রাঙ্গামাটি সাজেক ট্যুর

সবকিছুর আগে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ এই ট্যুর শেষ করে ঠিকঠাক করে যে যার যার অবস্থানে ফিরে আসতে পেরেছি বলে। ইট ওয়াজ মোর দ্যান আ রোলার কোস্টার ট্যুর। মাত্র ২ দিনে কত্ত জায়গা ঘুরেছি,নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য ঠেকছে এখনো।

পহেলা বৈশাখের সাথে শুক্রবার মিলিয়ে দু’দিনের ছুটি পেয়ে ভাবলাম কাজে লাগানো যাক। গন্তব্য ঠিক করে সহকর্মী কয়েকজনের সাথে আলাপ করতেই দশজনের টিম দাঁড়িয়ে গেল।

এবার শুরু প্ল্যানিং। খুব ঠান্ডা মাথায় সব খোঁজ খবর নিয়ে প্ল্যান করলাম। গরম আর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে শুরু হলো কাজ।

বন্ধু Osman Goni র সহযোগিতায় ঢাকা-চট্টগ্রাম তূর্ণা ট্রেনের এসি টিকেট ম্যানেজ করে ১৩ এপ্রিল বুধবার রাতে যাত্রা শুরু করলাম আমরা ১০ জন। ইতিমধ্যে কলিগ লোকমান দারুণ একটি হাই-এস মাইক্রো বাস ভাড়া করে দিয়েছে।

ট্রেন টাইম মত পৌছে গেল চট্টগ্রাম।

১৪ এপ্রিল, সকাল সাড়ে ৭টা।

ট্রেন থেকে নামার আগেই মাইক্রোবাস রেডি। ঝটপট যাত্রা শুরু করলাম। ফাঁকে চট্টগ্রামের বিখ্যাত জামান রেস্টুরেন্ট ভরপুর নাস্তা সারা হলো।

যাত্রা শুরু হলো চট্টগ্রাম থেকে। উদ্দেশ্য: রাউজান হয়ে রাঙ্গামাটি। ঘন্টা খানেকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম রাউজান, আমার গ্রামের বাড়ি। ওখানে কিছুক্ষণের বিরতি। হাল্কা খাওয়া-দাওয়া, ফটোসেশন সেরে চললাম রাঙ্গামাটি। আমি আশৈশব এইসব পাহাড়-পর্বত দেখে বড় হয়েছি,তবুও এই সবুজে ঢাকা পাহাড়, আকাঁবাঁকা-উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ- এর সৌন্দর্য আজো মন পাগল করে। সহযাত্রীদের অধিকাংশই এই প্রথম পাহাড় দেখছে। স্বাভাবিক ভাবেই ওদের আহ! কি সুন্দর! টাইপ প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে সেই রাউজান রাবার বাগান এরিয়া থেকেই। আমি শুধু ভাবছিলাম, এখনো তো শুরুই হয়নি, এতেই এই অবস্থা!

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম রাঙ্গামাটি। ভগ্নিপতি Ratan Kumar Dey আমাদের জন্য আগে থেকেই বুকিং করে রেখেছে। হোটেল সুফিয়া তে চেক ইন করলাম বেলা ১২ টার দিকে। ভালোই এই হোটেল টা। ডাবল বেড এসি রুম ১৮৭৫ টাকা মাত্র। চেক ইন করে ফ্রেশ হয়ে বেলা ১ টার মধ্যে আমরা যাত্রা করলাম শুভলং এর উদ্দেশ্যে। রতনবাবু’র বিশেষ প্রচেষ্টায় ১২/১৪ জন চড়তে পারে এমন একটি স্পীড বোট আগে থেকেই বুক করে রেখেছিলাম। হোটেল সুফিয়ার সাথেই ফিশারিঘাট-ওখান থেকেই স্পীড বোটে চেপে যাত্রা শুরু করলাম। অসাধারণ সুন্দর রাঙ্গামাটি লেক। সবুজ টলটলে জল, দু’পাশে পাহাড়, লেকে ইতিউতি চলছে ইঞ্জিন বোট।।এই সব চোখজুড়ানো ল্যান্ডস্কেপ দেখতে দেখতে তুফান গতিতে আমরা এগোচ্ছি শুভলং ঝর্ণার দিকে। লেকের বুক চিরে মাথা উঁচিয়ে তুফান গতিতে ১৫/২০ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম আমরা শুভলং ঝর্ণা।

সবে শুষ্ক মৌসুম শেষ হলো বিধায় ঝর্ণায় জলের নাচন নেই। কিন্তু সৌন্দর্য ও যেন কম নেই। পাতাঝরার দিন পেরিয়ে গাছে গাছে গজিয়েছে নতুন পাতা। লিকলিকে নতুন পাতায় সূর্যের আলোর প্রতিফলনে চিকচিক করছে চারদিক। ফুটেছে বুনোফুল, ফুটেছে বোগেনভিলিয়া। ঝর্ণাধারার বদলে তার খাড়া রকি ওয়াল দেখতেও অন্য রকম অনুভূতি হচ্ছে। মনে এডভেঞ্চার ভর করলো। বিপজ্জনক রকওয়াল বেয়ে উঠে গেলাম অনেকটা যদি ও মানা করা আছে। চারপাশের বিউটি দেখে মনটা ছোট্ট শিশুর মত লাফালাফি করছিল যেন বারেবার।

দেড়-দু’ঘন্টা শুভলং এর সৌন্দর্য উপভোগ করলাম তাড়িয়ে-তাড়িয়ে, রসিয়ে-রসিয়ে।

 

 

 

পরের গন্তব্য পেদাটিংটিং। লেকের মধ্যিখানে একটি দ্বীপ। আর ওখানেই পেদাটিংটিং রেস্টুরেন্ট। এখানেও রতন বাবুর সহযোগিতায় অসাধারণ খেয়েছি। চারপাশে গাছপালা আর তার শীতল ছায়ার তলে অতি সুন্দর এই রেস্টুরেন্ট। চাপিলা মাছের ফ্রাই এর স্বাদ ভুলতে পারছি না এখনো।

ওখান থেকে এবার এলাম পর্যটন এলাকায়। রাঙ্গামাটির বিখ্যাত ঝুলন্ত ব্রীজ এ ফটোসেশন আর ঘোরাঘুরি হলো।

এরপর চললাম রাজবনবিহার। এখানে কিছু বাঁদরের সাথে ফটোসেশন আর ঘোরাঘুরি শেষ করে সন্ধ্যা হয়-হয় এমন সময়ে হোটেলে ফিরলাম। একটা কথা বলে রাখি, এত অল্প সময়ে এই সব স্পট ঘুরতে পারলাম জাস্ট বিকজ অব রতন বাবু। উনি এই সুপরিসর স্পেশাল স্পিড বোট ম্যানেজ করে না দিলে আর উনি সঙ্গে না থাকলে কিছুতেই সম্ভব হতো না। ধন্যবাদ রতন বাবু।

খুব আন্তরিক এবং ভদ্র একটা ছেলে চালাচ্ছিল স্পিড বোট টা। নামার সময়ে ধন্যবাদ এবং বকশিশ দিতে পেরে নিজের কাছেই অনেক ভালো লাগছিল।

 

ফিরলাম হোটেলে। সবাই যারপরনাই ক্লান্ত। হোটেলে ফিরেই ঘন্টা দু’য়েকের ঘুম। অত:পর সন্ধ্যা ৭ টার পরে আবার বেরোলাম সবাই। রাঙ্গামাটি শহর ঘোরাঘুরি আর কেনাকাটা সেরে সবাই মিলে ডিনার সারলাম। তারপর হোটেলে ফিরে টুকটাক তাস পিটানো। অত:পর ঘুম কারণ ১৫ এপ্রিল সকাল ৭ টার মধ্যেই আবার যাত্রা শুরু করতে হবে খাগড়াছড়ি হয়ে সাজেকের পথে।

১৫ এপ্রিল, সকাল ৭ টা।

সবাইকে দাবড়ে রেডি করেছি। হোটেল সুফিয়ার কমপ্লিমেন্টারি নাস্তা সেরে তড়িঘড়ি চেপে বসলাম মাইক্রো বাসে।

মাণিকছড়ি থেকে মহাল ছড়ি,কেঙ্গেল ছড়ি, বেতছড়ি (আরো কি কি ছড়ি পেয়েছিলাম,সব মনে রাখা বেসম্ভব!) পেরিয়ে সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে পৌঁছালাম খাগড়াছড়ি। বলে রাখি, রাঙ্গামাটি থেকে খাগড়াছড়ি যাওয়ার রাস্তাটাও ব্যাপক সুন্দর! উঁচুনীচু রাস্তা, দু’পাশে বন-বাদাড়, কখনো ছোট-ছোট টিলা পাহাড়, কখনো অদূরে বিশাল সব পাহাড়-পর্বত দেখতে দেখতে কোন ফাঁকে যে খাগড়াছড়ি পৌঁছে গেলাম বুঝতে পারিনি।

ওখানেও প্ল্যানমত আগে থেকে চান্দের গাড়ি রেডি করে রেখেছিলাম সহযাত্রী Jashim Uddin সাহেবের সহযোগিতায়।

খাগড়াছড়িতে নেমে টুকটাক খাবারদাবার কিনতে গিয়ে মনে হয় দেরী করে ফেললাম। কারণ খাগড়াছড়ি থেকে দিঘীনালা হয়ে বাঘাইছড়ি বাঘাইহাট আর্মি চেক পোস্ট পৌঁছতে হয় সকাল সাড়ে ১০টার আগে। সকাল সাড়ে ১০টা আর সাড়ে ৩ টায় – এই দুই টাইম আর্মি এসকর্ট করে সাজেকের গাড়ি বহর নিয়ে যায় কিন্তু আমরা বাঘাইহাট পৌছালাম ১১.১৫ তে। কর্তব্যরত আর্মি অফিসারের সোজা কথা, আপনারা দেরী করে ফেলেছেন, অতএব, ৩.৩০ এর ট্রিপে যেতে হবে। এই ট্রিপের পর্যটকরা সাজেকে রাত্রিযাপন করে। আমরা যেন আকাশ থেকে পড়লাম। যতই বলি না কেন, আজ রাতেই আমরা ঢাকা ফিরব, ব্যাটা কিছুতেই রাজী হয়না। বোঝে না সে বোঝে না!!!!!!

অত:পর কি যেন হলো। পাহাড়ের উপর থেকে বড় অফিসার নেমে নির্দেশ দিলেন, যেতে দাও উনাদের।

অনুমতি পেয়ে খুশীতে পাশের দোকান থেকে আস্ত এক ছড়া কলা কিনে চান্দের গাড়ির ছাদে বসা বিচ্ছুদের দিয়ে দিলাম।

পাহাড়ি রাস্তায় ড্রাইভিং এনজয় করি আমি। কিন্তু এই আমিও ভড়কে গেছি সাজেক পথের রাস্তার চড়াই-উতরাই দেখে। রাস্তা খাড়া উঠেছে তো উঠেছে, উঠছে তো খাড়া অনেকখানি উঠছে আবার নামছে তো নামছে। উঠতে যেমন আঁকাবাঁকা, তেমনি নামতেও। বলে রাখি, ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে যারা যাবেন, অবশ্যই তেল চালিত শক্তিশালী গাড়ি নিয়ে যাবেন, ন্যুনতম ১৫০০ সিসি র গাড়ি লাগবে।

বাঘাই হাটি থেকে মাচালং আর্মি চেক পোস্টে আবার গাড়ির নাম ধাম এন্ট্রি করে ফের এসকর্ট যোগে যাত্রা করতে হয়। মাচালং থেকে আরো ১৮ কিমি রাস্তা সম্ভবত। খাগড়াছড়ি থেকে সব মিলিয়ে সাড়ে তিন ঘন্টা সময় পেরিয়ে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর তার নেশায় বুঁদ হয়ে আমরা পৌঁছালাম লীলাভুমি রুইলুই পাড়া, সাজেক।

 

যাওয়ার পথে চেঙ্গি নদীর পরিস্কার সবুজ জলে সাঁতরাতে খুব ইচ্ছে হচ্ছিল। এ যাত্রায় হয়নি। পরে কোনোদিন হবে এ ভেবে মনকে শান্ত করেছি এবার।

সাজেকের সৌন্দর্য অপরূপ। সাজেকের সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশের ক্ষমতা আমার নেই।

যেই আমি বিছানাকান্দি ঘুরে এসে বিরক্ত হয়েছিলাম, সেই আমি বলছি- সাজেকের সৌন্দর্য বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নেই। বাকিটা বুঝে নিন। আর বুঝতে হলে সাজেক যেতে হবে। যেতে হলে ইচ্ছে আর সাহস দু’টোই থাকতে হবে।

 

সাজেক চূড়ায় চড়ে দু’চোখ মেলে তাকাবেন। ভাববেন, কত উঁচুতে দাঁড়িয়ে আছেন আপনি। দেখবেন, বড় বড় পাহাড়গুলো আপনার নীচে। দেখবেন, ৩৬০ ডিগ্রী ঘুরবেন আর দু’চোখ মেলে দেখবেন হৃদয় দিয়ে। এই ভরপুর গরমেও সাজেকে শিরশির ঠান্ডা বাতাস আপনার শরীর জুড়িয়ে দেবে।

ঘুরে আসুন একবার। পারলে রাত্রিযাপন করে আসবেন একটা। এইগরমেও সাজেকের রাত নাকি ঠান্ডা!!

(কেউ যেতে চাইলে যোগাযোগ করবেন। বলে।দেব বিস্তারিত। কত আর লেখা।যায়?)।

যাইহোক, স্বপ্নযাত্রা শেষ করে ১৬ এপ্রিল সাত সকালে ফিরে এসে আবার যে যার কাজে।

নেক্সট কোনো কানেক্টিং ছুটিতে আবার ছূটবো অন্যকোনো গন্তব্যে।

তৈরী থেকো সহযাত্রীরা!

পুনশ্চ : ঈশ্বর কে ধন্যবাদ!

সবাই একদম ঠিকঠাক ফিরে এসেছি।

About the Author বিপ্লব কুমার মহাজন

পৃথিবীর সাধারণ একজন মানুষ।

follow me on:

Leave a Comment: