মন্ডলবাড়ির ভূত

ভয় পেয়ে ভ্যা ভ্যা করে কাঁদছে রিতা। ‘তোকে কত বার বলছি ঐ পথে সাঁঝবেলায় আসতে নেই ! তারপরও তুই ! ভীষণ রেগে গেলেন রিতার মা। বাড়ির ঘর দুটিতে তখন সন্ধ্যাপ্রদীপের নামে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছে। দোচালা একটা ঘর থেকে দাদি লাঠিতে ভর করে বেরিয়ে আসলেন। দাদিকে দেখে আরো জোরে কান্না জুড়ে দিলো রিতা। সব কথা শুনে দাদি রিতার মাকে ঘরে পাঠিয়ে দিলেন। রিতা তখনো কাঁদছে। দাদি অনেক বলে কয়ে থামালেন ওকে। ‘মা ঐ পথে চলতে নিষেধ করেছেন। আর কখনো ঐ পথে যাবি না। আর তুই তো পথঘাটও তেমন চিনিস না গ্রামের। দুদিন হলো গ্রামে এসেছিস। সেই ছোট্টবেলায় শহরে খালা বাসায় রেখে আসা হয়েছিল তোকে। আল্লাহর রহমে সেই তুই আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িস।’ ‘দাদি, এবার থামো তুমি ! আমার বাবা-মা বেঁচে থাকার পরও আমাকে কেন খালা বাসায় রেখে আসা হয়েছিল? কেন তোমার আদর আমি সব সময় আমি পাই নি? আমার ঐ পথে চলতে নিষেধ কেন? বলো দাদি, বলো। ” আবার কাঁদতে শুরু করলো রিতা। কিন্তু, কান্নাটাকে বশে আনলো দ্রুত। দাদি নিশ্চুপ। রিতা চেয়ে আছে দাদির মুখের দিকে। কিছুক্ষণ পর মুখ খুললেন দাদি। ‘আজ না বুবু , আর একদিন। কথা দিলাম তোকে সব বলবো।’ অনেকক্ষণ চুপ মেরে বসে থাকার পর মায়ের ঘরের দিকে গেলো রিতা। বাবা বাড়ি নেই। সেই সকালে ব্যবসার কাজে দুদিনের জন্য শহরে গেছেন। মা একা বসে আছেন। আর হাতে কি যেন একটা ধরে দেখছিলেন। ঠাওর করা কঠিন। ফটোর এ্যালবাম হবে হয়তো। রিতাকে আসতে দেখে মা দ্রুত জিনিসটা লুকিয়ে ফেললেন। ‘মা,খুব খিদে লেগেছে, খেতে দাও।’ মা মুচকি হাসির ভান করে আড়ালে চোখ মুছে নিলেন। কোন কথা-বার্তা ছাড়াই খাওয়া শেষ করে দাদির ঘরে চলে গেল রিতা। দাদি খেয়ে নিয়েছেন আগেই। ঘুমিয়ে পড়েছেন দাদি। ঘুমন্ত মানুষটাকে আর না জাগিয়ে ঘুমানোর জন্য দাদির পাশে শুয়ে পড়লো রিতা। লাইটের সুইচটা অফ করলো। কিন্তু, ঘুম তো আসে না। কি আছে ঐ পথে? এতো দিন বাবা-মা আমাকে শহরের রেখে পড়ালো কেন? গ্রামেও তো পড়াতে পারতো। নানা প্রশ্নে অন্ধকারটা যেনো আরো গাঢ় হয়ে আসছে। সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন জানি ঘুমপরীর ডাকে সাড়া দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে রিতা। ঘুম ভাঙলো মায়ের মধুর ডাকে। দাদিটা কেমন জানি ! আযানের সাথে জেগেছে অথচ রিতাকে ডাকে নি। যাই হোক, থাক সে কথা। সকালের নাস্তা সেরে দাদির সাথে গল্প জুড়িয়ে দিলো রিতা। দাদি আজ নিজে থেকেই বলছেন, ‘বুবু রে তোর মনে আজ যত প্রশ্ন আছে সব প্রশ্নের উত্তর দিবো। কুড়ি বছর আগের কথা। তুই তখন অনেক ছোট। রিফা নামে একটা বড় আপু ছিলো তোর। মরে গেছে ঐ সেই পথের ধারের মন্ডলবাড়ির ভূতের হাতে। সাঁঝবেলায় বান্ধবির বাড়িতে খুব একটা দরকারে গিয়েছিল। আর ফেরে নি। কোন যুবতি মেয়ে ফেরে না ও বাড়ি থেকে।’ ‘এটা কেমন কথা দাদি ! শুধু যুবতি মেয়েদেরই ধরে মেরে ফেলে ! সে আবার কেমন ভূত? ‘ মায়ের হাতের আড়ালে লুকিয়ে ফেলা বস্তুটা যে ফটোর এ্যালবামেই ছিলো তা এখন পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। আর ঐ ভূতের ভয়টাই তাকে দূরে সরিয়ে রেখেছি এতদিন। ‘জানি তুই ভূতের কথাটা বিশ্বাস করছিস না। এইতো সপ্তাহখানেক আগে পাশের বাড়ির হাফিজের নুতন বউ হাফিজের উপর রাগ করে বাপের বাড়ি যাবার নাম করে সাঁঝবেলায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো আর ফিরে আসে নি। দুই একজন তাকে ঐ পথেই যেতে দেখেছিল। কিন্তু, ভূতের ভয়ে কেউ আর সাহস করে ঐ পথে এগিয়ে যায় নি। তাহলে হয়তো বেচারি বেঁচে যেতো।’ রিতা বুঝতে পারলো এখানে বিদ্যুতের আলো আসলেও গ্রামের সরল মানুষগুলির মনে আজও সচেতনতার আলো জ্বলে নি। তাই হয়তো কখনো মনে এ প্রশ্নও আসে নি যে, মন্ডলবাড়ির ভূত শুধু যুবতি মেয়েদেরই কেন ধরে? এরা কি সত্যিই ভূত?

গল্পে গল্পে দুপুর গড়িয়ে আসে। স্নান সেরে খেয়ে ঘুমোতে যায় রিতা। কিন্তু, ঘুম আসছে না। পুরো বাড়ি যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। মা, দাদি ঘুমাচ্ছেন। রিতা ভাবলো এই সুযোগটাকে কাজে লাগাতেই হবে। চুপি চুপি মন্ডলবাড়ির পথে পা বাড়ায় সে। সাহসী হলেও একটু ভয় হচ্ছে রিতার। গা ছমছম করছে। ভরদুপুরেও কিছুটা অন্ধকার পথটা। ভয় ভয় করে এসে পড়লো বাড়ির অনেক কাছে। দাদির বর্ণনা অনুযায়ী রিতা নিশ্চিত এটাই মন্ডলবাড়ি। সেই পুরনো আমলের ভারি টিনের বেড়ায় ঘেরা চারপাশ। দুই এক জায়গায় টিন খসে গেছে। তার ফঁাক দিয়ে দেখা যাচ্ছে একটা ঘর। কিন্তু, তাতে দুই একজন মেয়ে মানুষ দেখা যাচ্ছে। তাহলে কি রিফা আপু বেঁচে আছে? আর হাফিজের বউ? চুপ হয়ে অবস্থা বোঝার চেষ্টা করে। হঠাৎ পাশেই কিছু মানুষের কন্ঠ শুনতে পায় সে। ‘না রে বাই এ পাপের ব্যবসা আর করমু না। অনেক পাপ করচি। আশপাশের গেরামের অনেক যুবতি মাইয়ার জীবন নষ্ট করচি, পাচার করচি বিলাতে। না ! আর না ! দ্যাশে আইন পাল্টাইচে। যদি ধরা পড়ি। আর বাঁচোন নাই মিয়ারা।’ কিছু লোক সায় দিল। ‘হ, বাই ঠিক কইচেন। আর এ ব্যবসা করোন যাইবো না।’ রাগে-ক্ষোভে চোখে জল চলে আসছে রিতার। দ্রুত বাসায় চলে আসে সে। বাড়ির লোকগুলি এখনো ঘুমে। শুধু কি বাড়ির লোক? পুরো গ্রামের লোকেই তো ঘুমিয়ে আছে। সে জন্যই তো নারী পাচারকারীকে ভূত বলে জানে। পরদিন সকালবেলায় পুলিশ এসে গ্রেফতার করে “মন্ডলবাড়ির ভূত” নামের পশুগুলিকে। রিতা পুলিশকে গোপনে জানিয়েছিল ব্যাপারটা। হয়তো রিফা আপু,হাফিজের বউকে আর ফিরে পাবে না রিতারা। তবুও গ্রামটা নরপশুর হাত হতে মুক্তি তো পেলো।

এমনি করে ধবংস হোক সব ‘মন্ডলবাড়ির ভূত’ নামক বিবেকহীন মানুষগুলি। বন্ধ হোক নারী পাচার।

About the Author আল-আমীন আপেল

শ্বাসের আশায় ছাড়ি নিঃশ্বাস..

follow me on:

Leave a Comment: