আর্তনাদ

 

উত্তরবঙ্গে বর্ডারের কাছাকাছি বিস্তীর্ণ মাঠ।মেঠে পথটি বেকে গেছে।মানুষ চলাচলের কারনে রাস্তার মাঝখানে স্বল্প একটু জায়গার ঘাস মরে গিয়ে মাটি বের হয়েছে এবং রাস্তার মাঝদিয়ে নালীর মতো চলে গেছে রাস্তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে।দুপাশের ঘাসগুলো বর্ষায় বেশ জেগে ওঠে। কার্পেটের মতো করে আবৃত করে রাখে মাটিকে।শরৎতের সকালে শিশীর কনা জমে থাকে ঘাসগুলোর উপর। মৃদু আভা এসে পড়লে হীরের মতো চকচক করে উঠে।কেউ কেউ খালি পায়ে এসে আলতো করে এসে পরশ নেয়।একটু ঠান্ডা ঠান্ডা লাগে শরীর হীম হয়ে আসে।অজানা শান্তিতে ভরে ওঠে মন।সূর্যের কিরন আর একটু বেড়ে গেলে ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলো ঝাকবেধে স্কুলে কিংবা মাদরাসায় যায়।কেউ পড়ে প্রাইমারীতে শিশুশ্রেনী কেউ ব্রাক প্রি-প্রাইমারী কেউবা ইসলামিক ফাউন্ডেশন এ।দু একজন আছে যারা দূরে কিল্ডারগার্ডেনে প্লে কিংবা নার্সারিতে পড়ে।আহা! তাদের মাঝে কি সখ্যতা।কচি কচি মুখের কোলাহল শুনধে বেশ মধুর। ইচ্ছা করে তাদের মধুর ধ্বনিগুলো চোখ বুঝে শুনি।যদিও হৈচৈ ভালোলাগেনা তবে এই বিষয়টা কেন জানি গভীর থেকেই ভালো লাগে।তাদের মাঝে ঝগড়া হয় না এমন কোন কথা নেই।যে কোন বিষয় নিয়ে ঝগড়া বাধবে শেষ পর্যন্ত বিচার গড়াবে তাদের মায়ের কাছে।একটু কড়া শাষন হবে তারপর ভুলে  যাবে সব।মনে থাকবে মনে কোন রাগ কিংবা অভিমান।ছোটরা এসব নিয়ে ব্যাস্ত থাকলেও যখন একটু বড় হয় তখন জীবনটাকে বুঝতে শিখে।মাঠে মাঠে কৃষকদের হাড় ভাঙ্গা খাটুনি খাটার পর ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ীতে ফিরে।ক্লান্তীর ভার পেরিয়ে দেহটা ছড়িয়ে দেয় আঠালে।আবার পূর্ণদমে পরের দিন এভাবে চলতে থাকে দিনের পরে দিন।

 

সখীপুর, পল্লববঘন পাড়াগাঁ, পল্লী হতেও পল্লীর অভ্যন্তরে। আম,জাম,কাঠাল,লিচুর প্রাচুর্য।ছফর মিয়ার সুখের সংসার।একটি চৌচালা টিনের ঘর আর একটি খড়ের চালা নিয়ে সর্গবে দাড়িয়ে ঝকঝকে পাঠকাঠি গুলো বেড়া হিসেবে দূর থেকে বাড়ীর পরিচয়কে অর্থবহকরে তুলেছে।

এখানে ছফর মিয়ার বাপের ভিটা তাই নিজেও পিতার নিজের গড়া ভিটাটিতেই থেকে গেছে।বাড়ীর সামনে একটি ছোট্ট উঠান তারও ওপাশে বাতাবি লেবুর গাছ।জলপাই কামরাঙা গাছের কয়েকটা সারি আছে।একটু দূরে ছোট একটা পুকুর।পানি ঘোলাটে।চারদিকে বুনোলতা ছেয়ে গেছে।অনেক বছর ধরে সংস্কারের অভাবে গভীরতা কমে গেছে।বাড়ীর পেছনে গভীর হওয়া বাঁশবাগানের নিবীর ছায়ায় আলয় যেন মাতৃআলয় হয়ে উঠেছে।শুধু ছফর মিয়ারই না এখানকার বেশিরভাগ বাড়ী গড়ে তোলার সময় উত্তর-পশ্চিম কোনে বাঁশবাগান চিরায়ত প্রথার মতো।এর পেছনে কারন খুজলেই পাওয়া যায় বৈশাখী ঝড়ের তান্ডবতার কথা।কালবৈশাখী ঝড় মূলত ঐ কোন দিয়েই আঘাত হানে। আর বাঁশবাগানেই এই তান্ডবতার হাত থেকে রক্ষা করার মোক্ষম হাতিয়ার।সেকথা থাক গৃহস্থালি কাজে কিবা কম ব্যবহার বাঁশের।ঝাড়ু, ডালি,কুলা,ঘরের খুটি,চাঙ্গারি,বেড়া, চালুনি,নির্মাণের খুটি,কাগজ সহ অসখ্য কাজে ব্যবহৃত হয় বাঁশ ।তাই এই চিরায়ত প্রথাটি কেউ    সংস্কারের নামে ভেঙ্গে ফেলতে চায়না।

পাঁচ ছেলেমেয়ের সংসার ছফর মিয়ার।এক মেয়ে চার ছেলে।বাবার কাছ থেকে কিছু জমিজামা পেয়েছে সে।বাকিটা করেছে নিজের পরিশ্রমে।ছোটবেলা থেকে কঠোর পরিশ্রমে অভ্যস্ত।সারাদিন কাজ শেষে রাতের আকাশে পূর্নশশী যখন জেগে উঠে গোটা পৃথিবী যখন একটু প্রশান্তির খোজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তখনো থামে না ছফর মিয়ার কঠোর সাধনা।সাধনা করে শক্ত মাটির বুকে কঠোর হাতে লাঙ্গল ধরে জোসনার আলোয় গরু দুটোর সাথে  কথা বলে, মাঝে মাঝে বলে হাঠ হাঠ হাঠ উঠ উঠ উঠ হ হ হ বইস বইস বইস এ এক আজব রপ্ত করা ভাষা এ ভাষার উৎপত্তি কোথায় কে এর স্রষ্টা তা এরা কেউ জানে না।আজ যে বলে সে শুনেছে বাপ দাদাদের কাছ থেকে তার বাপদাদা শুনেছে তালও বাপদাদাদের কাছ থেকে।এভাবে কতকাল ধরে চলে আসছে এভাষা।এভাষার অর্থ শুধু ছফর মিয়ার মতো কৃষকরাই বুজে না গরুগুলোও একদম পারদর্শী প্রতিটি ভাষারই সঠিক জবাব দেয় ওরা ওদের হাটা চলার মাধ্যমে।গভীর রাত পর্যন্ত চলে জমি চাষ তারপর গরু দুটিকে গোয়ালে বেধে যত্ন করে খাবার দিয়ে নিজে ঘুমিয়ে পড়ে।যখন দূর মসজিদে মুয়াজ্জিনের কন্ঠে ধ্বনিত হয় মধুর আজান।বিছানা ছেড়ে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করে মাঠপানে হাটতে থাকে ঘারে কোদাল নিয়ে। আকাশ দেখতে দেখতে ফর্সা হয়ে আসে পাখিরা কিচির মিচির করে দিগন্তের ওপাশে লাল সূর্য ভেসে ওঠে  হৃদয়কে ভরে তুলে প্রশান্তির পরশে।

ওলি বেগম ছফর মিয়ার স্ত্রী।সারাক্ষণ এটা সেটা করে যেটুকু সময় পায় স্বামীর সাথে মাঠে কাজ করে কাটিয়ে দেয়।তুলি বড় মেয়ে বয়ষ তের বছর চলছে এর মাঝেই বেশ বাড়ন্ত হয়ে উঠেছে।তাই পিতামাতার মাথায় মেয়ের বিয়া দেওয়ার চিন্তাও ঘুরপাক খাচ্ছে।এরই মাঝে সমাজের মুরব্বিদের চোখে পড়তে শুরু করছে। কয়েকজন জিজ্ঞাসাও করেছে কবে মেয়ের বিয়ে দিবে। তাই খুব বেশী একটা দেরি করতে চায়না ।তুলি গ্রামের স্কুলে সপ্তম শ্রেনীতে পড়ে। পড়াশুনাতে সে বেশ ভাল তাই মুজাহিদ মাস্টার(তুলির শিক্ষক)তুলিকে পড়াশুনা করানোর পরামর্শ দিয়েছিল কিন্তু এ ব্যাপারে ছফর মিয়ার প্রত্তুর ছিল “হামা গরিব মানুষ বেটি ছোয়াক পড়াশুনা করে কি করিম ?আর মুই অতুলা টাকা কোটে পাইম।” কম বয়সে বিয়া দিলে অপেক্ষাকৃত যৌতুকের হার কম লাগবে। আর যৌতুক ছাড়া বিয়ে এ সমাজে  কল্পনাই করতে পারে না।যৌতুক যে অপরাধ সেটা তারা জানে না কিভাবে জানবে সেটা তাদের কাছে একটা চিরন্তন সত্য বানিতে পরিনত হয়েছে।মেয়ে জন্ম দিলে যৌতুকের টাকা  জোগার করে মেয়েকে বিয়ে দিতে হবে এটাই প্রচলিত নীতি।এদিকে পাকু ঘটক প্রতিদিন সমন্ধ নিয়ে আসছে ওমুক গ্রামের অমুকের ছেলে দেখতে একদম সাহেবের মতো মেয়ের সাথে ভালই মানাবে আরও কত কি বলে  ছফর মিয়ার মনটা একটু হালকা করতেছে।কিন্তু যৌতুকটা একটু বেশী লাগবে তা কম হলেও এক লক্ষ পঞ্চাশ  হাজারের কম না।মুহূর্তে মধ্যে মুখ কালো হয়ে ওঠে এত টাকা সে কোথায় পাইবে।সেও চায় মেয়েটা একটা ভাল বাড়িতে থাকুক একটা ভাল স্বামি পাক।কিন্তু টাকার অঙ্কটা যখন বৃত্তকে অতিক্রম করে তখন আর কিছু করার থাকে না।

 

বোরো মৌসুম চলছে।বিলে যে সামান্য জমি আছে তাতে ধান আর ডাঙ্গার জমিগুলোতে মরিচ,ভূট্টা লাগিয়েছে ।ফলনও বেশ ভাল হয়েছে।প্রচন্ড রোদের মাঝে ভূট্টার সোনালি বর্নের কবগুলো সোনার রংয়ের চেয়েও উজ্জল দ্যুতি ছড়াচ্ছে।দশ বছরের ছেলে মাঠুকে সাথে নিয়ে বাকুয়াতে ভার করে করে এনে উঠনে জমা করছে।ওলি বেগম আর তুলি সেগুলোর খোসা ছাড়িয়ে সোনালি বর্নের স্তুপটি বড় করেই চলছে।ছোট ছোট ছেলে তিনটির এগুলোতে মনযোগ নেই ওরা ব্যস্ত আইসক্রিম খাওয়া নিয়ে। ধান, চাল ভূট্টা যা পাচ্ছে তা নিয়ে গিয়েই আইসক্রিম ওয়ালাকে দিয়ে আইসক্রিম নিচ্ছে আর সেগুলো নিয়ে কলহ বাধাচ্ছে।যারা গ্রামে যাননি কিংবা গ্রামে থাকেন নি তারা হয়ত ভাবছেন যে আইসক্রিম তো টাকা দিয়ে বিক্রি হয় ।আপনাদের বলি গ্রামে এটা হয় এবং হয়ে থাকে শুধু আইসক্রিম না এখানে বধূদের সাজগোজের উপপকরন থেকে শুরু করে ছোটবাচ্চাদের হরেক মাল সবকিছু ধান, চাল ভূট্টা কিংবা ডিমের বিনিময়ে কেনা যায়।সব রকমের ফেরিওয়ালার সাথে  ওসব বহন করার ব্যবস্থা থাকে।যাহোক ওদিকে নিজের ঘামেভেজা শরিরের দিকে নজর দিয়ে আর  ছোট্ট তিন ভাইয়ের ভাগাভাগি নিয়ে অযথা হৈচৈ দেখে তিনটারই গালে কষে চড় মাড়তে ইচ্ছা করে মাঠুর কিন্তু মারে না।পরে আবার মায়ের বকুনি খেতে হয় তাই কিন্তু কটমট করে ওদের দিকে তাকাতে ছাড়দেয় না মাঠু। ওদিকে পিচ্চিগুলো জিব বের করে মাঠুকে দেখায়। ক্রোধে রাগ কয়েগুন বেরে যায়।শেষ পর্যন্ত সামলে নেয় নিজেকে।মাঠু নামের পিছনেও রয়েছে ক্ষুদ্র  ইতিহাস।তৃতীয় শ্রেনীর পর আর স্কুলে যায় না মাঠু। কত প্রহার কত গালিগালাজ তবু একটু লাভও হয়নি।ও কিনা বলে স্কুলে স্যারেরা ওদের মারে।বড়লোকদের ছেলেদের আদর করে। ওদের বাবামার সাথে স্যারদের কত ভাব।তাই স্কুলে যেতে ভালো লাগে না।মাঠে মাঠে ঘুরতে ভাল লাগে।গরু কিংবা ছাগল চড়াতে আনন্দ পায়। মাঠেই যেহেতু কাছে টানে তাই তখন থেকে সবাই মাঠু বলেই ডাকে।ভূট্টা শেষে ধান আসে।সোনালি ধানগুলো কেটে ঘরে তুলা হয়ে যায়।এবারে ফসল বেশ ভালই হয়েছিল তাই বেশ কিছু টাকা জমেছে ছফর মিয়ার।গ্রামের সবাই ধরে নিয়েছে এবার মেয়ের বিয়া দিবে ছফর।এদিকে প্রতিদিন তুলিকে নানা ভাবে উত্তক্ত করতে শরু করেছে রহেত। সে তুলির দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই।ঘটক ধরে তুলির বাবার কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে ।পাত্রিপক্ষের মতামতের অপেক্ষায় রয়েছে তারা। ছফর মিয়া ও ওলি বেগমের মাঝে কথা হয়। মাঠুর মা ও মাঠুর মা,শুনছো  তুলির জন্য পাত্র হিসেবে রশীদ কেমন হয়, পাকু ঘটকের জ্বালায় তো আর বাড়ীর বাইরে যাওয়াই যায় না। হ্যা রশীদ দেখতে শুনতে ভাল বাপের জমি জায়গাও আছে তেমন মন্দ হয় না।কিন্তু ওর কথাগুলো কেমন একটু লাগে যেন ওলি বেগমের।যাহোক মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য ওর চেয়ে ভালো পাত্র পাওয়াটা মুশকিল।

 

ঘটক আসে কথা হয় প্রায় সব ঠিক আছে শুধু ঠিক নেই যৌতুকের অঙ্কটা।মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে অর্থ কয়েক বছর ধরে সঞ্চয় করেছে তার চেয়ে কয়েকগুন বেশী যৌতুকের অংক।একটু হতাশা জাগে তার পর মনে মনে ভাবে বাবা হিসেবে মেয়ের জন্য যদি এটুকু করতে না পারি তবে পিতৃত্বের গর্ব কোথায়?অবশেষে বিয়ে ঠিক করতে এসে অনেক তর্ক বিতর্কের মাধ্যমে একলক্ষ টাকা আর একটা সাদাকালো টিভি ফনিক্স সাইকেল যৌতুক হিসেবে নির্ধারিত হয়। তবে নগদে টিভি সাইকেল আর ষাট হাজার টাকা দিতে হবে বাকিটা যখন পারবে দিবে কথাটি এমনই ছিল।

 

সামনের বৃহস্পতিবার তুলির বিয়ে।রঙ্গীন জীবনের স্বপ্নগুলো হারিয়ে যাচ্ছে জীবন থেকে  যে মেয়ে হাসিখেলে পার করছে জীবন বাস্তবতা সম্পর্কে যার এখনো পুরোপুরিভাবে জ্ঞানলাভ হয় নি যে স্কুল জীবনের গন্ডি পেরোতো পারে নি তার বিয়ে।নিজের স্বপ্নগুলো হয়ত আর কোনোদিনও পূরন হবে না তুলির।তাই মনটা একটু ভার ছিল তার কিন্তু কে খেয়াল রাখতে যাবে ।সবাই তো ব্যস্ত বিয়ে নিয়ে হুম বিয়ে তুলির বিয়ে।

 

বিয়ে উপলক্ষে বেশ ধুমধাম চলছে। সাথে চলছে টাকা যোগারের সংগ্রাম।হালের দুটো গরুর একটিকে বিক্রি করতে কষ্ট হচ্ছিল কিন্তু তারপরেও করতে হলো ।আর একটিকে কোনোদিও বিক্রি করবে না।কারন ওটাও পরিবারের সদস্য।ওই গরুটির জন্মের কয়েকঘন্টার মধ্যই ওর মা মারা যায় তাই নিজের সন্তানের মতো যত্ন করে বড় করতে হয়েছে ।ওই গরুটার প্রতি আলাদা রকমের এক ভালোবাসা জন্মেছে।কিছুটাকা ঋন করতে হলেও ধুমধাম করে বিয়ে দিলো মেয়ের।প্রথম প্রথম বেশ ভালই কাটছিল ।তারপর একদিন  রহেত তুলিকে নিয়ে এসে শ্বশুরের কাছে যৌতুকের বাকি টাকা চেয়ে বসে।ছফর মিয়া বলেছিল দেখ বাবা বিয়ের সময় আমার যে ঋন হয়েছে সেগুলোই এখনো শুধতে পারি নি। তাছাড়া এমন হঠাৎ করে দাবী তোলার কথাও ছিল না। এই ছেলেপুলে গুলোকে একটু ভালোমন্দ খাওয়ানোর সামর্থ পর্যন্ত এখন আমার নেই এতো টাকা কোথায় পাবো বলো?সামনের মৌসুম আসলেই সব শোধ করে দিবো।সেদিনেই শ্বশুরের সাথে ঝগড়া করে তুলিকে নিয়ে যায় রহেত। তার পর শুরু হয় অমানসিক নির্যাতন।আসলে ও নেশা করত পাড়ার বখাটেদের সাথে বেস ভালো সম্পর্ক।নেশায় বিকার হয়ে প্রচুর মারধোর করত তুলিকে।কেউ ছাড়িয়ে নিতে আসলে তাদেরকেও রেহাই দিতো না।তাই সহজে কেউ আসতে চাইত না।শীর্নকায় দেহ নিয়ে তুলির শ্বশুর ছেলের উদ্দশ্যে শাষনবাক্য ব্যয় করত কিন্তু তা হিমালয়ের বুকে একটা সাবলের ঘুতোর মতো মনে হতো।তুলির শ্বাশুরি আস্ফালন করত।মেয়েটা পোয়াতী হয়েছে গর্ভে সন্তান এসেছে ওরে পাষান্ড মারিস না।কিন্তু বিকার মস্তিষ্কে তা পৌছায় না সহজে।ছোট্ট মেয়েটি সবকিছু নিরবে সয়ে যেত প্রতিবাদ করার মতো সাহস তার হয় নি।শুধু নিরবে গোপনে চোখের জল ঝরাতো। কেউ যদি দেখে ফেলত তাহলে বলত বাপের বাড়ীর কথা মনে পড়েছে।স্বামীগৃগের সবাই ভালো বাসলেও নেশাগ্রস্ত স্বামী টাকার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।নেশার জন্য চাই টাকা।টাকা লাগবেই।কোমল হৃদয়ের তুলি যার হৃদয়ে আজ রঙ্গিন ছবি ভাসত তার কাছে আজ কঠিন দুনিয়া।কখনো কখনো জানালার ফাক দিয়ে উকি মেরে দূরের আকাশটা দেখত আর হারিয়ে যেত স্কুলেরর জীবনে।যখন চমক ভাঙ্গত গভীর বেদনায় ভরে যেত মন।অভিশপ্ত গ্রহের মানুষ মনে হতো নিজেকে।তবুও নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু পাষবিক নির্যাতনের কাছে জীবটা জ্বালাময়ি হয়ে উঠেছিল ।ধীরে ধীরে সে যেন ক্ষয় হয়ে যাচ্ছিল।পুরে ভষ্মিভূত হয়ে গেছে তার হৃদয়। তার পরেও স্বামির ঘর ছাড়ে নি।কারন সে জানে স্বামীর ঘর ছাড়া পাপ।আর ছেড়েই বা কি করবে উপরন্তু তার বাবাকে আরও কষ্ট করে যৌতুকের টাকা যোগার করে অন্য কোথাও বিয়ে দিতে হবে।নিরবে সয়ে যাওয়া মেয়েটা আর কখনো প্রতিবাদী হয়ে উঠতে পারে নি।

 

ছফর মিয়া কি সব আজে বাজে বকছে।লোকে বলে পাগল হয়ে গেছে।মেয়েকে হারানোর পর কিছুদিন বেশ নিরবে থাকত কারও সাথে কথা বলত না সহজে।সময়ে অসময়ে চোখ দিয়ে পানি গড়ীয়ে পড়ত। নিজের যে গরুটা ছিল যেটাকে পরিবারের সদস্যর মতো মনে হত সেই গরুটা নিয়ে গেছে চেয়ারম্যানের লোকজন।বাধা দিয়েছিল কিন্তু পাগল বলে কেউ তার কথায় কর্নপাত করে নি।অলি বেগমের হাহাকার কেউ দেখে নি।মেয়ের বিচারের জন্য মামলা করেছে। এলাকার চেয়ারম্যান এসে বলেছে তার মামলার সমস্থ ভার নিয়েছে।শুধু তাকে একটা সই দিতে হবে যেন তার পক্ষ হয়ে লরতে পারে এজন্য। হ্যা তাই দিয়েছিল ছফর মিয়া ,বড় বিশ্বাস করে সই দিয়েছিল কাগজটিতে। ওখানে কি জানি সব লেখা ছিল তা জানত না শুধু জানত তার মেয়ের হত্যাকারীর শাস্তির জন্য আইনি প্রকৃয়ার জন্য চেয়ারম্যান তার পক্ষে সমস্থ কাজ করবেন।কিন্তু জানতেন না ” মানুষকে বিশ্বাস করা মহাপাপ”। ওই কাগজটিতে লেখা ছিল ছফর মিয়া তার সমস্থ অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।তারপর আর বিচার হয় না তুলির হত্যাকারিদের।চেয়ারম্যানেরর বাড়ীতে যাবে  বিচারের কথা বলতে,বাড়ী থেকে খানিকটা দূরে একটা গরুর খামার।সেখানে বিশটার মতো গরু বাঁধা। একটু গভীরভাবে তাকাতে দেখতে পায় তার গরুটি সেখানে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে।চোখে দিয়ে পানি গড়তে গড়তে দাগ পড়ে গেছে।একটু কাছে যেতেই সেটা স্পষ্ট চোখে পড়ে।ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষা করার পর চেয়ারম্যান এসে গম্ভীরভাবে বসে চেয়ারে।এমন একটা ভাব করে যেন ছফরকে জীবনে আজ প্রথমবারের মতো দেখছে।ছফরের বুকটাতে চাপা বেদনা।কয়েকবার বলতে গিয়েও পারে না।তারপর ইস্তত করে বলেই ফেলে।ওসব করে কোন লাভ নাই মিয়া যাও গিয়া ঘুমাও।কিন্তু হজুর বলে কেঁদে ফেলে ছফর। আমার গরুটা?এবার চেয়ারম্যান চোখদুটো কপালে তুলে বড় বড় করে বলে আমার কথার উপরে কথা বললে কি হতে পারে ভেবেছ? সোজা জঙ্গী বলে ধরায়ে চালায়ে দিব,বুঝেছ মিয়া?ছফর মিয়া গরুটি ফেরত চায় কিন্ত ফিরে পায় না তার গরুটি।তাকে পাগল বলে গালাগাল দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।ফেরার পথে আবার গরুটিকে দেখে তার হৃদয় ডুকরে উঠে।যে বেদনা এতদিনে ভাটা পড়েছিল তা যেন আবার পূর্ন জোয়ারে জেগে উঠে।তার পর বিষ্ময় চোখে তাকিয়ে দেখে তুলির শ্বশুরের যে গরুগুলি ছিল সেগুলোও এই খামারে।তখন  থেকেই আজেবাজে বকছে ছফর।দিন নেই রাত নেই যখন তখন।ভোররাতে যখন কোন একটা শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় তখন মানুষ বলে ঐ সফর পাগলা চিল্লাচ্ছে।

 

এখনো রাতে আকাশে চাঁদ ওঠে  যখন জোসনায় আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে চারদিক তখন ছফর মিয়ার চিৎকারে কম্পিত হয় আকাশ বাতাস। তার আত্মচিৎকারে গাছের পাতাগুলো থরথর করে কাপে। পাগলের কন্ঠে কি করুন আর্তনাদের সুর।পাগল ডাকে তুলি আমার মা আমার, মেয়ে আমার,তুই কই?আমার কালো গাভী কোথায়?মাঠু গাভিটারে একটুও ঘাস দে।দুপুর বেলা যখন বাতাসের দোলায় বাঁশবাগানের মরা পাতা গুলো ঝরে পরে বাতাশ যখন জোরে বইতে থাকে ।সেই বাতাসে তুলির করুন বেদনামাখা আকুতি যেন শোনা যায়।ছফর মিয়া তুলির কবরের পাশে বসে নিবির পরশে সমাধির উপরে জন্মানো বুনো ঘাসগুলোকে আদর করতে থাকে।তার বুকের ভেতরটা হুহুকরে ওঠে।গভীর বেদনায় ভরে যায় হৃদয়।মেয়েকে হারানো শোক বিশ্বাসঘাতার ছোবলে সন্তানের মতো করে লালন করা কালো গাভীটা হারানোর শোক তাকে কাতর করে তুলেছে।সে আজ অসহায় পিতা পৃথিবীর সবথেকে বড় অসহায় মনে হয় তার নিজেকে ।

Leave a Comment: