও ঠোঁট থেকে হাসি সরেনি অামার।

-কি করে পারতিস?

=ভুলে গেছিস অামার…..! (বাঁকা চোখে অামার দিকে তাকিয়ে কথাটা সম্পূর্ণ না বলেই,) অামি তো সব সময় যা সাথে থাকে,কাছে থাকে, মোট কথা যা পাই তাতে শুকরিয়া করে ভাল থাকতে চেষ্টা করি,করেছি।

বলতে বলতে অামার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল।..অার হ্যাঁ অবশ্যই এখনও করছি।

একটা স্বশব্দে দীর্ঘশ্বাস!

পুরো শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠেছে অামার!

=জানিস তো,অামার অাবার ডায়েরি লেখার ঝোঁক।সারা দিনের সব কাজ শেষে সাদা কালো কাগজ কালিতে অামি রামধনু খুঁজে পেতাম।তখন পুরো দিনের ক্লান্তি ঘুঁচে যেত!

-কেও কিছু বলত না?

=কেও দেখলে তো বকবে!লুকিয়ে।যখন কেও থাকত না তখন।

-ও!

=ধরা পড়লাম যেদিন,সেদিন….

ওকে মাঝ পথে থামিয়ে দিলাম অবিশ্বাস্য দৃষ্টি সমেত!

-ধরল কি করে?

অামার দিক ফিরে ওর ডাগর চোখ মেলে বলল ,

=শুনতেই হবে?

-না।

চোখ দিয়ে ঐ বিষয়টা নিয়ে অামার কল্পনার দ্বারে খিল দিয়ে দিল।তারপর নিজেই বলতে থাকল,

=সেটি পাবার পর পড়লেন।অামায় সামনে বসিয়ে।

-কি ছিল তাতে?

=অামার কেমন কি ভাল লাগে সেসব কথা।মানে নিহালকে যেসব দিয়ে গড়েছি সেসব।

ওর কথা গুলোর মধ্যে একটা শব্দে অামি অাটকে গেলাম।”গড়েছি”।অামি ভেবেছিলাম শব্দটা “গড়েছিলাম”হবে।অমনি অামি একটা বল পেলাম।

=কত ধোঁয়া!

-কিসের?

=ভাললাগা গুলো যখন পুড়িয়ে দিল ঝুল বারান্দায় সেই তার ধোঁয়া।

-এত সস্তা বুঝি তোর ভাল লাগা।যে নিমেষেই….

অামাকে শেষ করতে না দিয়ে,

=নাহ।তা কখনও হয় নাকি?ধোঁয়া গুলো চোখে লেগেছিল খুব।পানি পরেছে ক’ফোঁটা।ছাই গুলো অামি তুলে রেখেছি।সাবধানে।

ইশারায় একটা ঘসা কাঁচের বয়ামের দিকে ইঙ্গিত করল।সত্যি তাতে ছাই।কাগজের ছাই।

বলল,

=অামার লেখার কালি ছিল কালো।ঐ কালো ছাই গুলোরর মধ্যেই অাছে।কিচ্ছুটি হারায়নি।হা হা হা।

চোখ দুটো অাধা বোঁজা করে ওপরের পাটির দাঁত অাংশিক বেরিয়ে।এই হাসিটা অামার কাছে দৈব হাসি বোধ হয়!

অামিও মৃদু হেসে যোগ দিলাম।বাজে লোকটাকে তাচ্ছিল্য করবার উৎসবে।সোৎসাহে।

-হুম।

=তারপর অার ডাযেরি লিখিনাই।মনের ভেতরেই সব রাখতুম।

-বিয়ের অাগের মত?

= না। ঠিক অাগের মত বলা যায় না।কারন অাগে তো নিহালকে নিহালের মতন করে ভাবতাম।চলতাম।কখনো বাস্তবে নিহালের উল্টা কাওকে বয়ে বেড়াতে হয়নি।

-তাহলে?

=তখনকার টা ছিল শুধুই জমিয়ে রাখা।সেগুলোকে নিজের মতন বাড়তে দেয়া।অথচ তদারকি না করা।

-হুম!

=অামি ছাড়া পাব সেজন্যই বুঝি সেদিন জ্বর এসেছিল, জানিস!

-হু…

=জ্বর তো এলোই।সাথে দুর্বল শরীর।জ্বরের চোটে ভুল বকতে শুরু করেছিলাম।জ্ঞান ছিল।তাই অাবছা মনে পড়েছে কিছু পরে কি বলেছিলাম।

-কি?

=কি হতে পারে ধারনা কর।

-নিহাল!? নিহালের নাম বলেছিলি নাকি?

=না।

-তবে?

=শুধু বলেছিলাম, “একটু মাথায় হাতটা রাখলে….একটু কথা বলতে কি হয়?….কষ্ট হচ্ছে!কেও বুঝবে নাহ!”

-এটাই?

=হুম।

-যখন একা একা জ্বর ছেড়ে গেল, দেখলাম ঘরের দরজা বাইরে থেকে লক।ফোনটা অাছাড় খেয়ে ৫ টুকরা হয়ে পড়ে অাছে বাথরুমের মেঝেতে।ভেজা জায়গা।তাই ফোনটা অার চলেনি।

-তুই যে বলছিলি দুদিন?

=হ্যাঁ।দুদিন ই তো।একটা জগে পানি ছিল।অার কিছু না।

-মানে না খেয়ে?

=হুম।জ্বরের জন্য বেশির ভাগ সময় উঠতেই পারিনি।

-তারপর খুলে দিল?

=দুদিনে যখন তখন দরজায় ধুপ ধাপ বাড়ি দিত।বক বক করত।এটা সেটা বলত।উত্তর চাইত।এক দিন সাড়া পায়নি অনেক টা সময়।

-কেনো?

=বাহ রে!পাবে কি করে?অামি তো তখন বেহুঁস।অজ্ঞান।

-হায় খোদা!

=হাসপাতালে নিতে হয়েছিল।বাড়িতে মরলে দায় টা ওর হবে।সেই ভয়ে হাসপাতাল।সুজোগটা অামি নিলাম।

-কেমন?

=সুস্থ হবার অাগে কথা বলিনি একটাও।নার্স কে কাছে দেখে হঠাৎ কাতর স্বরে চিৎকার।নার্স এলো। সাথে ডক্টর।তারপর অামমি উঠে বসলাম।একা একা।

-তারপর?

=খুব শান্ত স্বরে বলতে থাকলাম অামার এই পরিনতির কারন।

-প্রতিবাদ করল না?

=সুযোগ দেইনি।

-হু!

=ডক্টরকে বললাম একটু তফাৎে গিয়ে দাঁড়াতে।তারপর রজত কে হাতের ইশারায় ডাতকলাম অার একটু কাছা কাছি অাসার জন্য।সেই প্রথম অামি তার চোখে দেখলাম ভয়।সত্যি বলতে সেটা দেখে অামার অানন্দি হচ্ছিল।বাধ্য ছেলের মত সুড় সুড় করে দুপা এগিয়ে এল।অামি বললাম……অাপনি কার সাথে যুদ্ধে নামতে চাইছিলেন?অামার কল্পনার সাথে?অাপনি উন্মাদ নন?মানুষের ভাল লাগা মন্দ লাগা মনের ব্যাপার।মনুষ্যত্বহীন কে মানুষ বলা হয় না। যায় না।অার মানুষের বুদ্ধি অাছে বিচার বিবেচনা করার।সেই বুদ্ধি দিয়ে সে ভাল খারাপের পার্থক্য করতে পারে।ভাল করে বাঁচতে গেলে ভাল নিয়ে ভাবতে হয়।অাপনি যেমন রোজ রোজ বিষাক্ত হয়ে উঠছেন।মন্দ কে অাপন করে,ভাল কে ভষ্ম করার প্রয়াস চালাচ্ছেন অার পিশাচ হিসেবে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে চাইছেন।মানুষের সঙ্গা যে জানেনা,সে কি করে জানবে সমঝোতা, কি করে বুঝবে অাবেগ,পরার্থপরতা এসব নেড়েচেড়ে কি করে অাত্মতৃপ্তি নিয়ে বাঁচতে হয়?

একটু দম নিয়ে ফের সাঁঝ বলল।

 

=বললাম,….কি অার বলব অাপনার কথা?থাক নাই বা বললাম।অামি তো মানুষ।অামার মন অাছে।মনুষত্ব অাছে।অামি কল্পনা করতে পারি।ভাল মন্দ বোঝার ক্ষমতা রাখি।অাবার সমঝোতা করে মানিয়ে চলতেও জানি।অার এত দিন শুধু সেটাই দেখেছেন।মনের খোঁজ পরেনি।তবু ঐ মনের জোরেই অামি টিকতে পেরেছি অাপনার সেই বিষাক্ত বাড়িটাতে।ফিরে এসেছি মৃত্যুপুরী থেকে।

-তারপর?

=বললাম,….অামি চলে যাচ্ছি।অামার বাড়িতে।অাপনার সাথে ফিরবনা অার।অাপনি চলে যান।ভাল থাকবেন।……তারপর তো চলে এলাম।

-হুম।

=যখন কেও নিজেকে মানুষ হিসেবে ভাবতে চায় তক্ষুনি জন্মনেয় স্বপ্নেরা।স্বপ্নেরা বেঁচে থাকে যত দিন সে নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাখতে চায়। এটা অামি জানতাম।কিন্তু এখন অারো একটা জিনিস জানি।কি জানিস?

-কি?

= স্বপ্নেরা শুধু বেঁচেই থাকে না।স্বপ্নেরা বাঁচিয়ে দেয়।বাঁচার অাশা জোগায়।

-মানুষ হিসেবে টিকিয়ে রাখে।

=একদম।

-শক্ত হতে শেখায়।

=বটে।তবু অাবেগ অনুভূতি গুলোকেও নাড়া দেয় নতুন করে।

সাঁঝ উঠে দাঁড়িয়ে একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলল।ওর চোখে একটা তৃপ্ত অাভা।ঠোঁটে অবাক মায়া!

সে যেন স্বয়ং এক বিষ্ময়!

বলল,

=চাঁদ উঠেছে।চল ছাদে।

-এখন?

=নয়দ কি?

হঠাৎ পুরানো সাঁঝের একটা ঝলক দেখতে পেলাম।সেই সাঁঝ যার হাজারও অাবদার মানতে হত।সেই সাঁঝ যার ডাগর চোখে তাকিয়ে কোনো কিছুকেই না করা যেত না।

-চল তবে।

=হুম।থাম চাবি টা নিই।

চাবির থোকাটা অামার সামনে একবার নাড়ালো।

ওদের ছাদে একটা ঘর অাছে।ঘরটা খোলাই থাকে।অনেকটা স্টোরের মত।কখনও ঢোকা হয়নি।

অামরা দুজনে রেলিং এর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।

সাঁঝ বলল,

=জানিস কো,একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি?

-কি সেটা?

=শোন, …….অামি অায়নার সামনে দাঁড়ালে যে প্রতিবিম্ব টা দেখা যায়,লোকে সেটা চেনে।অামি হিসেবে তাকে চেনে অামার কিছু বৈশিষ্ট্য সমেত।কিছু অাচার অাচরন সমেত।তবে অামি তো জানি ওতেই অামার পরিশেষ নয়।অামার পরিশিষ্টের বিরাট একটা অয়শ জুড়ে অাছে অামার নিজস্ব এক অামি। যেটার স্বল্পাংশই প্রকাশিত।অার অপ্রকাশিত অংশের বেশির ভাগ জুড়ে অাছে অামার কল্পনার জগৎ।….অার তুই তো জানিস।সেসব অবাস্তব কল্পনা নয় । বাস্তবের ভাল মন্দ বিচার করে মন মত তৈরী একটা রাজ্য।অামার কল্পরাজ্য।

-হুম।

=অার সেটা অদৃশ্য হতে পারে।তবে অস্তিত্ব হীন মোটেও নয়।…….অামি অনেক সয়েছি।অনেক মেনেছি।অনেক হয়েছে সমঝোতা।এবার অামি অামার মত করে একবার চেষ্টা করে দেখতে চাই। কারন অামাকে তো বাঁচতে হবে ! টিকে থাকতে হবে অামাকে।অামি মানুষ।

চাবিটা নিয়ে সেই চিলেকোঠার ঘরটার তালা খুলল।এবার বুঝতে পারলাম।

চাবি গোছা নাচানোর হেতু!হ্যাঁ।হালায় তো সব সময় দুটো চাবি থাকে।অাজ একটা তৃতীয় চাবি ছিল।এবং সেটাও চকচকে।নতুন!

এটা এই ঘরের চাবি।অার নতুন চাবি,মানে নতুন তালা দেবার কারন টা বুঝলাম ঘরের ভেতর টা দেখবার পর!

কিছু ঠিক ভাবে বোঝার অাগেই সাঁঝ বলল,

=অামি মন মত করে সাজিয়েছি।ঘরটা।অামি চাই অবয়বহীন অস্তিত্ব টা কে অামি অাকার দেব অারও প্রকট ভাবে।মনে।কাজে।অাচরনে।জীবনে।

-বেশ তো!

=অামি চাই নিজের বুদ্ধি, শক্তি দিয়ে চেষ্টা করে বাঁচতে।টিকতে।অামি তো মানুষ। অামাকে বাঁচতে হবে। টিকে থাকতে হবে।

-অামি জানি, তুই পারবি।

=না। ….ত্রপা,অামাকে পারতেই হবে। হবেই হবে।

-হুম।পারবিই তো।

.

.

বেশ কয়েক বছর পর…

.

সাঁঝের ছোট বাচ্চাদের স্কুল টা এখন বেশ জমজমাট। সকাল বিকেল ডজন খানেক ইচ্চি পিচ্চি কিচির মিচির করে।

ওদের সাঁঝ যেমন যত্ন করে শেখায়, ওরাও তেমন সাঁঝ কে চোভে হারায়!

দু একজন শুনেছি রোজ ছুটির সময় কান্না জুড়ে বাড়ি ফিরবেনা বলে।

চিলেকোঠার ঘরের কম্পিটিটারেরর মাধ্যমেই ও পুরো বিশ্বের খবরা খবর রাখে।

ওর চিলেকোঠার সেলফটাও ভরে গেছে, তাই গ্যারেজে এক্সটেনশন করা হয়েছে লাইব্রেরীটার।

রিথ্বি।অামার পিচ্চিটা।সেও সাঁঝ বলতে পাগল।

অাবার অাজ যাচ্ছি।সাঁঝের বাড়ি।এই রাস্তাটা ধরলেই শুধু ওর কথাই মাথায় অাসে। উফ!!

তবে এবেলা রিথ্বির সাথে সাঁঝের দেখা করা টা গৌন কারন।

মূখ্য কারন হচ্ছে একটা প্রস্তাব পেয়েছি ওর জন্য।এর অাগেও পেয়েছি।তবে এবারের টা অামার পরিচিত।অার অামার অাগ্রহের কারন,ছেলেটা,

সৎ,ভদ্র,স্বার্থপর নয়,অান্তরিক,বুদ্ধিমান,দাম্ভিক মোটেই নয়,অার বদরাগীর অাশে পাশেও নেই এবং সেন্সেবল ও বটে।

দেখা যাক অাল্লাহর কি ইচ্ছা।

.

 

ভাল থাকুক সাঁঝ। যত্নে থাকুক সাঁঝেদের স্বপ্নেরা। বেঁচে থাকুক কল্পনা। টিকে থাকুক কল্পরাজ্য!

Leave a Comment: