লাল বেলোয়ারের চুড়ি

 

ভোর রাত থেকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। বারান্দায় রকিং চেয়ারের ওপর গা এলিয়ে দিয়ে এক পলকে বৃষ্টি আর প্রকৃতির মেলামেশা দেখছে রণক। হয়তো নিজেও বৃষ্টি হয়ে প্রকৃতির সাথে মিশে যেতে চাইছে। বৃষ্টির কারণে সে আজ অফিস যেতে পারে নি। যদিও বৃষ্টির অজুহাতটা নেহাতই মুখে বলতে হয় তাই। এছাড়া দেবার মত যোগ্য কোন অজুহাত তার কাছে ছিল না। রণক কখনো অফিস কামাই করে না। এখনো ছ’মাস হয়নি সে প্রমোশন পেয়ে কোম্পানির চিফ একাউন্টেন্ট হয়েছে।অফিসের বস কাজের ক্ষেত্রে ভীষণ কড়া ধাঁচের লোক। কোন কাজে একটু গড়মিল হলেই চাকরি খাওয়ার হুমকি দিয়ে বসেন। এইতো গেল দুমাস আগেই বিয়ে করেছে রণক। বিয়ের পরদিন অবধি ছুটি দিয়েছিল তাকে তার বস। চাকরি বাঁচাতে বিয়ের দ্বিতীয় দিনই বাধ্য হয়ে নতুন বউকে ঘরে বসিয়ে রেখে অফিস করেছে সে। হাজার হোক চাকরিটা তো বাঁচাতে হবে তাকে। এখন আবার বিয়ে করেছে। ঘাড়ে নতুন সংসারের হাজারটা দায়িত্ব। চাকরি চলে গেলে চলবে কি করে!

 

আজও অফিস কামাই করার কোনপ্রকার কথা ছিল না তার। যদি না শেষ মুহূর্তে ঐ ঘটনাটা ঘটতো। ঘড়িতে তখন সকাল আটটা ছুঁই ছুঁই করছিল। হাতমুখ ধুয়ে কাপড় পরবে এমন সময় সামনে এসে দাঁড়ালো তার স্ত্রী লাবণ্য। লাবণ্য দেখতে ডানাকাটা পরীর থেকে কম কিছু নয়। চোখে মুখে যেন বিধাতা মায়ার প্রলেপ লেপে দিয়েছেন। খুব চটপটে স্বভাবের মেয়ে সে। বেশিক্ষণ এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকতে পারে না। এদিক থেকে রণক সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের মানুষ। একদম কথা কম বলা আর ধীরস্থির মানুষদের দলের লোক সে। তবে আগে এরকমটা ছিল না। একটা সময় বন্ধু বান্ধব কিংবা আত্মীয়া স্বজনদের আড্ডা একাই মাতিয়ে রাখার ক্ষমতা যে সে রাখতো, সেটা আজ তাকে দেখে কে বিশ্বাস করবে! নিজেকে চারদিক থেকে খুব শক্ত করে গুটিয়ে রেখেছে সে। যেখান থেকে হয়তো আর কখনোই বের হয়ে আসতে চায় না।

 

লাবণ্য পেছনে হাত লুকিয়ে রেখেছে। তার চোখ মুখ আনন্দে ঝকমক করছে। কারোর দিতে চাওয়া সারপ্রাইজ ধরে ফেললে যেমনটা অনুভূত হয়, লাবণ্যের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা সেরকম কিছু একটা। রণক বিছানার ওপর থেকে ইস্ত্রি করা শার্টটা হাতে নিতে নিতে জিজ্ঞাসা করলো, কি আছে তোমার হাতে?

লাবণ্য এবারে একটু মুচকি হেসে জবাব দিল, তুমিই বল কি হতে পারে!

রণক কিছু একটা ভাববার চেষ্টা করেও পারলো না। উত্তর দিল, আমি পারছি না তো। তুমিই বলে দাও।

 

লাবণ্য স্বামীর কথায় হাত দু’খানা সামনে এনে হালকা করে হাত ঝাঁকাতে লাগলো। তার হাত ভর্তি লাল বেলোয়ারের চুড়ি। হাত নাড়ানোতে সেই চুড়ির রিনঝিন শব্দে সারাটা ঘর যেন হেসে উঠলো একবারের জন্য। লাবণ্য মুচকি মুচকি হাসছে। চুড়িগুলো এক নজরেই চিনতে পারলো রণক। চিনবে নাই বা কেন! এগুলো যে তার প্রথম প্রেমের চিহ্ন। শেষ প্রেমের অস্তিত্ব। প্রথমে একটু আঁতকে উঠলেও খুব সহজভাবে নিজেকে সামলে নিল সে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই জিজ্ঞাসা করলো, চুড়িগুলো কোথায় পেলে, লাবণ্য?

 

– কোথায় আর পাবো বল! তোমার রিডিং টেবিলের ড্রয়ারটায় পেয়েছি।

– আমার ঐ ড্রয়ারটা তো সবসময় লক করা থাকে!

– হ্যাঁ, জানিতো। এতদিন সেটাই ভাবতাম কি এমন জাদুমন্ত্র আছে তোমার ঐ ড্রয়ারটায় যে এত ইম্পর্টেন্ট ইম্পর্টেন্ট জিনিস গুলো খোলা পড়ে থাকে, অথচ রিডিং টেবিলের সামান্য একটা ড্রয়ারটা সবসময় লক করা! তালার ওখানে চাবি ঝুলছিল। আর ড্রয়ারটাও খানিক খোলা ছিল। আমি লক করতে যাচ্ছিলাম এমন সময় লক্ষ্য করলাম যে, ড্রয়ারের ভেতরের এক সাইডে এই লাল চুড়িগুলো রাখা আছে।

– ও, তাই বল।

– তা স্যার নিজের বউয়ের জন্য এত সুন্দর চুড়িগুলো যখন এনেছিলেনই, তখন ড্রয়ারে লুকিয়ে না রেখে নিজ হাতে পরিয়ে দিলে বেশি ভাল হতো না কি?

 

এমন কথা শুনে চমকে উঠললো রণক। তার মানে লাবণ্য ধরে নিয়েছে যে, তাকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য লাল বেলোয়ারের চুড়িগুলো সে কিনে এনে লুকিয়ে রেখেছিল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠলো তার। এমনটা যে হতে পারে সেটা কখনোই ভাবেনি সে। আবারো স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে উত্তর দিল, আসলে আগামী শুক্রবার তোমায় নিয়ে ঘুরতে যাবো ভেবেছিলাম , তখনই চুড়িগুলো বের করে দেব ভেবেছিলাম। ভেবেছিলাম তুমি ভীষণ খুশি হবে। সে যাই হোক, সারপ্রাইজ দেয়া না হোক, তোমার জন্য আনা জিনিস তোমার হাতেই গিয়ে পড়েছে। চুড়িগুলো ঠিক যেন তোমার হাতে পড়ার জন্যই বানানো হয়েছে। ভীষণ মানিয়েছেও তোমার হাতে। রণকের কথা শেষ হতেই তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো লাবণ্য। নিজেকে তার এই মুহূর্তে সব চাইতে সুখী একজন নারী অনুভূত হচ্ছে। রণকও তার স্ত্রীকে জড়িয়ে নিল নিজের অজান্তেই। এখন আর যে সে নিজের মাঝে নেই। অসীমে হারিয়ে গেছে বাস্তবতার জাল ভেদ করে।

 

আজ আর সে অফিসে যাবে না বলে, আর বৃষ্টির দিনে ভূনা খিচুড়ি খাবে বলে লাবণ্যকে রান্না করতে পাঠালো। হাতে থাকা ইস্ত্রি করা শার্টটা বিছানায় রেখে গিয়ে রকিং চেয়ারটায় বসে পড়লো। ভাবতে লাগলো ভাগ্যের পরিহাসের কথা। আজ থেকে বছর চারেক আগের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স কমপ্লিট করে বের হয়েছে সে। নন্দিনী নামের একটি অসম্ভব সুন্দরী মেয়ের সাথে তার ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল। নন্দিনীর চোখের পলকে পলকে সে বারবার হারিয়ে ফেলতো নিজেকে। নন্দিনীও রণককে অসম্ভব ভালোবাসতো। দুজন একই সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষ করে লক্ষ্য হিসেবে ঠিক করেছিল, নিজের পায়ে দাঁড়াবার। এরপর একটু গুছিয়ে নিয়ে বাঁধতে চেয়েছিল ভালোবাসার ঘর। কিন্তু নন্দিনীর পরিবার তাদের সম্পর্কটাকে মেনে নেয়নি। কারণ, তারা ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। অন্যদিকে রণক মুসলমান পরিবারের ছেলে। জোর করে নন্দিনীর অমতে তার পরিবার একবার নিজেদের পছন্দমত ছেলের সাথে নন্দিনীর বিয়েও ঠিক করেছিলেন। কিন্তু রণক অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সেই বিয়ে শেষমেশ ভেঙে দিয়েছিল। এরপর রণক বারবার অনুরোধ করায় তারা নন্দিনীর সাথে রণকের সম্পর্কটা মেনে নিয়েছিলেন। কথা দিয়েছিলেন, রণক চাকরি জোগাড় করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পর নন্দিনীর সাথে বিয়ে দিতে তাদের কোন আপত্তি থাকবে না। রেজাল্ট ভাল হওয়ায় অল্পদিনের মাথাতেই ভালো একটা চাকরি জোগাড় করে ফেলে রণক। চাকরিতে জয়েন করার কিছুদিন পর অফিস থেকে ইন্ডিয়ার গুজরাটে একটা কাজে যেতে হয় তাকে। নন্দিনীর বাবা জানান, ইন্ডিয়া থেকে ফেরার পরই তারা নন্দিনী আর রণকের বিয়ে দিয়ে দেবেন। নিশ্চিন্ত মনে ইন্ডিয়ার গুজরাটে গিয়েছিল সে। আর দেশে ফেরার পরই যেহেতু বিয়ে, ফেরার সময় নন্দিনীর জন্য খুব শখ করে লাল বেলোয়ারের এই চুড়িগুলো কিনে এনেছিল। নন্দিনীর স্বপ্ন ছিল সে লাল টকটকে একটা বেনারসি আর হাতে লাল কাঁচের চুড়ি পরে বিয়ের আসনে রণকের পাশে বসবে। কিন্তু দেশে ফিরেই রণকের প্রতিটা স্বপ্ন চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যায়। ইন্ডিয়ায় যাওয়ার পর নন্দিনীর বাবা তাকে জোড় করে তাদের পছন্দের অন্য এক ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। আর বিয়ের রাতে নন্দিনী বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। নন্দিনীর মৃত্যুর খবর শুনে রণক ছুটে গিয়েছিল তাদের বাড়ি। নন্দিনীর বাবা তাকে বাড়িতে ঢুকতে পর্যন্ত দেয়নি। কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারছিল না রণক। চাকরি বাকরি ছেড়ে দিয়ে কেমন পাগল পাগল হয়ে যাচ্ছিল ক্রমাগত। নন্দিনীকে ছাড়া যে তার এ পৃথিবীতে বাঁচার কথা ছিল না।

 

এমনই একদিন একজন ভদ্রলোক দেখা করতে আসলেন রণকের সাথে। পরিচয়ে জানালেন যে, তিনি নন্দিনীর স্বামী। আসলে আত্মহত্যার আগে নন্দিনী রণকের জন্য শেষ একটা চিঠি লিখে রেখে গিয়েছিল। সেটা পৌঁছে দিতেই তার স্বামী রণকের কাছে এসেছেন। চিঠিতে নন্দিনী রণককে তাকে না পাওয়ার যন্ত্রণায় হারিয়ে না যাওয়ার অনুরোধ করে গেছে। তার শেষ ইচ্ছা সে চিঠিতে লিখে রেখে গেছে। রণক যেন সুন্দরভাবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকে, সেটাই ভালোবাসার দোহাই দিয়ে রণকের কাছে দাবি করে গেছে নন্দিনী। ভালোবাসার মর্যাদা দিতে রণকও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চেষ্টা করে এরপর। ধীরে ধীরে সে নন্দিনীর শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে সক্ষমতা লাভ করে। নতুন করে স্বাভাবিক জীবন, জীবনের নিয়মে সংসারও শুরু করেছে আজ সে। কিন্তু মনের গহীনে কোথাও আজও নন্দিনীকে হারানোর ব্যাথাটা ঘাপটি মেরে বসে আছে। সে আজও নন্দিনীকে ভালোবাসে, আর এ ভালোবাসা কোনদিন ফুরাবার নয়। ভাগ্যের কি পরিহাস! সেই নন্দিনীর জন্য কিনে আনা লাল বেলোয়ারের চুড়িগুলো নন্দিনী কখনোই ছুঁয়ে দেখতে পারেনি। সেগুলো এতদিন তার কাছেই ভালোবাসার অস্তিত্ব হিসেবে লুকানো ছিল, যেমনটা তার মনের ভেতর লুকানো আছে নন্দিনীর জন্য অসংখ্য অব্যক্ত ভালোবাসা। আর আজ বাস্তবতার জের ধরে সেই চুড়িগুলো লাবণ্যর হাতে। সে ভাবছে তার স্বামী ভালোবেসে তার জন্য সেই চুড়িগুলো কিনে এনেছে। অথচ একবারের জন্যও রণক মুখ ফুটে লাবণ্যকে বলতে পারছে না চুড়িগুলোর কথা। নন্দিনীর কথা। এবং নন্দিনীর জন্য আজও তার মনে জমে থাকা ভালোবাসার কথা। কি করে বলবে সে! লাবণ্য তাকে ভীষণ ভালোবাসে। এসব শুনে সে খুব কষ্ট পাবে। রণক খুব ভালো ভাবেই সেটা বুঝতে পারে। বিয়ের পর থেকে তার লাবণ্যকে তেমন কিছু উপহারও দেয়া হয়নি। তার জন্য আনা উপহার ভেবে সে কত খুশি হয়েছিল! এত অল্পতেই যে কেউ এতাটা খুশি হতে পারে তার প্রমাণ সে আজ পেল। চোখে মুখে স্পষ্ট আনন্দের ঝলকানি দেখা যাচ্ছিল লাবণ্যর। এখন সত্যটা জানতে পারলে সে সত্যিই খুব কষ্ট পাবে ভেতরে ভেতরে। তারচে বরং থাকুক সে কথাগুলো। বাস্তবতার প্রভাবে হারিয়ে যাক সেসব ভেতরে আবদ্ধ থাকা প্রতিটা কথা।

 

বারান্দায় রণকের পাশে এসে দাঁড়ালো লাবণ্য। এরইমধ্যে সে রণকের জন্য ভূনা খিচুড়ি রান্না করে ফেলেছে। এতক্ষণে রণক লাবণ্যের উপস্থিতি টের পেল। জিজ্ঞাসা করলো, খাবার তৈরি হয়ে গেছে এরই মধ্যে?

 

– হ্যাঁ, জলদি চল। না হলে ঠান্ডা হয়ে যাবে।

আস্তে করে লাবণ্যর হাতটা ধরলো রণক। রকিং চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, এর আগে দু’মিনিট দুজন পাশাপাশি হাত ধরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখলে মন্দ হয় কি?

 

লাবণ্য কোনকিছু জবাব দিল না। শুধু শক্ত করে রণকের হাতটা ধরে অপলক ধারায় ঝরা বৃষ্টি দেখতে লাগলো। আজ যেন সে এক অন্য রণককে উপলব্ধি করছে। রণকও লাবণ্যের জবাবের অপেক্ষা করে নেই। সে এখন

অসাধারণ মায়াবতী একজন নারীর হাত ধরে দু’মিনিট অবিরাম ধারায় ঝরা বৃষ্টি দেখতে ব্যস্ত।

About the Author মুনতাসির সিয়াম

মুনতাসির সিয়াম। আমার নামটাই বিশেষণের বিশেষণ। এর পর আর কিছু যোগ করার প্রয়োজন পড়ে না।

follow me on:

Leave a Comment: