গাংচিল ও অন্যান্যের গল্প

 

রিপাকে সেই জন্মের পর থেকে নিজ সন্তানের মতো বড় করেছেন রাফির বাবা রফিক জোয়ার্দার। যিনি সম্পর্কে রিপার খালু। জন্মের সময় রিপার মা মারা যায়। মা মরা ছোট্ট মেয়ে কিভাবে মানুষ হবে পাটোয়ারী বাড়িতে ! অনেক ভেবে তাকে নিয়ে আসা হয় রাফিদের বাসায়। রাফির জন্ম হয়েছে রিপার জন্মের সাত দিন আগে। নিজের বোনের রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতিটুকুকে সব কিছু দিয়ে আগলে রেখেছিলেন মিসেস জোয়ার্দার। তিনি খুব আদর দিয়ে বড় করেন রিপাকে। রিপার বয়স যখন বারো। তখন রিপাকে তার বাবা রমিজ পাটোয়ারী নিয়ে আসেন তার বাসায়। সে সময় ভীষণ কষ্ট পান রাফির বাবা, মা। রাফি তো রীতি মতো কান্নাকাটি করতে শুরু করে। এতো বড় ছেলে- মেয়ে দুজনে। তবুও বিকেল গড়ালে পুতুল খেলা ছিলো এদের নিত্যদিনের কাজ। আরও কত স্মৃতি ! সব স্মৃতি আজ গড়াগড়া খাচ্ছে মনে। রিপার মা মারা যাবার পর আরেকটা বিয়ে করেন রফিক পাটোয়ারী। সৎ মা সহ্য করতে পারতো না রিপাকে। বেশ কয়েক বার মেরে ফেলতে চেয়েছিল। উপরওয়ালার কৃপায় বেঁচে গিয়েছে প্রতি বার। নানা রকম কষ্ট পাল্লা দিয়ে অতিক্রম করছিলো রিপার মনকে। এস.এস.সি পাশ করে শহরে চলে আসে রিপা। কলেজে ভর্তি হয়। কলেজের খরচ সহ অন্যান্য খরচের টাকাও ঠিক মতো দিতো না রিপার বাবা। রাফিদের সাথে যোগাযোগ ছিন্ন ছিল রিপা ও তার পরিবারের। সময়ের ব্যবধানে কেমন জানি বদলে গিয়েছিল রিপার বাবা। রিপাও কি কোন অংশে কম? সেও তো ভুলে গেছে সবাইকে। খেলার সাথী রাফিকে। রিপা বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী হওয়ায় বেশ কিছু বিষয়ে প্রাইভেট পড়তে হতো তাকে। রিপা তিনটা টিউশনি করাতো। সেই টাকা দিয়ে নিজে চলতো, নিজের প্রাইভেটের স্যারকে টাকা দিতো। সব মিলিয়ে সে যে কি করুণ সংগ্রামের গল্প! তা ভাবতেই অবাক লাগে। রতন নামের এক স্যার ছিলো রিপার। অনার্সে পড়তো। রিপাকে পদার্থ পড়াতো। রিপা যখন অন্য স্যারদের টাকা-পয়সা দিতে পারতো না। তখন রতন চুপ করে ওই স্যারদের টাকা দিয়ে দিতো। এমন কি সে মাঝে মাঝে রিপার মেসের ভাড়াও দিয়ে দিতো কৌশলে। একটা সময় ধরা পড়ে যায় ব্যাপারগুলি রিপার কাছে। সে পড়াশুনা শেষ না করেই বাবার কাছে চলে আসতে চায়। কিন্তু সেটা সে করতে পারে না। থেকে যায় শহরে। এসবের পর আর রতনের সাথে কোন যোগাযোগ রাখে নি রিপা। দেখতে দেখতে পেরিয়ে যায় ছয়টা বছর। ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছা নিঃশেষ হয়ে যায়। ইংরেজিতে অনার্স শেষ করে রিপা। এদিকে অনেক খঁুজে রিপাকে পেয়ে যান রমিজ পাটোয়ারী। মেয়েকে পেয়ে সে কি কান্না ! ‘এতোদিন কিভাবে ছিলি মা? কত খুঁজেছি তোকে ! তুই অভিমান করে চলে এসেছিলি। হয়তো তুই ভালই ছিলি। আমি খুব কষ্টে ছিলাম মা।’ এমনি নানা কথায় সহজ সরল মেয়েটার কঠিন মনটাকে মোমের মতো গলিয়ে ফেলেন রমিজ সাহেব। রিপা সব ভুলে গ্রামে ফিরে যায় বাবার সাথে। সেই গ্রাম। নানা স্মৃতি ছড়িয়ে আছে যেখানে। আজ কতটা সময় পেরিয়ে গেছে। পেরিয়ে গেছে কত পহেলা বৈশাখ ! প্রতি পহেলা বৈশাখে রাফির সাইকেলে চড়ে মেলায় যেতো রিপা। গাঁয়ের সেই পরিচিত পথটা ধরেই বাড়ি ফিরছে সে। আজ এতো দিন বাদে রাফির কথা মনে পড়ছে রিপার। দু’এক কথায় বাবার মুখেই শুনলো রাফি ডাক্তারী পড়ছে ঢাকা মেডিকেলে। এ বছরেই ডাক্তার হয়ে বের হবে রাফি। শুনে ভালোই লাগলো রিপার। কি কপাল রাফির ডাক্তার হয়েই গেলো ! রিপার ইচ্ছাটা কিছুটা হলেও পূরণ হতে যাচ্ছে রাফির মাধ্যমে। রিপার ইচ্ছা ছিল গ্রামের মানুষকে জন্য বিনা পয়সায় চিকিৎসা দিবে। সে সেটা না পারলেও রাফি ঠিক পারলো। এমনি নানা কথা ভাবতে ভাবতে চলে এলো বাড়ির সামনে। বাড়িটা আগের মতোই আছে। কিছুই পাল্টে নি। দেয়ালের সবুজ রংটা ঘোলাটে হয়ে গেছে শুধু। বাড়িতে নেমেই রিপা বাবাকে বললো, ‘মা কই বাবা?’ চুপ মেরে গেলেন রিপার বাবা। অনেকক্ষণ চুপ থাকলো রিপা ও তার বাবা। তারপর মুখ খুললেন রমিজ পাটোয়ারী। কান্নার স্বরে বললেন, ‘ তোর মা বেঁচে নেই।’ বলেই ছোট বাচ্চাদের মতো কাঁদতে শুরু করলেন। রিপা বাবাকে সান্ত্বনা দিলো। বাবা কান্না থামিয়ে রিপাকে বললেন, ‘মা আমাকে মাফ করে দে মা, আমি এতো দিন তোর কোন খোজ নিতে পারি নি। এতো দিন অন্ধকারে ছিলাম মা।’ রিপা বাবাকে জড়িয়ে কাঁদতে শুরু করে। ‘মা পৃথিবীতে নেই, আমি জানলাম না কেন? সৎ মা হউক, তবুও তো মা।’ ইত্যাদি আবেগ জড়ানো কথায় আর কান্নায় ভারি হয়ে গেল বাতাস। বিকেল গড়িয়ে এসেছে। বাবার ঘর থেকে আনুমানিক ছয় বছর বয়সের একটা ছোট মেয়ে বের হয়ে এলো। রিপাকে দেখে ‘আপু’ বলে ডেকে উঠলো। কাছে এসে জড়িয়ে ধরলো তাকে। ভারি মিষ্টি চেহারা। বাবা বলতে শুরু করলে, ‘পাঁচ বছর আগে তোর মা মারা গেছে। খুব জ্বর হইছিলো। অনেক চিকিৎসা করিয়েছি। মৃত্যু তাকে মুক্তি দেই নি। হ্যাঁ, উনি তোর সৎ মা ঠিকই। কিন্তু, মারার যাবার কিছুদিন আগে থেকে তোর জন্য ছটফট করতেন। বলতেন, ও তো আমার মেয়ে। আমি এতো দিন ভুল করেছি। যদি কখনো ওকে পাওয়া যায়। তাহলে ওকে বলিও ও যেনো আমাকে মাফ করে দেয়। আর এই মেয়েটা হচ্ছে রিতা। তোর ছোট বোন। আমি তোর একটা ছবি আমার ঘরের দেয়ালে ফ্রেমে করে রেখেছি। ওইটা দেখে হয়তো ও আন্দাজ করছে যে, তুই সে রিপা আপু। ওর ধারণা ভুল নয়।’ এমনিভাবে কিছুদিন কেটে গেলো। হঠাৎ একদিন সকালে অনেক মানুষের চিৎকারে ঘুম ভাঙলো রিপার। অনেক মানুষের ভিড়। ভিড় সরিয়ে কাছে গেলো রিপা। যাকে নিয়ে জটলাটা পেকেছে সে তো রতন ভাই। সেই রতন ভাই। বাবার কাছ থেকে জানতে পারলেন ছেলেটা নাকি ভোর রাত থেকে আমাদের বাড়িতে উকি দিচ্ছিলো। বাড়ির দারোয়ান ধরে ফেলেছে তাকে। রিপা বাবাকে কানে কানে কি যেনো বললো। সবাইকে চলে যেতে বললেন রমিজ পাটোয়ারী। স্তব্ধ চারপাশ। রিপা, রতন,রিতা আর রমিজ পাটোয়ারী দাঁড়িয়ে আছে উঠানে। রিপা রতনকে দেখিয়ে বাবাকে বললো, ‘বাবা, এই মানুষটা কে জানো? ইনি রতন ভাই। আমাকে প্রাইভেট পড়াতেন শহরে। কখনো কখনো বাসা ভাড়াটাও দিয়ে দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় বাবা, আমার অন্যান্য প্রাইভেট টিচারদের মাসের বেতনটাও অনেক সময় চুপ করে দিয়ে দিতেন।’ ‘এবার দয়া করে চুপ যাও।’ লজ্জাভরে কণ্ঠে বললো রতন। ‘অনেক খুজেছি তোমাকে। অনেক কষ্টে তোমার বাসার ঠিকানা পেয়েছি। তোমার সাথে আমি অনেক অন্যায় করে ফেলছি। তাই ক্ষমা চাইতে এসেছি।’ এতো ক্ষণে ওখান থেকে রিতাকে নিয়ে সরে গেছেন রমিজ পাটোয়ারী। ‘না, ক্ষমা তো করবো না আপনাকে। আমি তো ওই শহরেই ছিলাম। কেমনে খুজলেন যে আমাকে পেলেন না ?’ সকালের সূর্যটা ফর্সা হয়ে ওঠে। মিষ্টি রোদ পড়েছে উঠোনটায়। বাবা তার ঘর থেকে ডাকতে শুরু করলেন, ‘ কি রে মা ! বাইরে দাঁড়িয়েই কথা বলবি? ছেলেটাকে নিয়ে ভিতরে আয়।’ রিপা বাবার ঘরে নিয়ে গেলো রতনকে। দু’এক কথায় জানা গেলো তার মা বেঁচে নেই। কথাটা শুনে রিপাও কষ্ট পেলো। পড়াশুনা শেষ করে চাকুরি পেয়েছে একটা বেসরকারি ব্যাংকে। বিয়ে করেন নি। পাটোয়ারী বাড়িটা অনেক দিন পর আবার সগরম হয়ে উঠেছে। রিপা আসার পর এ বাড়িতে লোক ছিল পাঁচ জন। রিতা, রিপার বাবা, দারোয়ান চাচা ও তার বৌ। দারোয়ান চাচার বৌয়েই রান্না-বান্না করেন। রিতার দেখাশুনা করেন। হ্যাঁ, সেই অপূর্ণ সুখের নীড়ে এসে অতিথি হয়ে এসেছে রতন। এদিকে রাফির বাবাও কেমনে কেমনে খোজ পেয়ে যায়। রিপা ফিরে এসেছে। সেই পুরনো সাইকেলটা, যেটাতে চড়ে রাফি আর রিপা ঘুরে বেড়াতো পুরো গ্রাম। স্কুলে যেতো, মেলায় যেতো। রফিক জোয়ার্দারের আগের সেই চেহারা নেই। শুকিয়ে গেছেন অনেক। রিপা তাকে দেখে এগিয়ে গিয়ে সালাম দিলো। রিপাকে এতো দিন পরে দেখে চিনতে পেরেছেন তিনি। খুব ভাল লাগলো রিপার। এই মানুষটার কোলেই তো কতো রাত ঘুমিয়ে পড়েছিল রিপা। খালাকে কত জ্বালাতো রিপা। অনেক স্মৃতি ! রিপার বাবা ও রাফির বাবা দুজনেই কথা বলছেন। অনেক দিন পর এলেন এ বাড়িতে রফিক সাহেব। কথার ভিড়ে বললেন, ভাই আপনার মেয়েটাকে আমার রাফির জন্য দিবেন? রিতাকে নিয়ে গ্রাম ঘুরতে বেরিয়েছে রতন। রিপা পাশের ঘরেই ছিল। সে বাবার ঘরে ঢুকলো। তাকে দেখে মুরুব্বি দুজনেই চুপ হয়ে গেলেন। রিপা বাবার পাশে গিয়ে বসলো। “বাবা, আমি আর রাফি দুজনে খুব ভাল বন্ধু ছিলাম। আর তেমনটাই থাকতে চাই। আমাদের রাঙা শৈশবের স্মৃতিটুকু অটুট রাখতে চাই।” এ কথার পর আর কোন কথা থাকে না। রাফির বাবা বললেন, “মা, তুই যা চাস তাই হবে। তোরা যেমন আছিস তেমনি থাক।” সেদিন খাওয়া-দাওয়া করে বাড়িতে চলে গেলেন রফিক জোয়ার্দার। সন্ধ্যার আড্ডায় বসেছে রিপা,রিপার বাবা,রতন আর ছোট্ট রিতা। সেখানে অনেক কথা হচ্ছে, গল্প হচ্ছে। পরিবেশটা বেশ। রতন কিছুক্ষণ পর রিপার বাবাকে বললো, “আংকেল, আমি কাল সকালে চলে যাচ্ছি।” “না, না। আমি ভাইয়াকে যেতে দেবো না।” বলে কান্না শুরু করে রিতা। রিপা ওকে নিয়ে অন্য ঘরে চলে যায়। মনটা খারাপ হয়ে গেলো রিপার। রাতটা নির্ঘুম কাটে রিপার। ভোর হবার জেগে ওঠে রিপা। দরজা খুলেই রতন যে ঘরে ঘুমিয়ে ছিল সে ঘরের দিকে ছুটে গেলো। দরজা খোলা। অবাক হলো রিপা। দ্রুত ঘরে ঢুকলো। না কেউ নাই ঘরে। কই গেলো মানুষটা ! চলে গেলো? যাক, চলে গেলে কি আর করতে পারবে রিপা। জোর করে তো আর কাউকে আটকানো যায় না। জীবনের সাথে বাঁধা যায় না। রিপা না হয় গাংচিল হয়েই বেঁচে থাকবে পৃথিবীতে। সব পূর্ণতাই জীবনে সুখ দেয় না। কিছু অপূর্ণতার স্মৃতিও ভাল করে বাঁচতে শেখায় মানুষকে। রিপা না হয় তেমন করেই বাঁচবে।

About the Author আল-আমীন আপেল

শ্বাসের আশায় ছাড়ি নিঃশ্বাস..

follow me on:

Leave a Comment: