হরিণ ছানাটি

বিলের ধারে দাঁড়িয়ে আছে একটি অচেনা ছেলে। বেশ অনেকক্ষণ ধরেই বনের দিকে তাকিয়ে আছে।। ছেলেটির বয়স বড়জোর সাত কি আট হবে। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছেলেটাকে লক্ষ করছে রাজীব। বিলের ওপারে ঘন বন। রাজীবের এখান থেকে বুঝবার উপায় নেই ছেলেটি কি দেখছে, তাই সে এগিয়ে যায় ছেলেটির সামনে। কাছাকাছি গিয়ে বনের দিকে তাকালে কিছুই দেখতে পেল না। ভাবলো ছেলেটা কি তবে আনমনা হয়ে কিছু ভাবছে? নাকি সত্যিই সত্যিই কোনো সমস্যায় পড়েছে? এসব চিন্তা মাথা থেকে সরিয়ে সে ছেলেটির গায়ে হাত ছোঁয়াল। সাথে সাথে ভয়মিশ্রিত কন্ঠে ছেলেটি বলে উঠলো, কে? ‘আমি রাজীব, এইগ্রামে বেড়াতে এসেছি। তুমি কে?’ ‘আমাগো নাম নাই, লোকে যার যেইটা ইচ্ছায় হেইটা কইয়া ডাকে।’ ‘ওহ। আচ্ছা আমি তোমার নাম দিলাম বিপুল। ঠিক আছে?’ ‘আপমাগো ইচ্ছা। যেইটা কইবেন ওইটাই শুনুম। কোথাও যাইবেন নাকি? নৌকা আনোন লাগবো?’ ‘তুমি কি এখানেই থাকো? তোমাকে দেখছিলাম একাধারে বনের দিকে তাকিয়ে আছো। তাই এদিকে আসলাম।’ মনে হয় বিপুল কথাটা কানে নিল না। কথার মাঝে সম্পূর্ণ হারিয়ে গেল। আবার একাধারে তাকিয়ে রইলো বনের দিকে। এবার রাজীবও কিছু একটা দেখতে পেল। আরে এ যে একটা হরিণ ছানা! এখানে আসলো কি করে? অবশ্য এই প্রশ্নের জবাব সে পরে পেয়েছে। কিন্তু রাজীব বিপুলের দিকে চেয়ে দেখে, বিপলও সেদিকেই তাকিয়ে আছে। সে বিপুলকে আবার ধ্যান থেকে জাগিয়ে কিছু প্রশ্ন করলো। যা শুনলো তা কিছুটা গল্পের মতন রোমাঞ্চকর, তবুও বিশ্বাসযোগ্য! হরিণ ছানাটা এখানে আছে গত এক সপ্তাহ ধরে। ওই বনে গাছপালা থাকলেও পশুপাখি আছে কি না তা জানে না বিপুল। কিন্তু হরিণ ছানাটি এই নির্জন বনে এলো কি করে, তা শুনে চমকিয়ে উঠে রাজীব। বিপুলের মতে, এবারে বন্যায় বহুদূর থেকে ভেসে এসেছে হরিণ ছানাটি। এলাকার অনেক মানুষ দেখেছে, কিন্তু কেউ ততটা গুরুত্ব দেয় নি। অনেকেই আবার তাচ্ছিল্যের স্বরে বলেছিল, ওই একটা ছানা। ওটা মরলে কার কি এসে যায়? কিন্তু বিপুলের ইচ্ছা সে হরিণ ছানাটাকে বাঁচাবেই। কিন্তু ঘাটে নৌকা নেই, এই ছোট্ট জায়গাটাতে নৌকাও চলে না। সাঁতরে যাওয়া বিপুলের পক্ষে সম্ভব নয়, কেননা বিপুলের একহাত নেই। তাই এখান থেকে সে প্রতিদিন নজর রাখে হরিণ ছানাটির দিকে। হয়তো এটাই ও নিজের প্রাত্যহিক দায়িত্ব বানিয়ে নিয়েছে।

হরিণ ছানাটিকে দূর থেকে দেখে বেশ মায়া জন্মে গেছে রাজীবের। একা একা ছানাটি হেটে বেড়াচ্ছে এদিক সেদিক। কিছু খেয়েছে কি না, তাও জানা নেই। হয়তো এতদিন এখানে না খেয়েই কাটিয়ে দিয়েছে।এভাবে চললে নির্ঘাত মৃত্যু তা রাজীব জানে। তাই সে বিপুলকে বললো, বিপুল চলো আমি আর তুমি মিলে হরিণ ছানাটাকে বাঁচাবো। কথাটা শুনে যেন বিপুলের ভিতরে প্রাণ ফিরে এলো। পাশেই কিছু কলার গাছ। সম্ভবত কারো ব্যাক্তিগত নয়। তবুও রাজীব বিপুলের কাছে জেনে নিল। তারপর নিজের ব্যাগ থেকে একটা ছুড়ি বের করে কেটে নিল একটি লম্বা কলার গাছ। সেটাকে দুভাগ করে, মাঝে কিছু কাঠ বসিয়ে নিল। এবার নিজের ব্যাগে থাকা দড়ি দিয়ে বেধে নিল সেটি। খুব সহজেই বানিয়ে ফেললো একটি ছোটখাটো ভেলা। এবার ওপারে যেতে হবে।

রাজীব নেমে পড়লো। আস্তে আস্তে নামিয়ে নিল ভেলাটি, রওনা দিল ওপারের উদ্দেশ্যে। সে সাঁতার ভালোই জানে, তবুও যাবার সময় ভেলার উপরে চড়ে গেল। এদিকে বিপুল দাঁড়িয়ে আছে, বিস্ময় কাটছে না তার। এতদিনের ইচ্ছা আজ পূরণ হতে চলেছে। হরিণ ছানাটিকে আজ সে নিজের হাতে ধরতে পারবে,তার সাথে খেলা করবে আরো কত কি! চারিদিকে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। রাজীব ধীরেধীরে হরিণ ছানাটি কোলে তুলে নেয়, এরপর ভেলার উপরে রেখে দেয়। হরিণ ছানাটি চুপচাপ ভেলার উপরে দাঁড়িয়ে আছে। যেন সে বুঝে গেছে, এরা তাকে উদ্ধার করতে এসেছে। কিছুক্ষণ বাদে আবারো সাঁতরে এপারে চলে আসে রাজীব। হরিণ ছানাটি বিপুলের হাতে তুলে দিয়ে বলে, ‘ধরো তোমার জন্যই আজকে এই হরিণ ছানাটি বেঁচে গেলো।’ বিপুল হরিণ ছানাটি নিচে নামিয়ে রাজীবের একহাত ধরে বলে, ‘আপনাগো অনেক অনেক ধন্যবাদ?’ রাজীব বলে, ‘তুমি এটাকে ভালোকরে যত্ন নিয়। এর মা খুঁজে পেলে, সন্তানকে পায়ের কাছে দিয়ে দিও। তোমার উপরে দায়িত্ব দিয়ে গেলাম। বিদায় তোমাকে।’ ‘বিদায় আপনাগো। ভালো থাইকেন।’ এই বলেই রাজীবের চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে থাকে বিপুল। যেন স্বর্গ থেকে আসা কোনো দেবতা বিপুলের মনের ইচ্ছাটি পূরণ করে গেল। কিংবা আলাদিনের চ্যারাগের সেই দৈত্যটি। তবে বিপুল মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানালো উপকারী পথিককে।

About the Author ফাতিন ইসরাক আবির

follow me on:

Leave a Comment: